বাবা আওয়ামী লীগ, ছেলে বিএনপির প্রতিমন্ত্রী

ফাইল ছবি
পিরোজপুর-২ আসনে বাবা-ছেলের রাজনৈতিক পরিচয় নজর কাড়ছে সবার। বাবা নূরুল ইসলাম মঞ্জুর আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ভোটে জিতে তিনি প্রথম সংসদ সদস্য হিসেবে যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। এরপর মোশতাক আহমেদ সরকারের মন্ত্রিসভায়ও প্রতিমন্ত্রী হন।
পরবর্তীতে শহীদ জিয়াউর রহমান বিএনপি প্রতিষ্ঠা করলে দলটিতে যোগ দেন নূরুল ইসলাম মঞ্জুর। দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও তিনি আর মন্ত্রিসভায় সুযোগ পাননি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পিরোজপুর-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়ী হন তার ছেলে সোহেল মঞ্জুর। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৫ হাজার ১৮৫ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী শামীম সাঈদী, যিনি ৯৬ হাজার ৮৯৭ ভোট পান। নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর সোহেল মঞ্জুর গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন।
নূরুল ইসলাম মঞ্জুরের রাজনৈতিক জীবন
১৯৩৬ সালের ২৬ মে পিরোজপুর জেলায় জন্ম নেওয়া নূরুল ইসলাম মঞ্জুর পাকিস্তান আমলে এমএনএ (ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি সদস্য) ছিলেন। স্বাধীনতার পর তিনি আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন এবং মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। শেখ মুজিবুর রহমানর চতুর্থ মন্ত্রিসভায় যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭৩ সালে তিনি বাকেরগঞ্জ-৮ (বরিশাল সদর) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তবে ২১ জুলাই ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিব তাকে পদ থেকে বরখাস্ত করেন। পরে ১৯৭৫ সালের আগস্টে শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ডের পর তিনি মোশতাক সরকারের রেলপথ ও যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী হিসেবে যোগ দেন।
১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হয়ে পিরোজপুর-২ আসন (কাউখালী, ভাণ্ডারিয়া ও নেছারাবাদ) থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তবে ১৯৯৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জেল হত্যা মামলায় বিএনপির শীর্ষ নেতা কে এম ওবায়দুর রহমান ও শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনর সঙ্গে গ্রেপ্তার হন। ২০০৪ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এলে তিনি সেই মামলায় খালাস পান।
২০০১ ও ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হয়ে পিরোজপুর-২ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও পরাজিত হন। তবু জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তিনি দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধে পারিবারিক অবদান
নূরুল ইসলাম মঞ্জুরের পরিবার মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত ছিল। পরিবারের সদস্য ক্যাপ্টেন হুদা ৯ নম্বর সেক্টরের সহঅধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং বিভিন্ন সামরিক অভিযান পরিচালনায় নেতৃত্ব দেন।
আরেক সদস্য নূরুল হক লাকুটিয়া মুক্তিযুদ্ধ ক্যাম্পে প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি নতুন যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করেন।
পরিবারের আরেক সদস্য নূরুল আলম ফরিদ মুক্তিযুদ্ধকালীন দৈনিক বিপ্লবী বাংলাদেশের সম্পাদক ছিলেন। পাশাপাশি অভ্যর্থনা কমিটির দায়িত্বও পালন করেন।
নূরুল ইসলাম মঞ্জুর নিজে সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য ও আগরতলা মামলার আইনজীবী ছিলেন। তার স্ত্রী ডা. সুফিয়া বেগম ৯ নম্বর সেক্টরের মেডিকেল অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং পরবর্তীতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক হিসেবে অবসর নেন।
সব মিলিয়ে, নূরুল ইসলাম মঞ্জুরের রাজনৈতিক জীবন যেমন দ্বন্দ্ব ও পরিবর্তনের সাক্ষী, তেমনি তাঁর পরিবারের সম্মিলিত অবদান দক্ষিণাঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে রয়েছে।

