জাপানের তাকাইচি কি অর্থনীতির মোড় ঘুরাতে পারবেন

সানায়ে তাকাইচি
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি একেবারে হঠাৎ করেই নির্বাচনের ঝুঁকি নিয়েছিলেন। তাতে যদিও তিনি সফল হয়েছেন। তার নেতৃত্বাধীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) ৪৬৫ আসনের মধ্যে ৩১৬ আসন পেয়েছে। এমন নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা সাম্প্রতিক সময়ে খুব কম জাপানি নেতা পেয়েছেন। উল্টো দেশটিতে দীর্ঘদিন ধরেই প্রধানমন্ত্রীদের ঘন ঘন পরিবর্তন দেখা গেছে।
এখন দেখার বিষয়, এই শক্ত ম্যান্ডেট কাজে লাগিয়ে তাকাইচি জাপানের দীর্ঘদিনের ধীরগতির অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত গতি ফিরিয়ে আনতে পারবেন কি-না।
জাপানের সামনে সমস্যার শেষ নেই। এসবের মধ্যে রয়েছে—মন্থর প্রবৃদ্ধি ও বিশ্বের সবচেয়ে বড় সরকারি ঋণ। এছাড়া দেশটিতে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর বয়স বাড়ছে। ফলে কমে যাচ্ছে কাজ করার লোকের সংখ্যা।
কিছু বিশ্লেষকের মতে, তাকাইচির সামনে সুযোগ রয়েছে এই পরিস্থিতি বদলে দেওয়ার।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের ভাষণলেখক ও উপদেষ্টা তোমোহিকো তানিগুচি বলেন, তিনি যদি সফল হন, তাহলে এটি বিশ্বজুড়ে বার্ধক্যজনিত সমাজগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে থাকবে।
অর্থ আসবে কোথা থেকে?
নির্বাচনী প্রচারের সময় তাকাইচি সরকারের ব্যয় ব্যাপকভাবে বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এর মধ্যে শিল্পখাতে বিনিয়োগও রয়েছে, যাতে প্রবৃদ্ধি বাড়ানো যায়।
এটি তাকাইচির পূর্বসূরিদের নীতির থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি কর কমানোর অঙ্গীকার করেছেন, যাতে মানুষ বেশি খরচ করতে পারে। তিনি বলেছেন, সঞ্চয়ের চেয়ে প্রবৃদ্ধিই হওয়া উচিত অগ্রাধিকার।
তবে বিনিয়োগকারীরা প্রশ্ন তুলেছিলেন, এই পরিকল্পনার অর্থায়ন হবে কীভাবে? তাকাইচির বিপুল নির্বাচনী জয়ের পর সেই সন্দেহ অনেকটাই কেটে গেছে। যার প্রতিফলন দেখা গেছে রোববার রাতে শেয়াবাজারের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ায়।
বিনিয়োগকারীরা যাকে ‘তাকাইচি ট্রেড’ হিসেবে অভিহিত করছেন। এর আওতায় বিনিয়োগকারীরা জাপানি শেয়ার কিনছেন এবং ইয়েন ও সরকারি বন্ড বিক্রি করছেন। উল্লেখযোগ্যভাবে, ইয়েনের মূল্যও বেড়েছে। অনেক বিনিয়োগকারীর কাছে শক্তিশালী মুদ্রা একটি ভালো লক্ষণ।
কিন্তু বিষয়টি এতটা সহজ নয়।
অক্টোবরে তাকাইচি ক্ষমতায় আসার পর সরকারি বন্ডের সুদের হার বেড়ে যায়। এটি বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ, কারণ জাপানের সরকারি ঋণ ইতিমধ্যেই বিপুল। বেশি ব্যয় ও কম কর মানে সরকারকে আরও বেশি ঋণ নিতে হবে।
জাপানের বন্ড বাজার বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ। তাই টোকিওতে সামান্য পরিবর্তনও বৈশ্বিক বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে।
বিনিয়োগকারীরা সুদের হার নিয়েও সতর্ক। কারণ ব্যাংক অব জাপান দীর্ঘদিনের অতিনিম্ন সুদের হার থেকে সরে এসে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে।
উদাহরণ হিসেবে, ২০২৫ সালে চালের দাম দ্বিগুণ হয়। দীর্ঘদিন ধরে স্থিতিশীল বা কম দামের সঙ্গে অভ্যস্ত জাপানিদের জন্য এটি বড় ধাক্কা।
এটাই ছিল তাকাইচির উত্থানের মূল বার্তা—ভোটাররা নিজেদের আরও দরিদ্র মনে করছেন, আর পণ্যের দাম বাড়ছে। এই ইস্যুই তার পূর্বসূরির ক্ষমতা হারানোর অন্যতম কারণ ছিল।
স্বল্পমেয়াদে তাকাইচির প্রস্তাবিত কর ছাড় সাধারণ মানুষকে কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে। কিন্তু কেইও বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক কেইইচিরো কোবায়াশি সতর্ক করে বলেন, ব্যয় বাড়ালে তা শুধু মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেবে এবং জীবনযাত্রার খরচ আরও বাড়াবে।
তার মতে, সরকারের উচিত ব্যাংক অব জাপানকে সুদের হার বাড়াতে দেওয়া এবং একই সঙ্গে সরকারি ব্যয় কমানো। এতে বিনিয়োগকারীরাও সন্তুষ্ট থাকবে।
কারণ কম সুদের হার ও বেশি সরকারি ব্যয়ের ফলে জাপান বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে কম আকর্ষণীয় হয়ে পড়ে, যা ইয়েনের চাহিদা কমায় ও মুদ্রাকে দুর্বল করে।
দুর্বল ইয়েন আমদানি পণ্যের দাম বাড়ায়। তবে এটি সস্তা চীনা পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় রপ্তানিকারকদের সহায়তা করে।
প্রবৃদ্ধি চাইলে তাকাইচিকে এই অত্যন্ত সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করতেই হবে।
জনসংখ্যা ও শ্রমশক্তির সংকট
জাপানের জনসংখ্যা ও কর্মক্ষম মানুষ বছরের পর বছর ধরে কমছে। দেশটি এখন বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক মানুষের দেশগুলোর একটি। যা স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সেবার ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করছে।
নির্মাণ, সেবা খাত, কৃষি ও পর্যটন খাতে ইতিমধ্যেই তীব্র শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে। কম শ্রমিক মানে কম উৎপাদন, আর তাই দুর্বল প্রবৃদ্ধি।
অভিবাসন এই চাপ কিছুটা কমাতে পারে। সরকারি তথ্য বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিয়ম কিছুটা শিথিল করা হয়েছে এবং বিদেশি শ্রমিকের সংখ্যা বেড়েছে। তবুও ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকার তুলনায় জাপানে বিদেশি শ্রমিক অনেক কম।
তাকাইচি ইঙ্গিত দিয়েছেন, বিষয়টি খুব স্পর্শকাতর হওয়ায় তিনি এ নিয়ে বড় পরিবর্তন আনবেন না।
তিনি ও তার মিত্ররা বলছেন, প্রযুক্তি, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা এবং নারী ও বয়স্কদের কর্মসংস্থানে অংশগ্রহণ বাড়িয়েই উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করছেন, এটা যথেষ্ট নাও হতে পারে। উন্নত অর্থনীতিগুলোর মতো জাপানেরও আরও বিদেশি শ্রমিক প্রয়োজন।
বিশ্লেষকদের মতে, অভিবাসনের প্রতি এই অনীহা বৃহত্তর পরিবর্তনবিরোধী মানসিকতারই অংশ, যা অতীতে সংস্কার ও উদ্ভাবনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চীনের ভূমিকা
জাপানের দ্রুত পরিবর্তন দরকার—কারণ চীন ইতিমধ্যেই আকার ও শিল্প সক্ষমতায় তাকে ছাড়িয়ে গেছে। আর ভিয়েতনামসহ অন্যান্য এশীয় অর্থনীতিও এগিয়ে আসছে।
চীনই জাপানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়তে সময় লাগবে, তাই আপাতত প্রবৃদ্ধির জন্য জাপানকে বাণিজ্যের ওপরই নির্ভর করতে হবে।
মিজুহোর জাপানবিষয়ক প্রধান অর্থনীতিবিদ নাওকি হাত্তোরি বলেন, বিরল খনিজ রপ্তানি নিয়ে বিরোধসহ বেইজিংয়ের সঙ্গে চলমান উত্তেজনা জাপানের কৌশলগত সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করেছে। এর প্রভাব পড়তে পারে বৈদ্যুতিক যান ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনেও।
এদিকে, তাকাইচি বিরল খনিজ ও ওষুধের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে চীনের ওপর নির্ভরতা কমানোর অঙ্গীকার করেছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়েছেন এবং প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়াতে সম্মত হয়েছেন।
তানিগুচির মতে, তাকাইচি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ‘সমদূরত্ব’নীতিকে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি ওয়াশিংটনের সঙ্গে জোট গঠনকেই জাপানের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার কেন্দ্র মনে করেন।
তবে জাপান একেবারে আমেরিকা বা চীন— যেকোনো একদিকে ঝুঁকতে পারে না। তাকে দুপক্ষের সঙ্গেই ভারসাম্য রেখে চলতে হবে।
প্রফেসর কোবায়াশি বলেন, চীনের আবাসন সংকট ও মন্থর প্রবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে উভয় শক্তির সঙ্গেই সম্পর্ক গভীর রাখা বুদ্ধিমানের কাজ।
তাকাইচির নীতি অনেকটাই তার পরামর্শদাতা শিনজো আবের পথ অনুসরণ করছে। প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে বেশি ব্যয় এবং বিনিয়োগে সহায়তার জন্য কম সুদের হার।
তবে আবের সময় পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল, দাম কমছিল, ইয়েন শক্তিশালী ছিল, আর চীন এতটা প্রভাবশালী ছিল না।
তাকাইচির চ্যালেঞ্জ আরও গুরুতর— জাপানের কর্মক্ষম মানুষদের বয়স বেড়েছে, দেশটির প্রবৃদ্ধি এখনও ধীর, আর বিশ্ব আগের চেয়ে অনেকটাই বদলে গেছে।

