জিলু খান: যার সুরে বাজে মন

ছবিঃ আগামীর সময়
বাংলাদেশের সংগীত ভুবনে জিলু খান বরাবরই নেপথ্যের নাম। ক্যাসেটের কভারে কিংবা কোনো অনুষ্ঠানে গায়ক যদি উল্লেখ করেন, তাহলে এই নামটি আমরা শুনি। বলা যায় কাগজে-কলমে ও কানে শোনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ এই নাম।
জিলু খানকে দেখার ইচ্ছে, তাকে নিয়ে জানার আগ্রহ বেশ কয়েক বছর ধরে। সমস্যা হলো, তিনি থাকেন ঢাকায়। চট্টগ্রামে থাকলে হয়তো দুয়ারে গিয়ে বসে থাকতাম। যা হোক, অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান। ঢাকার গুলশানে ‘১৩৮ ইস্ট’ নামে একটি ক্যাফেতে জিলু খানকে সামনাসামনি দেখলাম। কথা হলো। প্রাণ খুলে স্মৃতিচারণ করলেন।
আমরা তিনজন গুণমুগ্ধ শ্রোতা হয়ে শুনে গিয়েছি। আলাপচারিতায় ছিলেন দেশবরেণ্য গীতিকবি শহীদ মাহমুদ জঙ্গী ভাই এবং রেনেসাঁর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও ড্রামার, সুরকার শাহবাজ খান পিলু ভাই। মূলত নকীব খান ভাই এবং পিলু ভাইয়ের সৌজন্যেই জিলু খানের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হলো।
বাংলাদেশের ব্যান্ড মিউজিকে একটি গান কালজয়ী হয়ে আছে। গানটি হলো:
‘মন শুধু মন ছুঁয়েছে
ও সে তো মুখ খুলেনি
সুর শুধু সুর তুলেছে
ভাষা তো দেয়নি’
সোলসের সবচেয়ে জনপ্রিয় গান ‘মন শুধু মন ছুঁয়েছে’। এখনো এই গানটি ছাড়া সোলসের অনুষ্ঠানই হয় না। এই কালজয়ী গানটির সুরকার জিলু খান। কী অসাধারণ সুর; কয়েক প্রজন্ম ধরে গানটি গাওয়া হচ্ছে। এমন জাদুকরী সুর সৃষ্টি করে জিলু ভাই আমাদের মাঝে পরম শ্রদ্ধার আসনে আছেন। আর এই গানটির গীতিকার তার ছোট ভাই নকীব খান। এই দুই ভাই মিলে এমন একটি গান সৃষ্টি করলেন, যার মোহে আজও মোহিত শ্রোতা।
এক নজরে জিলু খান
তার পুরো নাম জালালউদ্দিন খান। পরিচিতি জিলু খান নামেই। জন্ম: ১৭ আগস্ট, ১৯৪৯। পৈতৃক নিবাস চট্টগ্রামের চুনতী গ্রামে, বিখ্যাত ডেপুটি বাড়ি। শিক্ষা ও সংস্কৃতি চর্চায় সুখ্যাতি আছে ডেপুটি বাড়ির। বংশ পরম্পরায় সংগীতের সাথে এই বাড়ির সদস্যরা যুক্ত থেকেছেন। জিলু ভাইয়ের বাবা, দাদা, নানা সকলেই গানের সাথে সম্পৃক্ত। ডেপুটি বাড়ির একটা রেওয়াজ ছিল: বিয়েতে জামাইকে বরণ করে নেয় গান গেয়ে। আর এই গান গাওয়ার জন্য আগে থেকেই মহড়া চলত। বিয়ে উপলক্ষে আয়োজন করা হত গান, নাটকের অনুষ্ঠান।
দাদা মোহাম্মদ ইউনুস খান, বাবা আইয়ুব খান, নানা বদরুল কবীর খান সিদ্দিকী— এরা সকলেই গান লিখতেন। সুর করতেন। সুতরাং এমন পারিবারিক আবহেই জিলু খানের বেড়ে ওঠা। তার বয়স যখন ১০ বছর, তখন উনার মেজ খালার বিয়ে উপলক্ষে প্রথম তিনি হারমোনিয়ামে সুর তোলেন, যা বিয়েতে জামাই বরণে গাওয়া হয়। শৈশবের এই সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠা জিলু ভাই পরবর্তী সময়েও গানের সাথেই যুক্ত থেকেছেন।
মজার স্মৃতি
একটি মজার স্মৃতিচারণ করলেন জিলু ভাই। তার ছোট ভাই নকীব খান তখন খুব ছোট। কান্না করত খুব। একদিন জিলু ভাই তার বাবাকে বললেন, একটি হারমোনিয়াম এনে দেন। হারমোনিয়ামের সুর কান্না থামাবে। বাবা এনে দিলেন। জিলু ভাই বাজানোর পর ঠিকই ছোট ভাই নকীবের কান্না বন্ধ হয়ে গেল। এই স্মৃতিচারণে চমকিত হওয়া ছাড়া উপায় নেই। ছোট্ট শিশু নকীব খানের ধমনীতে এভাবেই সুর মিশে গেল, যা পরবর্তীতে আমরা দেখলাম। নকীব খান সুরকার ও গায়ক হিসেবে বিখ্যাত হলেন।
জিংগা শিল্পী গোষ্ঠী, হিন্দোল ও বালার্ক
ষাটের দশকে জিলু ভাই চট্টগ্রাম কলেজে পড়াকালীন সময়ে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়ে গেলেন সংগীত চর্চায়। চট্টগ্রাম কলেজের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গিটার, তবলা বাজিয়েছেন। গান গেয়েছেন। ঐ সময়ে চট্টগ্রাম কলেজে গড়ে উঠে জিংগা শিল্পী গোষ্ঠী। শাফাত জামানের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই সংগীত দলে জিলু ভাই যুক্ত হলেন ১৯৬৪ সালে। ছিলেন ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত। অধ্যাপক মমতাজউদ্দিন স্যার তখন চট্টগ্রাম কলেজের অধ্যাপক। তিনি জিংগার রিহার্সাল দেখতে আসতেন। পরামর্শ দিতেন। পরবর্তী সময়ে জিংগা শিল্পী গোষ্ঠী থেকে বেরিয়ে জিলু ভাই বন্ধুদের নিয়ে ‘হিন্দোল’ নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়লেন। এই দলে তিনি একোডিয়ান বাজাতেন।
১৯৬৬ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামান স্যারের লেখা তিনটি গান সুর করলেন। বড় পরিসরে এটাই ছিল নতুন যাত্রা। ১৯৬৭ সালে রেডিওতে তালিকাভুক্ত সুরকার হলেন। ১৯৬৯ সালে ছাত্রলীগের আয়োজনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। জিলু ভাই ছিলেন দায়িত্বে। সফল অনুষ্ঠান হয়। ঐ সময়ে বন্ধু হেনা ইসলামের লেখা গান সুর করেন। গানগুলো জনপ্রিয় হয়।
১৯৭২ সালে লালদীঘি ময়দানে ২১ ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে বিশাল অনুষ্ঠান হয়। জিলু ভাই ছিলেন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের দায়িত্বে। পরবর্তীতে কানুনগোপাড়া স্যার আশুতোষ কলেজে এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে পরিচয় হয় প্রবাল চৌধুরীর সাথে। জিলু ভাইয়ের সুরে গান গেয়ে প্রবাল চৌধুরী খ্যাতি অর্জন করেছেন।
১৯৭২ সালে জিলু ভাই গড়ে তোলেন ‘বালার্ক’ নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন। এর সাথে যুক্ত ছিলেন প্রবাল চৌধুরী, উমা ইসলাম, খসরু, মিলন, দেবব্রত, রফিক, হাসনাইন, লাবু, তসলিম, রশিদ, বাহাদুর, নকীব খান ও শাহবাজ খান পিলু। চট্টগ্রামের বিভিন্ন ক্লাবে, অনুষ্ঠানে বালার্ক নিয়মিত পরিবেশন করেছে। তখন ভারতীয় বাংলা আধুনিক, ইংরেজি গানই গাওয়া হতে।
তোমরা কেন ইংরেজি গান কর?
১৯৭৩ সালে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে। জিলু ভাই বললেন, চট্টগ্রাম বন্দরে মাইন অপসারণের জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নের একটি যুদ্ধ জাহাজ আসে। তখন সেই জাহাজের এক নৌ অফিসার আমায় ডেকে বললেন, তোমরা কেন ইংরেজি গান কর? এত সুন্দর দেশ—প্রকৃতি। নিজস্ব গান গাইতে পারো।
কথাটা মনে দাগ কাটে। বালার্ক তখন থেকে মৌলিক গান পরিবেশনের দিকে আগ্রহী হয়ে ওঠে। গীতিকার হেনা ইসলামের কথা ও জিলু খানের সুরে বেশ কিছু গান তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে জিলু খান উচ্চতর শিক্ষার জন্য ঢাকা চলে গেলেন। বালার্কও আর থাকল না। ততদিনে ছোট দুই ভাই বড় হয়ে উঠছেন। সংগীতের ধারা তাদের হাতে তুলে দিয়ে ঢাকাবাসী হয়ে গেলেন জিলু খান।
তারপর লেখাপড়া শেষে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল পদে অধিষ্ঠিত হন। নানা কাজের চাপে আর গানের জগতের সাথে যুক্ত থাকতে পারলেন না তিনি। তবে চট্টগ্রামে থাকা অবস্থায় ফাঁকে ফাঁকে বেশ কিছু গানের সুর করেছেন। যার মধ্যে আছে :
> মন শুধু মন ছুঁয়েছে
> সুখ পাখি আইলো উড়িয়া
> মনে করো এখন অনেক রাত
> তোমার ঘরে উৎসব আজ
> সাতকাইন্যার থুন নোয়া বউ আইস্যে
> দরগাহে মোম জ্বেলে কি হবে
> আমার সাজানো বাসর গেছে ভেঙে
চাটগাঁইয়া গান
জিলু ভাইয়ের সুরে কুমার বিশ্বজিতের গাওয়া ‘সাতকাইন্যার থুন নোয়া বউ আইস্যে’ গানটি লিখেছেন তার পিতৃব্য উমেদ খান। গানটি চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় রচিত এবং ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।
এ বিষয়ে জিলু ভাই বললেন, চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের মধ্যে এক ধরনের ওয়েস্টার্ন ধাঁচ আছে। বিভিন্ন সময়ে ওলন্দাজ, পর্তুগিজ, ইংরেজদের আগমন ঘটে চট্টগ্রামে। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় তাদের ভাষার মিশ্রণ ঘটেছে। সেই সাথে গানেও। যার কারণে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানে বহুমাত্রিক সুর আছে, যা চাটগাঁইয়া গানকে সমৃদ্ধ করেছে।
জিলু ভাইয়ের কথার সাথে দারুণ মিল খুঁজে পেলাম। যেমন, পরবর্তী সময়ে শহীদ মাহমুদ জঙ্গী ভাইয়ের লেখা ‘ননাইয়া ননাইয়া কথা কই’ গানের ক্ষেত্রে। ওয়েস্টার্ন ব্লুজ ঘরানায় সুর করেছেন নকীব খান। এটি একটি সাহসী বিষয়। আর এই গানটি গেয়েছেন ফয়সাল সিদ্দিকী বগী। রেনেসাঁ ব্যান্ডের প্রকাশিত অডিও ক্যাসেটে গানটি আছে। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় রচিত গানকে ব্লুজের সুরে নিয়ে আসার বিষয়টি জিলু ভাইয়ের কথা সমর্থন করে।
জানতে চাইলাম নকীব খান ও পিলু খান সম্পর্কে। হেসে জিলু ভাই বললেন, ‘আমার যেখানে শেষ, সেখানেই নকীব ও পিলুর শুরু। ওদের কাছেই তুলে দিয়েছি সংগীতকে। আপন ভাই হিসেবে বলছি, ওদের বর্তমান অবস্থানে আমি সত্যিই গর্বিত।’
তার ভাষ্য, ‘নকীব এত বহুমাত্রিক সুরকার, যা আমাকে বিস্মিত করে। ওর সুরের বৈচিত্র্যতা মুগ্ধ করে। আর পিলু তো শাস্ত্রীয় সুরের সাথে আধুনিকতার দারুণ মেলবন্ধন ঘটিয়েছে। যেমন ধরো ‘আজ যে শিশু’ গানটি আরও কয়েক প্রজন্ম গাইবে। চলতে থাকবে। সুর নিয়ে তাদের দুজনের গবেষণা আমি মুগ্ধ হয়ে দেখি। আমার এই দুই ভাইয়ের জন্য অনেক দোয়া।’
জিলু খানের সাথে আলাপচারিতা আমাদের অনেক ঋদ্ধ করেছে নিশ্চয়ই। তবে অনেক কিছু জানার এখনো বাকি। জিলু ভাই যদি আরও কিছুদিন গানের সাথে যুক্ত থাকতেন, আমাদের সঙ্গীতাঙ্গন আরও সমৃদ্ধ হত।

