আগামীর সময়

সংজ্ঞা বদলে দিলে কি বাস্তবতা বদলায়?

সংজ্ঞা বদলে দিলে কি বাস্তবতা বদলায়?

গত দেড় বছরে চাঁদাবাজির অভিযোগে বিএনপিকে পদে পদে বিব্রত হতে হয়েছে। বিরোধী রাজনীতির ময়দানে দাঁড়িয়ে দলটিকে বারবার আত্মপক্ষ সমর্থন করতে হয়েছে—কখনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অভিযোগে, কখনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা প্রচারণার কারণে। সেই প্রেক্ষাপটে ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে বিএনপির প্রধান তারেক রহমান যখন ‘পরিবর্তনের’ অঙ্গীকার নিয়ে নির্বাচনী প্রচারণায় নামেন, তখন দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রতিশ্রুতি ছিল তাঁর মূল বার্তা। জনগণের একটি বড় অংশও সেই প্রত্যাশায় বুক বেধেছে, নতুন সরকারকে স্বাগত জানিয়েছে।

কিন্তু সরকার গঠনের মাত্র তিন দিনের মাথায় যোগাযোগ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম তার নিজস্ব বোধ থেকে একটি বক্তব্য দিয়েছেন, যা সমালোচনার জন্ম দিয়েছে । তিনি বলেছেন, পরিবহন মালিকদের কাছ থেকে যদি ‘পারস্পরিক সমঝোতার’ মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করা হয়, তাহলে তাকে চাঁদাবাজি বলা যাবে না। একটি শব্দের ব্যাখ্যা ঘিরে এমন বিতর্ক হয়তো অন্য সময় ততটা গুরুত্ব পেত না, কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতায় এটি কেবল শব্দচয়ন নয়—এটি সরকারের নৈতিক অবস্থানের প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।

সংজ্ঞার ভেতরের সংকট

চাঁদাবাজি বলতে আমরা কী বুঝি? সাধারণত ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে, ভয়ভীতি প্রদর্শন করে বা অনৈতিক সুবিধা নিয়ে অর্থ আদায়কে চাঁদাবাজি বলা হয়। সেখানে ‘পারস্পরিক সমঝোতা’ শব্দবন্ধটি যুক্ত হলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—সমঝোতা কি সমান শক্তির দুই পক্ষের স্বতঃস্ফূর্ত সিদ্ধান্ত, নাকি প্রভাব ও চাপের আড়ালে তৈরি এক প্রকার বাধ্য সম্মতি?

পরিবহন খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দীর্ঘদিন ধরে এ খাতে অনিয়ম, অবৈধ আদায় ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর দৌরাত্ম্যের অভিযোগ রয়েছে। ফলে মন্ত্রীর বক্তব্যকে অনেকে দেখছেন সমস্যার সমাধানের পরিবর্তে সমস্যার ভাষাগত রূপান্তর হিসেবে। সংজ্ঞা বদলে দিলে কি বাস্তবতা বদলায়?

বিষয়টি নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, মন্ত্রীর এই ব্যাখ্যা সরকারের দুর্নীতিবিরোধী প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাঁর মতে, বক্তব্যটি প্রত্যাহার না করলে তা সরকারের অঙ্গীকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে এবং দুর্নীতির সংজ্ঞাকে ইচ্ছাকৃতভাবে অস্পষ্ট করে তুলবে।

টিআইবির বক্তব্য মূলত একটি সতর্কবার্তা—জনগণের আস্থা অর্জন করা কঠিন, কিন্তু হারানো সহজ। বিশেষত যখন সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা বলে, তখন মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের বক্তব্যে সেই অবস্থানের প্রতিফলন থাকা জরুরি।

বিরোধী রাজনীতির সুযোগ

বিরোধী দলগুলোও বিষয়টি হাতছাড়া করেনি। জামায়াতে ইসলামীর আমীর শফিকুর রহমান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মন্তব্য করেছেন, এই বক্তব্য প্রমাণ করে সরকার পুরনো অভ্যাসে ফিরে যাচ্ছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের জন্য এটি একটি কার্যকর হাতিয়ার—কারণ বিএনপি নিজেই গত দেড় বছর ‘চাঁদাবাজি’ অভিযোগের বোঝা বয়ে বেড়িয়েছে। এখন সরকারি মন্ত্রীর মুখ থেকে এমন ব্যাখ্যা সেই অভিযোগকে নতুন করে উসকে দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।

কিছু পত্রিকায় প্রকাশিত কার্টুন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র সমালোচনা দেখিয়ে দেয়, বিষয়টি কেবল রাজনৈতিক পরিসরে সীমাবদ্ধ নেই; সাধারণ মানুষের মধ্যেও সংশয় তৈরি হয়েছে।

কথার সঙ্গে কাজের সামঞ্জস্য অপরিহার্য

গণঅভ্যুত্থানের পর গত দেড় বছরে অন্তর্বর্তী সরকারের পার্ফর্মেন্সে অনেকের মাঝে অসন্তুষ্টি রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে নতুন সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়েছে । সরকারপ্রধান হিসেবে তারেক রহমান ইতিমধ্যে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ফ্যামিলি কার্ড চালুর উদ্যোগ, পরিবেশ রক্ষায় বছরে পাঁচ কোটি বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনাসহ নানা উন্নয়নমূলক কর্মসূচির কথা বলেছেন। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জনআস্থা।

কিন্তু জনআস্থা টিকিয়ে রাখতে হলে কথার সঙ্গে কাজের সামঞ্জস্য অপরিহার্য। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান যদি সত্যিই সরকারের নীতি হয়, তবে ‘সমঝোতা’ নাম দিয়ে কোনো অনৈতিক আর্থিক লেনদেনকে বৈধতার ইঙ্গিত দেওয়া চলবে না। সরকারের ভেতরে থেকেও যদি কেউ বিতর্কিত বক্তব্য দেন, তবে তার ব্যাখ্যা, প্রয়োজনে সংশোধন এবং স্পষ্ট নীতিগত অবস্থান ঘোষণা করা জরুরি।

সংজ্ঞা নয়, অবস্থানই মুখ্য

এই বিতর্কের কেন্দ্রে আছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—দুর্নীতির সংজ্ঞা কি রাজনৈতিক সুবিধামতো বদলানো যায়? নাকি আইনের শাসন ও নৈতিকতার ভিত্তিতে তা স্থির থাকে?

বাংলাদেশের পরিবহন খাতে দীর্ঘদিনের চাঁদাবাজির সংস্কৃতি ভাঙতে হলে প্রয়োজন কঠোর প্রয়োগযোগ্য নীতি, স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা। শব্দের কারসাজি দিয়ে সমস্যার সমাধান হয় না; বরং তা সন্দেহ বাড়ায়। এখনই স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে—চাঁদাবাজি কোনো রূপেই সহ্য করা হবে না, তা ‘সমঝোতা’ নামেই হোক বা অন্য কোনো আড়ালে।

নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ: প্রতিশ্রুত পরিবর্তনকে কাগজে-কলমে নয়, বাস্তব নীতিতে প্রমাণ করা। জনতার আস্থা অর্জনের পথ শুরু হয় স্পষ্টতা ও জবাবদিহিতার মধ্য দিয়েই।

-ডেপুটি এডিটর, দৈনিক আগামীর সময়।

    শেয়ার করুন: