আগামীর সময়

ইরান যুদ্ধ নিয়ে নতুন ব্যাখ্যা মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর

ইরান যুদ্ধ নিয়ে নতুন ব্যাখ্যা মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর

সংগৃহীত ছবি

ইরানে সামরিক হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন ব্যাখ্যা দিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তার দাবি, ইসরায়েল ইরানে হামলার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল এবং একবার হামলা শুরু হলে তেহরানের পাল্টা আঘাতের লক্ষ্যবস্তু হতো মার্কিন সেনারা। সম্ভাব্য সেই ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়েই ট্রাম্প প্রশাসন আগাম হামলার পথ বেছে নেয়।

ইরান–ইসরায়েল সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সম্পৃক্ততা নিয়ে দেশটির রাজনীতিতে বিস্ময় ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সোমবার সন্ধ্যায় ওয়াশিংটনের স্থানীয় সময় কংগ্রেসে অনুষ্ঠিত রুদ্ধদ্বার শুনানিতে এ বিষয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সেখানে উপস্থিত ছিলেন সিআইএর পরিচালক জন র‌্যাটক্লিফ এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান ড্যান কেইন।

শুনানি শেষে ক্যাপিটলে সাংবাদিকদের রুবিও বলেছেন, ‘এটা প্রায় নিশ্চিত ছিল যে ইরানে যে কেউ হামলা করলে, তেহরানের জবাব যুক্তরাষ্ট্রের দিকেই আসত।’

তার ভাষ্য, প্রশাসন আগে থেকেই জানত ইসরায়েল পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে এবং তার প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন বাহিনীর ওপর হামলার ঝুঁকি তৈরি হবে। তাই সম্ভাব্য বেশি হতাহতের আশঙ্কা এড়াতেই আগাম আঘাত হানা হয়েছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য হলো ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না দেওয়া। তার বক্তব্য, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিশ্বকে পরিষ্কার বার্তা দিতে চান যে এই লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তিনি থামবেন না।

উল্লেখ্য, ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতর ইরানে সামরিক হস্তক্ষেপের প্রশ্নে শুরুতে সবচেয়ে জোরালো আপত্তি তুলেছিলেন জেডি ভ্যান্স। তবে সাম্প্রতিক ঘটনায় তিনি তুলনামূলক সংযত অবস্থান নিয়েছেন এবং এ বিষয়ে রুবিওর তুলনায় কম প্রকাশ্য মন্তব্য করেছেন।

চলতি সপ্তাহের শেষদিকে কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে ইরান যুদ্ধ নিয়ে একটি প্রস্তাবের ওপর ভোটাভুটি হতে পারে। প্রস্তাবে প্রেসিডেন্টকে ইরানের বিরুদ্ধে শত্রুতা বন্ধে বাধ্য করার আহ্বান জানানো হতে পারে। তবে এটি পাস হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি নয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় ধারাবাহিক বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। পাল্টা জবাবে তেহরান মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তীর্ণ এলাকায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত রেখেছে। ফলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।

এই যুদ্ধকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে স্পষ্ট বিভক্তি দেখা দিয়েছে। রিপাবলিকান নেতৃত্ব সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পদক্ষেপকে সমর্থন করলেও ডেমোক্র্যাটরা এটিকে ‘অপ্রয়োজনীয় সংঘাত’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। তাদের দাবি, যুদ্ধের উদ্দেশ্য পরিষ্কার নয় এবং এর শেষ কোথায়—সে বিষয়েও কোনো সুস্পষ্ট রূপরেখা নেই।

সিনেটে ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা চাক শুমার বলেছেন, ‘এটা ট্রাম্পের যুদ্ধ। এই যুদ্ধ বেছে নেওয়া হয়েছে। তার কোনো কৌশল নেই, কীভাবে যুদ্ধ শেষ হবে তারও কোনো পরিকল্পনা নেই।’

তিনি আরও অভিযোগ করেছেন, শুনানিতে আইনপ্রণেতারা বহু প্রশ্ন তুললেও সন্তোষজনক জবাব পাননি। তার ভাষায়, ‘অনেক বেশি প্রশ্ন উঠেছে, কিন্তু সেগুলোর উত্তর দেওয়া হয়নি।’

সিনেট ইন্টেলিজেন্স কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান মার্ক ওয়ার্নারও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, ইসরায়েলকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র নতুন এক জটিল যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে। তিনি বলেন, ‘ইরানিদের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আসন্ন কোনো হুমকি ছিল না। হুমকি ছিল ইসরায়েলের প্রতি। যদি আমরা ইসরায়েলের প্রতি হুমকিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আসন্ন হুমকি হিসেবে দেখি, তাহলে আমরা একটি অজানা পরিস্থিতিতে পড়ে যাই।’

রুদ্ধদ্বার শুনানিতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা ইরানে হামলা-সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। শুনানি শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন মার্ক ওয়ার্নার। ২ মার্চ অনুষ্ঠিত ওই ব্রিফিং ঘিরেও কৌশলগত অস্পষ্টতার অভিযোগ ওঠে।

ইরানে হামলার পর ট্রাম্প একাধিক লক্ষ্য তুলে ধরেছিলেন। সেগুলোর মধ্যে ছিল—ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ও নৌবাহিনী ধ্বংস করা, দেশটিকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে বাধা দেওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যে তথাকথিত ‘প্রক্সি’ বাহিনীগুলোর প্রতি তেহরানের সমর্থন বন্ধ করা। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও সাম্প্রতিক বক্তব্যে মাত্র দুটি লক্ষ্য উল্লেখ করেছেন—ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ও নৌবাহিনী ধ্বংস করা।

গোপন শুনানি শেষে মার্ক ওয়ার্নার বলেন, ট্রাম্প এই যুদ্ধের পরিসমাপ্তি কীভাবে চান, তা স্পষ্ট নয়। ভার্জিনিয়ার এই সিনেটর মনে করেন, প্রেসিডেন্টের উচিত কংগ্রেসের সামনে পরিষ্কার অবস্থান তুলে ধরা। তার মতে, ঘোষিত চার বা পাঁচটি লক্ষ্যের মধ্যে প্রকৃত লক্ষ্য কোনটি, তা নির্দিষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

    শেয়ার করুন: