আগামীর সময়

ইসরায়েলের চাপে নিজের ঘর নিজেই ভাঙছেন ফিলিস্তিনিরা

ইসরায়েলের চাপে নিজের ঘর নিজেই ভাঙছেন ফিলিস্তিনিরা

নিজেদের ঘর ভাঙছে একটি ফিলিস্তিনি পরিবার। ছবি: সংগৃহীত

অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের দক্ষিণে সুর বাহেরে বাসেমা দাবাশ এবং তার স্বামী রায়েদ তাদের বাড়ি গুঁড়িয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। এই বাড়ির জন্য এখন প্রতিদিন চোখের পানি ফেলেন তারা।

২০১৪ সালে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ প্রথমবার তাদের বাড়ি ভেঙে ফেলতে বলে। এরপর থেকেই তারা দিনের পর দিন কাটিয়েছেন উচ্ছেদ আতঙ্কে।

এই বছরের জানুয়ারিতে চূড়ান্ত উচ্ছেদের নোটিশ আসে। এরপর ১২ ফেব্রুয়ারি বাড়ি ভাঙা শেষ হয়। এ কাজ ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ করেনি, করতে হয়েছে বাসেমা ও তার স্বামীকে। যদি কর্তৃপক্ষ এই ঘর ভাঙত, তাহলে তাদের এ কাজের জন্য দিতে হতো অর্থ।

বাসেমা ভবন ভাঙার নোটিশ পাওয়ার পর আদেশ স্থগিত করার জন্য একটি ইসরায়েলি আদালতে আপিল করেন। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে পরিবারটিকে তাদের বাড়ি অক্ষত রাখতে জরিমানা দিতে বাধ্য করা হয়েছিল। কিন্তু জানুয়ারিতে তাদের চূড়ান্ত নোটিশ দিয়ে বাড়ি ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়।

৫১ বছর বয়সী বাসেমা বলেছেন, পৌরসভার বাড়ি ভাঙার ফি এড়াতে আমরা বাড়ি নিজেরাই ভাঙতে বাধ্য হয়েছি। বাড়ি ভাঙতে কর্তৃপক্ষ ১ লাখ শেকেল (৩২ হাজার ডলার) ফি দাবি করে।

‘ভেতরের দিক থেকে ঘর ভাঙা শুরুর পর আমরা কর্তৃপক্ষকে ছবি পাঠাই। তারা বলে যে, বাইরের অংশ থেকে ঘর ভাঙতে হবে’, যোগ করেন এই ফিলিস্তিনি।

পরিবারটি দ্রুতই তাদের দুটি বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়ার কাজ শেষ করে, যেখানে আটজন বসবাস করতেন। এরমধ্যে তিনজন শিশুও ছিল। ঘর গুঁড়িয়ে দিয়েও জরিমানার হাত থেকে রক্ষা পায়নি বাসেমার পরিবার। তাদের ৪৫ হাজার শেকেল (১৪ হাজার ৬০০ ডলার) জরিমান দিতে হবে কিস্তিতে।

পূর্ব জেরুজালেমে বসবাসকারী ফিলিস্তিনিদের নানা অজুহাতে এভাবে ঘর থেকে উচ্ছেদ করছে দখলদার ইসরায়েল। আর নিজের হাতে নিজের ঘর ভাঙার আতঙ্কে দিন পার করছে অসংখ্য পরিবার।

ঘর ভাঙার নোটিশ এলে পথ খোলা থাকে দুটি। এক. নিজের ঘর নিজে ভাঙা। দুই. কর্তৃপক্ষকে ঘর ভাঙার জন্য টাকা দেওয়া।

ফিলিস্তিনিদের বিশাল অংশ ঘর ভাঙার জন্য কর্তৃপক্ষকে টাকা দেওয়ার সামর্থ্য রাখে না। ফলে প্রচণ্ড মনোবেদনা ও শারীরিক ধকল গেলেও তারা নিজেদের ঘরবাড়ি নিজেরাই ভেঙে ফেলতে বাধ্য হন।

পূর্ব জেরুজালেম এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে অবৈধ ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ অব্যাহত থাকায় ঘর নির্মাণের অনুমতি সহজেই পাওয়া যাচ্ছে। তবে ফিলিস্তিনিরা বলছেন, ঘর নির্মাণের অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্য করা হয়।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্যমতে, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ফিলিস্তিনিদের জন্য ভবন নির্মাণের অনুমতি পাওয়া কার্যত অসম্ভব করে তুলেছে।

অন্যদিকে ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থা বি'তসেলেম বলেছে, পূর্ব জেরুজালেমে পরিকল্পনা নীতির কারণে সেখানকার বাসিন্দাদের জন্য ভবন নির্মাণের অনুমতি পাওয়া খুব কঠিন হয়ে পড়েছে।

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের জেরুজালেম গভর্নরেটের মুখপাত্র মারুফ আল-রিফাই আল জাজিরাকে বলেছেন, গত ফেব্রুয়ারিতে ১৫টি, জানুয়ারিতে পাঁচটি এবং ডিসেম্বরে ১০৪টি ঘর ধ্বংসের ঘটনা ঘটেছে, যেগুলো ধ্বংস করতে হয়েছে বাড়ির মালিকদেরই।

২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যা শুরু হওয়ার পর এই ঘরভাঙার প্রক্রিয়া বৃদ্ধি পেয়েছে। আল-রিফাই বলেছেন, ২০২৫ সালে পূর্ব জেরুজালেম এবং এর আশপাশের এলাকায় পৌরসভার কর্মীদের দ্বারা অথবা বাড়ির মালিকদের দ্বারা ৪০০ ঘর গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এর আগে, প্রতি বছর ঘর ভাঙার সর্বোচ্চ সংখ্যা ছিল ১৮০টি।

জাতিসংঘ জানিয়েছে, ২০২৫ সালে ঘর ধ্বংসের ফলে ১ হাজার ৫০০ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের এক কর্মকর্তা বলেন, জেরুজালেমে ফিলিস্তিনিদের বাড়ি ভাঙার জন্য জারি করা নোটিশ যুদ্ধের আগে ২৫ হাজার থেকে বেড়ে ৩৫ হাজারে পৌঁছেছে। শুধু সিলওয়ান শহরেই ১৯৬৭ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ৭ হাজার বাড়ি ভাঙার নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

সূত্র : আলজাজিরা

    শেয়ার করুন: