ইরান যুদ্ধের ফসল ঘরে তুলল যারা

ব্রিটিশ তেল কোম্পানি সেলের একটি বিক্রয় কেন্দ্র। ছবি : সংগৃহীত
বিশ্বজুড়ে প্রায় সবাই যখন ইরান যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করছে, তখন কিছু কোম্পানি উল্টো বিপুল মুনাফা লুটেছে।
এই সংঘাতের অনিশ্চয়তা এবং ইরানের কার্যকরভাবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে। যা প্রতিষ্ঠান, পরিবার, এমনকি সরকারগুলোকে পর্যন্ত অস্বস্তিতে রেখেছে।
যুদ্ধের ধাক্কায় যেখানে কেউ কেউ খাদের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে, সেখানে আবার কেউ রেকর্ড পরিমাণ আয় করেছে—যাদের মূল ব্যবসা যুদ্ধের সময় বেশি লাভজনক হয় অথবা যারা জ্বালানির অস্থির মূল্য থেকে লাভবান হয়।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও যে সমস্ত খাত ও সংস্থা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করছে, তার কয়েকটি এখানে উল্লেখ করা হলো:
তেল ও গ্যাস
এখন পর্যন্ত ইরান যুদ্ধের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক প্রভাব হলো জ্বালানির দামের আকস্মিক বৃদ্ধি। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়, কিন্তু ফেব্রুয়ারির শেষ থেকেই সেই চালানগুলো কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
এর ফলে জ্বালানি বাজারে দামের ব্যাপক ওঠানামা দেখা গেছে, যাতে বিশ্বের কয়েকটি বৃহত্তম তেল ও গ্যাস কোম্পানি লাভবান হয়েছে।
এর প্রধান সুবিধাভোগী হয়েছে ইউরোপিয়ান তেল কোম্পানিগুলো। সরাসরি বিক্রয় শাখা থাকায় তারা দামের আকস্মিক ওঠানামা থেকে লাভবান হতে পেরেছে।
তেল কোম্পানি বিপির সরাসরি বিক্রয় বিভাগ এ সময়ে বড় অঙ্কের মুনাফা করেছে। এতে, বছরের প্রথম তিন মাসে সংস্থাটির মুনাফা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ৩.২ বিলিয়ন ডলার (২.৪ বিলিয়ন পাউন্ড) হয়েছে।
ব্রিটিশ জ্বালানি কোম্পানি শেলও আর্থিক মুনাফায় তাদের প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে গেছে। কোম্পানিটির প্রথম ত্রৈমাসিকের (তিন মাস) মুনাফা বেড়ে ৬.৯২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে।
তেল ও জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার কারণে আরেকটি আন্তর্জাতিক বৃহৎ প্রতিষ্ঠান টোটালএনার্জিসের মুনাফা ২০২৬ সালের প্রথম ত্রৈমাসিকে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৫.৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে সরবরাহ কমে যাওয়ায় মার্কিন বৃহৎ তেল কোম্পানি এক্সনমোবিল ও শেভরনের আয় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে। কিন্তু আশা করা যাচ্ছে যে বছর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তাদের মুনাফা আরও বাড়বে। কারণ যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময়ের তুলনায় তেলের দাম এখনও যথেষ্ট বেশি।
বড় ব্যাংক
ইরান যুদ্ধের কারণে কয়েকটি বড় ব্যাংকের মুনাফাও বৃদ্ধি পেয়েছে। জেপি মরগ্যানের বিক্রয় শাখা ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে রেকর্ড ১১.৬ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে, যা ব্যাংকটির ইতিহাসে সর্বকালের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ত্রৈমাসিক মুনাফা।
‘বিগ সিক্স’-এর বাকি ব্যাংকগুলোর বছরের প্রথম ত্রৈমাসিকে মুনাফা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
যার মধ্যে রয়েছে ব্যাংক অফ আমেরিকা, মরগ্যান স্ট্যানলি, সিটিগ্রুপ, গোল্ডম্যান স্যাক্স ও ওয়েলস ফার্গো। সামগ্রিকভাবে, ব্যাংকগুলো ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে ৪৭.৭ বিলিয়ন ডলার মুনাফা করেছে বলে জানিয়েছে।
ওয়েলথ ক্লাবের প্রধান বিনিয়োগ কৌশলবিদ সুসানাহ স্ট্রিটার মনে করেন, বিপুল পরিমাণ লেনদেন ও বিনিয়োগ ব্যাংকগুলোকে বিশেষ করে মরগ্যান স্ট্যানলি ও গোল্ডম্যান স্যাকসকে লাভবান করেছে।
প্রতিরক্ষা
আরএসএম ইউকে-এর সিনিয়র বিশ্লেষক এমিলি সাউইচের মতে, যেকোনো সংঘাতের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক সুবিধাভোগীদের মধ্যে অন্যতম হলো প্রতিরক্ষা খাত।
তার দাবি, এই সংঘাত বিমান ও আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতার ঘাটতিগুলোকে সামনে তুলে ধরেছে। যার ফলে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা, ড্রোন-প্রতিরোধী ব্যবস্থা এবং সামরিক সরঞ্জাম খাতে বিনিয়োগ বেড়েছে।
এই যুদ্ধ সরকারগুলোর জন্য অস্ত্রের মজুদ পূরণের ব্যাপক চাহিদা তৈরি করেছে, যা প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবসায়ীগোষ্ঠীর জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে।
এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের যন্ত্রাংশসহ বিভিন্ন পণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বিএই সিস্টেমস বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, তারা এ বছর বিক্রি ও মুনাফায় বড় আকারের মুনাফার প্রত্যাশা করছে।
বিএই দাবি করেছে, বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা হুমকির কারণে সরকারগুলো প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা কোম্পানিটির জন্য একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরি করেছে।
বিশ্বের বৃহত্তম প্রতিরক্ষা ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান লকহিড মার্টিন, বোয়িং এবং নর্থরপ গ্রুম্যান প্রত্যেকেই ২০২৬ সালের প্রথম ত্রৈমাসিকের শেষে রেকর্ড পরিমাণ অর্ডার পাওয়ার কথা জানিয়েছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি
ওয়েলথ ক্লাবের কৌশলবিদ স্ট্রিটার মনে করেন, এই সংঘাত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বৈচিত্র্য আনার প্রয়োজনীয়তাকেও তুলে ধরেছে।
তার মত, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও নবায়নযোগ্য খাতে আগ্রহ বহুগুণে বেড়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোতে উৎসাহ দিতে ‘ড্রিল, বেবি, ড্রিল’ স্লোগানটিকে জনপ্রিয় করেছে।
স্ট্রিটারের ভাষ্য, এই যুদ্ধের ফলে স্থিতিশীলতা এবং বিভিন্ন প্রতিকূলতা মোকাবেলার সক্ষমতার জন্য নবায়নযোগ্য খাতে বিনিয়োগ ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
ফ্লোরিডা-ভিত্তিক নেক্সটএরা এনার্জির প্রতি বিনিয়োগকারীরা বিপুল আগ্রহ দেখানোয় চলতি বছর এখন পর্যন্ত সংস্থাটির শেয়ারের দাম ১৭ শতাংশ বেড়েছে।
বাতাস থেকে নানাধরণের শক্তি উৎপাদনকারী ডেনমার্কের বৃহৎ দুটি সংস্থা ভেস্টাস এবং অরস্টেডও তাদের মুনাফা বাড়ানোর খবর জানিয়েছে।
এদিকে ব্রিটিশ অক্টোপাস এনার্জি সম্প্রতি জানিয়েছে, এই যুদ্ধের কারণে সোলার প্যানেল ও হিট পাম্পের বিক্রি হুট করে অনেক বেড়ে গেছে এবং ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে সোলার প্যানেলের বিক্রি ৫০ শতাংশ বেড়ে গেছে।
এছাড়া পেট্রোলের সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির ফলে বৈদ্যুতিক গাড়ির চাহিদাও বিশ্বব্যাপী বেড়েছে। বিশেষ করে চীনা নির্মাতারা এই সুযোগ ভালভাবে ব্যবহার করছে।
বিবিসি অবলম্বনে





