নেতা-কর্তারা মারা যাচ্ছেন, কী করবে ইরান?

আলী লারিজানি ও আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। দুজনই ইসরায়েলের হামলা নিহত হয়েছেন। ছবি: সংগৃহীত
দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েল ‘টার্গেট কিলিংয়ের’ মাধ্যমে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের হত্যা করে আসছে। এক্ষেত্রে হত্যার শিকার বেশি হতেন পরমাণু বিজ্ঞানী এবং এই কর্মসূচির সঙ্গে সম্পৃক্ত কর্মকর্তারা। এছাড়া ইরানি প্রভাবশালী সামরিক কর্মকর্তাদেরও দেশটি টার্গেট করে করে হত্যা করেছে।
তবে ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধের পর এই কার্যক্রমের পরিধি বাড়িয়েছে তেলআবিব। গত বছরের জুনে হওয়া ১২ দিনের যুদ্ধে ইসরায়েল ইরানের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের প্রায় সবাইকেই হত্যা করে।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র আচমকা ইরানে হামলা চালিয়ে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, তার পরিবারের সদস্য এবং শীর্ষ বেশ কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তাকে হত্যা করে।
সর্বশেষ ইসরায়েল হত্যা করেছে ইরানের নিরাপত্তা প্রধান আলী লারিজানি ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনী বাসিজের কমান্ডার গোলামরেজা সোলেইমানিকে।
এরমধ্যে ৬৭ বছর বয়সী লারিজানিকে হারানো ইরানের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ তিনি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। তিনি একাধারে ছিলেন রাজনীতিবিদ, টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব, ইরানের পার্লামেন্টের সাবেক স্পিকার, বিপ্লবী গার্ডের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এবং ইমানুয়েল কান্টের বিজ্ঞান ও গণিত বিষয়ক মতামতের ওপর বিশেষজ্ঞ।
লারিজানির বিষয়ে মিডল ইস্ট আইকে আমেরিকান সাংবাদিক ও স্টিমসন সেন্টারের ফেলো বারবারা স্লাভিন বলেছেন, ‘তার নানা বিষয়ে সম্পৃক্ততা ছিল’।
এত এত শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা, এমনকি দেশটির সর্বোচ্চ নেতা প্রতিপক্ষের হামলায় নিহত হওয়ার ফলে সামনের দিনে ইরান কী করবে তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
তবে অতীতের দিকে তাকালে এই পরিস্থিতিতে ইরান কী পদক্ষেপ নিতে পারে তার কিছু নমুনা দেখা যায়।
ইরান ইসলামী বিপ্লব টিকিয়ে রাখতে বহুস্তরের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব তৈরি করে রেখেছে। ফলে যখন তাদের নেতা বা সামরিক কর্মকর্তারা হত্যার শিকার হন তখন দ্রুতই তার স্থানে অন্য আরেকজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়।
আমরা এই প্রক্রিয়া দেখেছি ১২ দিনের যুদ্ধের পর নিহত শীর্ষ সেনা কর্মকর্তাদের জায়গায় দ্রুত নতুন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমে। এরপর ইরান তাদের সামরিক কার্যক্রম সচল করে।
একইভাবে এবারের যুদ্ধে সর্বোচ্চ নেতা খামেনি নিহত হলে অল্প সময়ের মধ্যে এই পদে তার ছেলে মোজতবা খামেনিকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি বিপ্লবী গার্ডসের অত্যন্ত ঘনিষ্ট বলে ধারণা করা হয়। একইভাবে নিহত সামরিক কর্মকর্তাদের জায়গায়ও নতুন কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
লারিজানির জায়গাও অন্য আরেকজনকে দ্রুত বসানো হবে। এক্ষেত্রে শোনা যাচ্ছে তার ডেপুটি সাঈদ জলিলির নাম। তিনি দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত কট্টরপন্থি হিসেবে পরিচিত।
এক্ষেত্রে ইরান হয়তো সাময়িক বেকায়দায় থাকবে। কেননা, দেশটি লারিজানির মতো একজন অভিজ্ঞ লোকের পরামর্শ থেকে বঞ্চিত। তবে তার অনুপস্থিতি ইসলামি রিপাবলিকের অস্তিত্বকে বিলীন করে দেবে না।
ইরান ও মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ সিনা তুসি মিডল ইস্ট আইকে বলেছেন, লারিজানির মৃত্যু ইরানি শাসনব্যবস্থার অস্তিত্বের জন্য মৌলিকভাবে কোনো হুমকি নয়।
তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্র একটি বহুস্তরীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা, যা এই ধরনের ক্ষতি সামাল দেওয়ার জন্যই তৈরি করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে লারিজানি কার্যত ইরানের অঘোষিত নেতা ছিলেন—বহুল প্রচলিত এ ধারণাটিও প্রত্যাখ্যান করেছেন তুসি। তার মতে, ইরান এ প্রক্রিয়ায় পরিচালিত হয় না। দেশটিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিভক্ত। যেখানে সর্বোচ্চ নেতা শীর্ষে থাকেন এবং প্রেসিডেন্ট, আইআরজিসি ও অন্যান্য সংস্থাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
‘লারিজানি প্রভাবশালী ছিলেন, কিন্তু তিনি বৃহত্তর ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন না বরং একজন অংশীদার ছিলেন’, যোগ করেন এই বিশেষজ্ঞ।
তুসির মতে, নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে হামলা সাধারণত ইরানের মতো রাজনৈতিক ব্যবস্থায় চূড়ান্ত ফলাফল এনে দিতে পারে না। এগুলো কিছু ব্যক্তিকে সরিয়ে দিতে পারে—কখনও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকেও—কিন্তু মূল কাঠামো এবং কৌশলগত চিন্তাধারা অক্ষতই থেকে যায়।
গুঞ্জন রয়েছে, লারিজানি ইরানের সাবেক সংস্কারপন্থী প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির সঙ্গে মিলে মোজতবা খামেনির বিকল্প প্রার্থী খুঁজতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাদের এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। মোজতবা খামেনিকে সর্বোচ্চ নেতা ঘোষণা করে বিশেষজ্ঞ পরিষদ। তাকে একজন রক্ষণশীল হিসেবে দেখা হয়, যার অধীনে আইআরজিসি আরও শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে পারে।
সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা ও বিশ্লেষক অ্যালান আয়ার বলছেন, লারিজানির মৃত্যুর পর কোন ব্যক্তি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে—এটা মূল প্রশ্ন নয়; বরং কোন প্রতিষ্ঠানগুলো বেশি প্রভাবশালী হবে সেটাই আসল বিষয়।
এই বিশেষজ্ঞের মতে, নিরাপত্তাপ্রধানের মৃত্যুর ফলে ইরান পরিচালনাকারী দুটি প্রধান প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব বেড়ে যাবে। সেগুলো হলো— আইআরজিসি এবং বায়ত-এ রাহবারি। বায়ত-এ রাহবারি বলতে সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয়কে বোঝানো হয়েছে।
সাবেক এই মার্কিন কর্মকর্তার মতে, ইসরায়েল ইরানের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের হত্যা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে। এর ফলে তাদের জায়গায় সম্ভবত আরও তরুণ এবং বেশি কট্টরপন্থী ব্যক্তিরা দায়িত্বে আসবেন।
ইরান তাদের নেতাদের হত্যার প্রতিশোধ নিতে ইসরায়েলে হামলা জোরদার করতে পারে। ইতোমধ্যে তারা দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনয়ামিন নেতানিয়াহুকে হত্যার হুমকি দিয়েছে। তবে ইসরায়েলের কয়েক স্তরের নিরাপত্তা ব্যুহ ভেদ করে ইরান দেশটির নেতাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে কি-না সে প্রশ্ন থেকেই যায়।
লেখক: রায়হান উদ্দিন মিডল ইস্ট আইয়ের সাংবাদিক। ভূ-রাজনীতি, সংঘাত ও মানবাধিকার নিয়ে তিনি লিখেন।

