রাষ্ট্রপতির ভাষণ নিয়ে ফের মুখোমুখি সরকার-বিরোধীদল

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরুর আগের দিন রাষ্ট্রপতি ইস্যুতে ফের পাল্টাপাল্টি অবস্থানের জানান দিল সরকার ও বিরোধীদল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ আরও একবার জানালেন, সাংবিধানিক রীতিতে সংসদে অবশ্যই ভাষণ দেবেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। আর জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের দলের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করলেন এই বলে যে, ‘রাষ্ট্রপতি ফ্যাসিস্টের দোসর, সংসদে তার বক্তব্য দেওয়ার অধিকার নেই।’
সংসদ অধিবেশন শুরু হচ্ছে বৃহস্পতিবার। বুধবার (১১ মার্চ) এ নিয়ে সরকার ও বিরোধীদল আলাদাভাবে বৈঠকে বসেছে। বের হয়ে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান দুই নেতা।
বেলা সোয়া ১১টার দিকে সংসদ ভবনে সংসদনেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে বৈঠক করে ক্ষমতাসীন বিএনপির সংসদীয় দল।
‘জুলাই সনদের সব কিছু আমরা ধারণ করব। আগামীকাল বেলা ১১টায় জাতীয় সংসদের অধিবেশন বসবে। সংসদে রাষ্ট্রপতি ভাষণ দেবেন। এই সংসদেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হবে। তাদের শপথ গ্রহণ করাবেন রাষ্ট্রপতি’, বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের জানালেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
অন্যদিকে, সংসদ ভবনের সভাকক্ষে বৈঠক করেন জামায়াত-এনসিপিসহ বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা। সভাপতিত্ব করেন জামায়াত আমির ও প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। শেষে বের হয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বললেন বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. তাহের।
‘অধিবেশনে এই রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেওয়ার কোনো অধিকার নেই। বিএনপি কী কারণে এ কাজটি করছে, তা বোধগম্য নয়... অধিবেশনে ডেপুটি স্পিকারের বিষয়ে বিরোধী দলের একটি আলোচনা হয়েছে। প্রস্তাব আসার পরে সিদ্ধান্ত জানানো হবে।’
পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পাওয়া মো. সাহাবুদ্দিনকে নিয়ে তর্ক-বিতর্ক সেই চব্বিশের ৫ আগস্ট থেকে চলছে। বিএনপি বরাবরই সংবিধানের নিয়ম-রীতি মেনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। আর জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তখন থেকেই চেয়ে আসছে অপসারণ- খোদ রাষ্ট্রপতি তুলেছেন এমন অভিযোগ।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর থেকে দেড় বছর প্রায় গৃহবন্দি রাষ্ট্রপতিকে জনসম্মুখে দেখা গেছে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে। নতুন সংসদে তাকে রাখা হবে কিনা- এ নিয়ে চলেছে নানা জল্পনা-সমালোচনা।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ কিছুদিন আগে একবার বলেছিলেন, ‘রাষ্ট্রপতি কোনো ব্যক্তি নয়, একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। সংসদ অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেওয়ার রেওয়াজ আছে। সে অনুযায়ী ভাষণ দেবেন তিনি।’
‘বিরোধী দলকে লিখিতভাবে ডেপুটি স্পিকারের প্রস্তাব দেওয়ার বিধান নেই। তবে এ ক্ষেত্রে আমরা উদারতা দেখিয়েছি। জামায়াতকেও তা উদারভাবে গ্রহণ করা উচিত’- পরামর্শ দিয়েছিলেন তিনি।
অন্যদিকে গতকাল মঙ্গলবারও এনসিপি নেতা ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম জানিয়েছেন, ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ ও গ্রেপ্তারের দাবি।
এই রাষ্ট্রপতির কাছে শপথ নিয়েই ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার, যার প্যানেলে ছিলেন অভ্যুত্থানের তরুণ তিন নেতা।
রাষ্ট্রপতির অপসারণের পক্ষে সম্প্রতি এনসিপি খোলামেলা অবস্থান জানান দিলেও জামায়াত ছিল কিছুটা কৌশলী।
রাষ্ট্রপতির সাম্প্রতিক সময়ের আলোচিত সাক্ষাৎকারের কড়া সমালোচনা করলেও জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা গত ২৭ ফেব্রুয়ারি জানিয়েছিলেন, রাষ্ট্রপতির অভিশংসন ইস্যুতে দেশের স্বার্থ ও জনগণের কল্যাণকে প্রাধান্য দিয়েই সিদ্ধান্ত নেবে তার দল।
সিলেটে সেদিন তিনি এ-ও বলেছিলেন, ‘রাষ্ট্রপতির অভিশংসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক বিষয়ে হঠাৎ করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। আমাদের দলীয় ফোরামে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হবে। দেশের জন্য যা কল্যাণকর এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, আমরা সে সিদ্ধান্তই নেব।’
২০২৩ সালে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পছন্দের মানুষ সাহাবুদ্দিন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তিনি ছাত্রজীবন থেকে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর পথে নেমে প্রতিবাদ করায় তরুণ ছাত্রনেতা সাহাবুদ্দিনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। তিন বছর জেলে ছিলেন তিনি।

