মাতৃভাষা দীনের অন্যতম বাহন

প্রতীকী ছবি
মানুষকে অন্যান্য সৃষ্টির থেকে আলাদা করে যে গুণটি তাকে সত্যিকার অর্থে সভ্যতার উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে, তা হলো তার প্রকাশক্ষমতা। মানুষ শুধু দেখে না, অনুভব করে; শুধু অনুভব করে না, তা প্রকাশও করে। চিন্তা, অনুভূতি, জ্ঞান, বিশ্বাস, ইতিহাস ও সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা রক্ষার প্রধান মাধ্যমই ভাষা। ভাষা না থাকলে মানুষ একাকী হয়ে যেত, সমাজ গড়ে উঠত না, জ্ঞান এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে পৌঁছাত না। তাই ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি মানুষের অস্তিত্ব, পরিচয় ও সভ্যতার ভিত্তি।
ভাষা আমাদের প্রতিমুহূর্তের জীবনে এক অনিবার্য অবলম্বন। মূলত ভাষাই জীবনের সকল কর্মপ্রবাহে আমাদের প্রধান নির্ভরতা। এই ভাষাই পৃথিবীর সবকিছু বর্ণনার বাহন। তাই এ কথা অবলিলায় বলা যায় যে, আমাদের ভাষা মহান আল্লাহর দেয়া নেয়ামতগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামত। পবিত্র কোরআনের সুরা আর-রহমানে মানবজাতির প্রতি প্রদত্ত বিশেষ নিয়ামতসমুহের উল্লেখ করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘করুণাময় আল্লাহ, শিক্ষা দিয়েছেন কোরআন, সৃষ্টি করেছেন মানুষ, তাকে শিখিয়েছেন বর্ণনা।’ (সুরা আর-রহমান: আয়াত : ১-৪)
এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, মানুষের জন্য বর্ণনা বা প্রকাশক্ষমতা একটি বিশেষ দান। আর এ বর্ণনার প্রধান বাহনই হলো ভাষা। পৃথিবীতে একটি বা দুটি নয়, অসংখ্য ভাষার সমাবেশ রয়েছে। এই ভাষাগত বৈচিত্র্যও আল্লাহর অসীম কুদরতের নিদর্শন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে আসমানসমূহ ও যমীনের সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের ভিন্নতা।’ (সুরা রূম, আয়াত : ২২)
এই বিচিত্র ভাষার জগতে প্রত্যেক মানুষের জন্য তার মাতৃভাষাই সবচেয়ে স্বাভাবিক ও হৃদয়গ্রাহী প্রকাশের মাধ্যম। মানুষ তার গভীরতম অনুভূতি, আনন্দ-বেদনা, সংস্কৃতি ও চিন্তার সবচেয়ে স্বচ্ছ প্রকাশ ঘটাতে পারে মাতৃভাষার মাধ্যমে। আমাদের বাংলা ভাষার কবি ফররুখ আহমদ মাতৃভাষাকে আল্লাহর এক বিশেষ দান হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন— “মাতৃভাষা বাংলা ভাষা, খোদার সেরা দান, বিশ্ব ভাষার সভায় তোমার, রূপ যে অনির্বাণ”
মানবজাতির কাছে আল্লাহর বাণী পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও মাতৃভাষার গুরুত্ব বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি প্রত্যেক রাসূলকে তার স্বজাতির ভাষায় প্রেরণ করেছি, যাতে সে তাদের কাছে বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করতে পারে।’ (সূরা ইবরাহিম, আয়াত : ৪)
এ আয়াত থেকে স্পষ্ট যে, কোনো জাতির কাছে দ্বীনের বাণী বোধগম্যভাবে পৌঁছে দিতে হলে তাদের ভাষাই সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম। এ কারণে মাতৃভাষার গুরুত্ব শুধু সাংস্কৃতিক নয়, দাওয়াহ ও জ্ঞান প্রচারের ক্ষেত্রেও অপরিসীম। মূসা (আ.)-এর জীবনে আমরা ভাষার গুরুত্বের আরেকটি বাস্তব দৃষ্টান্ত পাই। ফেরাউনের কাছে দাওয়াত প্রদানের নির্দেশ পেয়ে তিনি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন, ‘আমার বক্ষ সংকুচিত হয়ে আসে এবং আমার জিহ্বা সাবলীল নয়; অতএব হারুনকে আমার সহকারী করুন। সে আমার চেয়ে স্পষ্টভাষী।’ (সুরা শুআরা, আয়াত : ১৩-১৪, ভাবার্থ)
এ ঘটনা প্রমাণ করে, কোনো সত্য বার্তা মানুষের হৃদয়ে পৌঁছানোর জন্য স্পষ্ট, সাবলীল ও প্রাঞ্জল ভাষা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণেই শেষ নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে এমন ভাষাগত প্রজ্ঞা ও সাহিত্যিক সৌন্দর্য দান করা হয়েছিল, যা আরবি ভাষাকে অনন্য উচ্চতায় উন্নীত করেছে। তাঁর বাণীর সংক্ষিপ্ততা, গভীরতা ও অলংকারময়তা আজও আরবি সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, নবী-রাসূলগণ শুধু নিজ জাতির ভাষায় কথা বলতেন তা নয়; বরং সেই ভাষায় তারা বিশেষ দক্ষতা ও প্রভাবশালী উপস্থাপনার ক্ষমতা লাভ করেছিলেন। যাতে মানুষের হৃদয়ে দ্বীনের বাণী গভীরভাবে প্রভাব ফেলতে পারে। প্রিয় নবী (সা.)-এর হাদিসসমূহে ভাষার সৌন্দর্য, উপমা, প্রাঞ্জলতা ও ভাবগভীরতার যে সমন্বয় দেখা যায়, তা আজও সাহিত্যবিশ্বে বিস্ময়ের বিষয়।
বিখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ আল্লামা আবুল হাসান আলী নদভী (রহ.) এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন যে, নবীদেরকে স্বজাতির ভাষায় প্রেরণের অর্থ শুধু ভাষা জানা নয়; বরং সেই ভাষা ও সাহিত্যের উচ্চতর মানে পৌঁছানো এবং তাতে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করা। তাঁর মতে, ইসলামের ইতিহাসে যারা মুসলিম সমাজের চিন্তা ও চেতনায় গভীর প্রভাব রেখেছেন, তারা প্রায় সবাই শক্তিশালী ভাষা ও লেখনীর অধিকারী ছিলেন। তাঁদের বক্তব্যে ছিল বিশুদ্ধতা, প্রাঞ্জলতা ও সাহিত্যিক সৌন্দর্য।
এ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়। ভাষা যদি দুর্বল, অশুদ্ধ বা প্রাণহীন হয়, তবে তা মানুষের হৃদয়ে গভীর প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে না। সত্য, আদর্শ ও মূল্যবোধ মানুষের অন্তরে পৌঁছাতে হলে ভাষার মধ্যে স্বচ্ছতা, সৌন্দর্য ও মাধুর্য থাকা প্রয়োজন। আমাদের পূর্বসূরি আলেম ও মনীষীরা নিজ নিজ মাতৃভাষায় যে দক্ষতা অর্জন করেছিলেন, তা তাদের চিন্তার প্রভাব বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
সুতরাং মাতৃভাষা শুধু আবেগ বা পরিচয়ের বিষয় নয়; এটি জ্ঞানচর্চা, সংস্কৃতি সংরক্ষণ এবং দ্বীনের বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম কার্যকর মাধ্যম। মাতৃভাষাকে যত সমৃদ্ধ, শুদ্ধ ও প্রাঞ্জল করা যাবে, ততই সমাজে জ্ঞানের আলো ও ইসলামের সৌন্দর্য গভীরভাবে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে। মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা ভালোলাগা আর দক্ষতা অর্জনের তাওফিক দান করুন।আমীন।
লেখক: শিক্ষার্থী, এন আকন্দ কামিল মাদরাসা, নেত্রকোনা।

