আগামীর সময়

অর্থনীতি নিয়ে বারবার জুয়া খেলেও কীভাবে পার পেয়ে যান ট্রাম্প

অর্থনীতি নিয়ে বারবার জুয়া খেলেও কীভাবে পার পেয়ে যান ট্রাম্প

সংগৃহীত ছবি

দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে বারবার জুয়া খেলছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার এই ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ যেন দৈনন্দিন জীবনের অংশ। তিনি বিশ্বব্যাপী ব্যাপক শুল্ক আরোপ করেছেন যার ফলে সারা বিশ্বে ব্যবসার খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসীর সংখ্যা চরমভাবে কমিয়ে এনেছেন।

ট্রাম্পই আবার যেকোনো পরিস্থিতিতেই সুদের হার কমানোর জন্য ফেডারেল রিজার্ভের ওপর চাপ দিচ্ছেন। তবে মার্কিন মুদ্রাস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। আর এখন তিনি ইরানের ওপর আক্রমণ শুরু করেছেন। সুস্পষ্টভাবে বললে দীর্ঘদিন ধরে ট্রাম্পের রাজনৈতিক ব্যারোমিটারে সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে জ্বালানির তেলের দাম যা এখন ঊর্ধ্বমুখী।

যুক্তরাষ্ট্র এখন আবারও এক তীব্র অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখে দাঁড়িয়ে আছে। চলমান সামরিক অভিযানকে ট্রাম্প বলেছেন চার সপ্তাহ বা তারও বেশি সময় ধরে চলতে পারে। এই সংঘাতের ফলে তেলের দাম বেড়েছে। তবে বাজারগুলো উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে কারণ জ্বালানির দাম বাড়তে পারে এবং ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের ব্যয় বাড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ঋণও বাড়তে পারে।

এটিও ট্রাম্পের ঝুঁকিপূর্ণ নীতির তালিকায় আরেকটি সংযোজন। আর এখন পর্যন্ত তিনি মূলত পার পেয়ে যাচ্ছেন। অনেক দিক থেকেই এটাই এখন পর্যন্ত ট্রাম্পের অর্থনৈতিক নেতৃত্বের গল্প। তার অস্থির নীতিগুলো কিছু ক্ষতি করেছে। যেমন তার জনপ্রিয়তার হার কমেছে। কিন্তু অর্থনীতির প্রধান সূচকগুলো যেমন সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, শেয়ারবাজার, এমনকি মুদ্রাস্ফীতি এখনও পর্যন্ত বেশিরভাগ ধকল সামলে নিতে পারছে।

বিশ্লেষকদের অনেকে বলছেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) অবকাঠামো গড়ে তোলার জন্য বিপুল ব্যবসায়িক বিনিয়োগও মার্কিন অর্থনীতিকে শক্তিশালী গতিতে এগিয়ে যেতে সাহায্য করছে। কেউ কেউ মত দিচ্ছেন, মূলত যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি একটি ভোক্তা-নির্ভর শক্তিশালী অর্থনীতি যাকে সহজে ধ্বংস করা কঠিন।

সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রধান অর্থনীতিবিদ জ্যারেড বার্নস্টেইনের মতে, ‘অনেকে বলেন, এআই বিনিয়োগের জোয়ারে ট্রাম্প ভাগ্যবান হয়ে গেছেন। এটা পুরোপুরি ভুল নয়, তবে বিষয়টি কিছুটা অতিরঞ্জিত। ব্যবসায়িক বিনিয়োগ জিডিপির প্রায় ১২–১৩ শতাংশ। বেকারত্বের হার ৪.৩ শতাংশ। প্রকৃত মজুরি বাড়ছে। এগুলোই ভোক্তা ব্যয়কে এগিয়ে নিতে সাহায্য করে।’

অর্থনীতির এই স্থিতিশীলতার পেছনে প্রেসিডেন্ট নিজেও একটি কারণ। রিপাবলিকানদের করছাড় নীতি এ বছর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বড়ভাবে ত্বরান্বিত করবে বলে আশা করা হচ্ছে। কারণ এতে ব্যক্তিগত কর রিটার্ন বাড়বে এবং ব্যবসায়িক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক কর ছাড় পাওয়া যাবে।

এ ছাড়া প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ নীতিও বারবার মার্কিন শেয়ারবাজারকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ফলে যেসব পরিবারের বিনিয়োগ রয়েছে তাদের সম্পদও বেড়েছে। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তার উদ্বৃতি দিয়ে মার্কিন সংবাদ মাধ্যম পলিটিকো লিখেছে, ‘আমাদের অর্থনৈতিক নীতির মধ্যে যেগুলোর প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে পড়ে সেগুলো ঠিক জুয়া নয়।’

তবে অর্থনীতির ওপর আঘাত হানা রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলাগুলো কখনও কখনও একে অপরকে সামলে নিতে পারে। অ্যাপোলো গ্লোবাল ম্যানেজমেন্টের প্রধান অর্থনীতিবিদ টরস্টেন স্লক উল্লেখ করেছেন, মাত্র এক সপ্তাহ আগেই বাজারে আলোচনায় ছিল সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের কিছু শুল্ক বাতিল করার খবর। এর ফলে সামগ্রিক কার্যকর শুল্কহার কমে গেছে। বিশেষ করে চীনসহ কিছু এশীয় দেশের ওপর শুল্ক কমেছে।

এর ফলে মুদ্রাস্ফীতি কমতে পারে। তবে তেলের দাম বাড়লে মুদ্রাস্ফীতি আবার বাড়তেও পারে।

ট্রাম্পের নিজস্ব প্রভাবও বোঝা কঠিন। ইরান সংকট থেকে কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে তা এখনও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের অঞ্চলে গুরুতর সমস্যার সম্ভাবনাও রয়েছে।

‘সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি হতে পারে। আহত কিন্তু টিকে থাকা ইরানি সরকার উপসাগরীয় অঞ্চলে জ্বালানি ও অন্যান্য হামলা চালিয়ে যেতে পারে। এমনকি সাময়িক যুদ্ধবিরতি হলেও তারা উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোকে জিম্মি করার চেষ্টা করতে পারে,’ বলছিলেন এভারকোর আইএসআইয়ের ভাইস চেয়ারম্যান কৃষ্ণ গুহা।

তবে তিনি যোগ করেন, তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮০ ডলারের ওপরে উঠলেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর এর প্রভাব সম্ভবত খুব বেশি হবে না।

সহজভাবে বললে অর্থনীতি হয়তো এই পরিস্থিতি সামলে নিতে পারবে। তবে এর মানে এই নয় যে ট্রাম্পের নীতিগুলো কোনো ক্ষতি করেনি। তার এই জুয়ার চক্করে অনেক ব্যবসা বিশেষ করে ছোট ব্যবসাগুলো উচ্চ আমদানি শুল্কের চাপে আছে। ২০২৫ সালের শেষের দিকে আগের বছরের তুলনায় বেশি পরিবার ঋণ পরিশোধে গুরুতর সমস্যায় পড়েছে। তাতে জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ আরও স্পষ্ট হয়েছে।

মার্কিন উৎপাদনখাত এখনও দুর্বল রয়ে গেছে, যদিও প্রশাসন দেশেই উৎপাদন ফিরিয়ে আনার ওপর জোর দিচ্ছে। আর বাণিজ্যসহ নানা ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কিছু ব্যবসায়িক বিনিয়োগও আটকে দিয়েছে।

এছাড়া ভবিষ্যতে অর্থনীতি সবসময় এত শক্তিশালী থাকবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়েও নানা ঝুঁকি রয়েছে। যদি প্রযুক্তিটি প্রত্যাশা অনুযায়ী উৎপাদনশীলতা বাড়াতে না পারে, তাহলে শেয়ারবাজার বড় পতনের মুখে পড়তে পারে। আবার এআই সফল হলেও অনেক চাকরি হারিয়ে বেকারত্ব বাড়তে পারে।

আর যদি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে চলে যায়, তাহলে সাম্প্রতিক বছরগুলোর তুলনামূলক কম মুদ্রাস্ফীতি আবার বেড়ে যেতে পারে।

তবে যদি এত অস্থিরতার মাঝেও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি এগিয়ে যেতে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতের সরকারগুলো হয়তো আরও বেশি পরীক্ষামূলক অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণে উৎসাহিত হবে।

বার্নস্টেইনের মতে, ট্রাম্পের শুল্কনীতি একটি বিষয় প্রমাণ করে কর বৃদ্ধিও সহ্য করকে পারে মার্কিন অর্থনীতি। ‘এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতি ততটাই স্থিতিশীল যতটা মানুষ সাধারণত মনে করে। আর এটি সেই বিশেষ স্বার্থগোষ্ঠীগুলোর দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে যারা বলে, আমাদের শিল্প থেকে এক পয়সা নিলেই অর্থনীতি ধসে পড়বে,’ বলছিলেন বার্নস্টেইন।

তবে একটি ক্ষেত্রে ট্রাম্প এই সবকিছু থেকে পার পাচ্ছেন না। সেটি হলো জনমত।

রয়টার্স/ইপসোসের সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ৩৫ শতাংশ মার্কিনী তার অর্থনীতি পরিচালনার পদ্ধতি সমর্থন করেন এবং ২৯ শতাংশ তার মুদ্রাস্ফীতি মোকাবিলার পদ্ধতি সমর্থন করেন। যদি বর্তমান স্থিতিশীলতা কখনো ভেঙে পড়ে হোক তা ট্রাম্পের নীতির কারণে বা অন্য কোনো কারণে তাহলে এটি প্রেসিডেন্ট এবং রিপাবলিকান পার্টির জন্য ভালো খবর হবে না।

    শেয়ার করুন: