সংসদ নেই, কোথায় বসবেন নেপালের ২৭৫ এমপি?

গত বছরের আন্দোলনে নেপালের পার্লামেন্ট ভবনে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়
নেপালের জাতীয় নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ফল ঘোষণা হবে আগামীকাল। নির্বাচন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন আইনপ্রণেতাদের স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে কাঠমান্ডু। কিন্তু নতুন সংসদের ২৭৫ জন সদস্যের সামনে এখন অবধারিতভাবে যে প্রশ্ন আসছে, তা হলো তারা বসবেন কোথায়?
গত বছর দেশজুড়ে যখন বিক্ষোভ হয়, তখন আন্দোলনকারীরা সংসদ ভবনে আগুন লাগিয়ে দেয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় সংসদ ভবন। এরপর সিংহ দরবারের ভেতর আগেই নেওয়া নতুন সংসদ কমপ্লেক্স নির্মাণের কাজে জোর দেয় সুশীলা কার্কির অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু নির্মাণাধীন সেই ভবনের কাজ এখনও শেষ হয়নি।
পার্লামেন্ট সচিবালয়ের উদ্বেগ
পার্লামেন্ট সচিবালয় জানাচ্ছে, নতুন সংসদ কমপ্লেক্স নির্মাণাধীন। এ কারণে নির্বাচিত আইনপ্রণেতাদের প্রথম অধিবেশন কোথায় হবে তা নিয়ে রয়েছে অনিশ্চয়তা।
নির্বাচন কমিশনের ভাষ্য, আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) ভোটসহ চূড়ান্ত ফল কয়েক দিনের মধ্যে পাওয়া যাবে। এরপর নতুন অধিবেশন শুরু হওয়ার আগে সব আইনপ্রণেতাকে শপথ নিতে হবে। কর্মকর্তারা স্বীকার করছেন শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান এবং পরবর্তী অধিবেশন আয়োজনে মিলছে না প্রয়োজনীয় অবকাঠামো।
‘একটি কার্যকর সংসদ কক্ষের অভাব আইনসভা পরিচালনার দায়িত্বে থাকা পার্লামেন্ট সচিবালয়ের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। আমাদের সংসদ সদস্যদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে একটি মিলনায়তন প্রয়োজন। অন্তত সংসদীয় নেতাদের বসার জায়গা, রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য অফিস এবং অধিবেশন পরিচালনায় জড়িত কর্মীদের জন্য কিছু সুযোগ-সুবিধা প্রয়োজন,’ বলছিলেন পার্লামেন্ট সচিবালয়ের মুখপাত্র একরাম গিরি।
‘আমরা প্রচণ্ড চাপে আছি’
সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, নতুন সংসদ কমপ্লেক্স নির্মাণের দায়িত্বে থাকা নগর উন্নয়ন মন্ত্রণালয় ‘কাজটি শিগগির শেষ হবে’ বলে সরকারকে আশ্বাস দিয়েছিল। তবে কাজ যত দ্রুত হওয়ার কথা ছিল তা হয়নি। মার্চের মাঝামাঝি সময়ে কমপ্লেক্স হস্তান্তরের কথা ছিল। ফলে এর বিকল্প খোঁজা হয়নি।
‘দুর্ভাগ্যবশত আমাদের কাছে সব সংসদ সদস্যকে একসঙ্গে শপথ পড়ানোর জন্য যথেষ্ট বড় মিলনায়তন নেই। আইনিভাবে চূড়ান্ত নির্বাচনের ফল রাষ্ট্রপতির কাছে জমা দেওয়া এবং জনসমক্ষে প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে সংসদীয় অধিবেশন ডাকতে হয়’, ব্যাখ্যা করছিলেন একরাম গিরি।
তার মতে, সংসদীয় অধিবেশন পরিচালনায় প্রয়োজন জটিল লজিস্টিক ব্যবস্থা। একদিকে সংসদ সদস্যদের জন্য আসন বরাদ্দ করতে হয়, অন্যদিকে সরকারি কর্মকর্তা, সাংবাদিক, পর্যবেক্ষক এবং দর্শনার্থীদের জন্য পৃথক জায়গা লাগে।
‘আমরা প্রচণ্ড চাপের মধ্যে আছি। সাধারণ সভার মতো সংসদ পরিচালনা করা যায় না। দলীয় প্রতিনিধিত্ব অনুযায়ী সংসদ সদস্যরা কোথায় বসবেন, পাবলিক গ্যালারি কোথায় থাকবে, সরকারি কর্মকর্তারা এবং সাংবাদিকরা কোথায় থাকবেন— তা ঠিক করতে হবে। অধিবেশন শুরুর আগে এই সব ব্যবস্থা চূড়ান্ত করতে হয়। সাধারণত অধিবেশনের প্রস্তুতিমূলক কাজ সারতেও সাত থেকে দশ দিন সময় লাগে’, সাংবাদিকদের ব্যাখ্যা করছিলেন তিনি।
কাজের গতি প্রত্যাশার চেয়ে কম
গত বছরের অক্টোবরে দশইন উৎসবের পর নগর উন্নয়ন মন্ত্রণালয়কে বারবার নতুন সংসদ কমপ্লেক্সের কাজে গতি আনতে তাগাদা দেওয়া হচ্ছিল। তবে কাজের গতি প্রত্যাশার চেয়ে কম। এ নিয়ে এখন চাপে পড়েছে সংসদ সচিবালয়। নেপালের জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদরা বেশ কয়েকবার কমপ্লেক্সটি পরিদর্শন করেছেন। স্পিকার এবং জাতীয় পরিষদের চেয়ারম্যান একাধিকবার নির্মাণকাজ পরিদর্শনে গিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের।
নির্মাণকাজের সঙ্গে যুক্ত একটি সূত্র বলেছে, প্রয়োজনীয় সমন্বয় ও চাহিদাপত্র উত্থাপন করা হলেও কাজ শেষ হতে দেরি হচ্ছে। অবশ্য পুরো কমপ্লেক্সের কাজ শেষ না হলেও প্রথমে হাউস চেম্বার এবং কয়েকটি ভবন হস্তান্তরের পরিকল্পনা ছিল। তবে এখনও কিছুই পুরোপুরি প্রস্তুত নয়।
ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান প্রকল্পটির নির্মাণকাজ সময়মতো শেষ করতে ব্যর্থ হয়েছে স্বীকার করে নগর উন্নয়ন মন্ত্রী কুমার ইংনানের মন্তব্য করেন, ‘সবরকমের চেষ্টার পরও আমরা মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত কমপ্লেক্সের কাজ শেষ করতে পারিনি। তবে শিগগিরই সেখানে যাতে পার্লামেন্ট অধিবেশন করা যায় তা নিশ্চিত করতে আমরা কাজ করছি।’
ষষ্ঠবারের মতো বাড়ছে নির্মাণকাজের মেয়াদ
কাঠমান্ডু পোস্ট জানিয়েছে, সংসদ কমপ্লেক্স প্রকল্পটি কয়েকবছর আগে নেওয়া। এটি ২০২২ সালের অক্টোবরে শেষ হওয়ার কথা ছিল। লক্ষ্য ছিল আগামী নির্বাচনের পর গঠিত সংসদ নতুন ভবনে শুরু করা। বিলিয়ন ডলারের এই চুক্তি পেয়েছিল টুন্ডি-সেক জেভি। কিন্তু তারা একাধিকবার ‘সময়সীমা’ অতিক্রম করেছে। গত ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত এটির মেয়াদ পাঁচবার বাড়ানো হয় এবং কর্তৃপক্ষ এখন আরও একবার সময়সীমা বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এখন ছুটির দিনেও প্রকল্পের কাজ হচ্ছে বলে দাবি প্রকল্প প্রধান রোশন শ্রেষ্ঠার।
তার ভাষ্য, ‘এখন পর্যন্ত প্রায় ৯৪ শতাংশ নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে। প্রধান ভবন এবং দলীয় কার্যালয়গুলো প্রস্তুত থাকা উচিত ছিল। আমরা মার্চের মাঝামাঝি কাজ শেষ করার লক্ষ্য নিয়েছিলাম, কিন্তু সময়মতো শেষ করতে পারিনি। এখন মার্চের চতুর্থ সপ্তাহের মধ্যে কাজটি শেষ করতে চাই।’ পুরো কমপ্লেক্সের কাজ শেষ হতে আরও দুই মাস সময় লাগতে পারে বলে জানান তিনি।
সিংহ দরবারের ভেতর ৭.৯৪ হেক্টর জমিতে নির্মাণাধীন এই কমপ্লেক্সে বেশ কয়েকটি পাঁচতলা ভবন আছে। এতে প্রতিনিধি পরিষদ এবং জাতীয় পরিষদের জন্য পৃথক ভবন, ঊর্ধ্বতনদের অফিস, গ্রন্থাগার এবং জাদুঘর আছে। অন্য সুবিধার মধ্যে আছে সংসদীয় দলের অফিস, সংসদীয় কমিটি, সংসদ সচিবালয়, ক্যাফেটেরিয়া এবং একটি প্রেস ও মুদ্রণ কেন্দ্র।
সব মিলিয়ে ৪৭৬টি গাড়ি ও ৮০০ মোটরসাইকেল পার্কিংয়ের সুবিধাসহ নিরাপত্তা কর্মীদের জন্য পৃথক আবাসনের ব্যবস্থাও আছে ডিজাইনে।

