তারেক রহমান যেন এগোচ্ছেন বিদ্যুৎবেগে

সংগৃহীত ছবি
রাজনীতিতে প্রতিশ্রুতি নতুন কিছু নয়, নতুন হলো প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের গতি। ক্ষমতায় আসার মাত্র এক মাসের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যেভাবে ধারাবাহিকভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, তাতে মনে হচ্ছে তিনি যেন এগোচ্ছেন বিদ্যুৎবেগে। নির্বাচনী অঙ্গীকারগুলো বাস্তব কর্মসূচিতে রূপ দেওয়ার এই তাড়না দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
প্রথম উদ্যোগটি হলো ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি। নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর জন্য চালু হওয়া এই উদ্যোগ শুধু একটি প্রশাসনিক প্রকল্প নয়; এটি একধরনের সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামো। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সুবিধাভোগীদের প্রতিক্রিয়া দেখলে বোঝা যায়, দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রের কাছ থেকে এমন সহায়তার প্রত্যাশা ছিল। এই কার্ডের মাধ্যমে খাদ্য, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা-সংক্রান্ত সুবিধা নিশ্চিত হয়ে পরিবারগুলোর দৈনন্দিন জীবন অনেকটা স্থিতিশীল হবে।
দ্বিতীয় উদ্যোগটি কৃষককেন্দ্রিক। গ্রামীণ অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু কৃষক। অথচ প্রায়ই তারাই আর্থিক সংকটের সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করেন। সেই বাস্তবতায় প্রায় ১২ লাখ দরিদ্র কৃষকের সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ সুদসহ মওকুফের সিদ্ধান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। এটি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কৃষকের পাশে দাঁড়ানোর একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত। ফলে কৃষি উৎপাদন বাড়বে, ঋণের ভার মুক্ত হয়ে চাষিরা নতুন করে জমিতে মনোনিবেশ করতে পারবেন।
তৃতীয় উদ্যোগটি পরিবেশ ও কৃষি অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ১৬ মার্চ দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলায় খাল খননের মাধ্যমে ‘দেশব্যাপী নদী-নালা-খাল, জলাধার খনন ও পুনঃখনন’ কর্মসূচি উদ্বোধনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দেশের অসংখ্য খাল, নদী ও জলাধার ভরাট হয়ে পড়ে আছে। এগুলো পুনরুদ্ধার করা গেলে কৃষি, মৎস্য, পানি ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশ—সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা কমবে, সেচ সুবিধা বাড়বে এবং জলজ প্রাণীর বাসস্থান ফিরে পাবে।
চতুর্থ উদ্যোগটি ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সামাজিক সংহতির প্রতীক। ধর্মীয় উপাসনালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জন্য মাসিক সম্মানী চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দেশের ৪ হাজার ৯০৮টি মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেম, ৯৯০টি মন্দিরের পুরোহিত ও সেবায়েত, ১৪৪টি বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষ এবং ৩৯৬টি গির্জার যাজক ও সহকারী যাজক এই কর্মসূচির আওতায় আসছেন। ইমাম, পুরোহিত ও যাজকেরা মাসে ৫ হাজার টাকা, মুয়াজ্জিন, সেবায়েত, উপাধ্যক্ষ ও সহকারী যাজকেরা ৩ হাজার টাকা এবং খাদেমরা ২ হাজার টাকা করে সম্মানী পাবেন।
এছাড়া ঈদ, দুর্গাপূজা, বুদ্ধপূর্ণিমা ও বড়দিন উপলক্ষে এক থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত বিশেষ ভাতা দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। এটি শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, বরং সব ধর্মের প্রতি রাষ্ট্রের সমান মর্যাদার স্পষ্ট বার্তা। বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এই স্বীকৃতি তাঁদের আর্থিক অনিশ্চয়তা কমিয়ে সমাজসংহতির ভূমিকা আরও শক্তিশালী করবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মন্ত্রীদেরও ব্যস্ত রেখেছেন—চোখে চোখে রেখেছেন। প্রত্যেক মন্ত্রী কী করছেন তার খোঁজ রাখছেন এবং সরকারের সমস্ত উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য সরাসরি নির্দেশনা দিয়েছেন। এই তীক্ষ্ণ তদারকি ও ব্যক্তিগত নজরদারির কারণে মন্ত্রণালয়গুলোতে একধরনের গতিশীলতা তৈরি হয়েছে, যা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন আরও ত্বরান্বিত করছে।
অবশ্য যেকোনো নতুন উদ্যোগের মতো এখানেও কিছু বাস্তব প্রশ্ন রয়েছে। বর্তমানে কর্মসূচিগুলো সীমিত পরিসরে শুরু হলেও আগামী চার অর্থবছরের মধ্যে সারাদেশে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। ফলে বাজেট ব্যবস্থাপনা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোন উপাসনালয় কীভাবে অন্তর্ভুক্ত হবে, নির্বাচনের মানদণ্ড কী হবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট নীতিমালা না থাকলে বিতর্ক তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে মানুষ দীর্ঘদিন ধরে একটি বিষয় দেখতে চেয়েছে—প্রতিশ্রুতির দ্রুত বাস্তবায়ন। গত এক মাসের ঘটনাপ্রবাহ অন্তত এটুকু ইঙ্গিত দেয় যে সরকার গতি দেখাতে চায়। এখন দেখার বিষয়, এই গতি কতটা ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারে।
কারণ রাজনীতিতে গতি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—যদি এই গতির সঙ্গে সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং বাস্তব ফলাফল যুক্ত হয়, তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন ধারা তৈরি হতে পারে।



