আগামীর সময়

ইরানে সর্বোচ্চ নেতা কে এই মোজতবা?

ইরানে সর্বোচ্চ নেতা কে এই মোজতবা?

সংগৃহীত ছবি

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দ্বিতীয় পুত্র মোজতবা খামেনি তার বাবার উত্তরসূরি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ যদিও এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেয়নি।

তবে ইসরায়েলি এবং পশ্চিমা সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার জন্য কট্টরপন্থী ধর্মীয় নেতা মোজতবা খামেনি এগিয়ে রয়েছেন।

এর আগে শনিবার ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় তার বাবা খামেনি, মা, স্ত্রী এবং তার এক বোন নিহত হন।

মোজতবা কখনো কোনো নির্বাচনে অংশ নেননি। তবে কয়েক দশক ধরে তিনি সর্বোচ্চ নেতার অভ্যন্তরীণ অঙ্গনে অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন। এছাড়া ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সঙ্গে তিনি গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মোজতবাকে তার বাবার সম্ভাব্য স্থলাভিষিক্ত হিসেবে ভাবা হচ্ছিল। তার বাবা খামেনি প্রায় ৮ বছর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব সামলেছেন। এরপর শনিবার তেহরানে তার কম্পাউন্ডে হামলায় নিহত হওয়ার আগে ৩৬ বছর ধরে নিরঙ্কুশ ক্ষমতায় ছিলেন।

যদি মোজতবা সর্বোচ্চ নেতা হন, তাহলে তার মাধ্যমে বোঝাবে যে, ইরানের ক্ষমতা কট্টরপন্থিদের হাতেই থাকবে। এটি আরো ইঙ্গিত দিতে পারে যে, স্বল্পমেয়াদে কোনো চুক্তি বা আলোচনায় সম্মত হওয়ার খুব কম ইচ্ছা রয়েছে সরকারের।

মোজতবা যদিও সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার বিষয়ে কখনো প্রকাশ্যে কিছু বলেননি। এটি তার জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। কেননা, তিনি যদি সর্বোচ্চ নেতা হন তাহলে ক্ষমতার একটি পারিবারিক ধারার সৃষ্টি হতে পারে। যেই সংস্কৃতির বিরুদ্ধেই মূলত ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লব হয়েছিল।

এই কারণে মোজতবা নিজেকে যতটা পেরেছেন আড়ালে রেখেছেন। সভা-সমাবেশে তিনি বক্তব্য দেননি, জুমার খুতবাও দেননি। ফলে অনেক ইরানি তার কণ্ঠও শোনেনি। তবে বহু বছর ধরে তিনি ধর্মতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ছিলেন।

তার বিরুদ্ধে যত অভিযোগ

প্রায় দুই দশক ধরে দেশি-বিদেশি বিরোধীরা ইরানি বিক্ষোভকারীদের উপর সহিংস দমনের সঙ্গে তার নাম যুক্ত করে আসছে।

ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের সংস্কারপন্থি অংশ প্রথমে তার বিরুদ্ধে নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করার অভিযোগ এনেছিল। এছাড়া ২০০৯ সালের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের দমাতে আইআরজিসির আধাসামরিক বাসিজ বাহিনীকে ব্যবহার করার অভিযোগ আনা হয় তার বিরুদ্ধে।

এই বাসিজ বাহিনী তখন থেকে দেশব্যাপী বিক্ষোভ দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সর্বশেষ আন্দোলনও বাহিনীটি অত্যন্ত কঠোরভাবে দমন করেছে। বিক্ষোভকারীদের মূলত দমন করা হয়েছে সন্ত্রাসী, দাঙ্গাবাজ এবং মার্কিন ও ইসরায়েলের মদদপুষ্ট অভিযোগ এনে।

মধ্যম স্তরের ধর্মীয় নেতা

মোজতবা তরুণ বয়স থেকেই ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পসের সদস্যদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে শুরু করেন। ১৯৮০-এর দশকে ইরাক-ইরান যুদ্ধ চলাকালে তিনি ওই বাহিনীর হাবিব ব্যাটালিয়নের দায়িত্ব পালন করেন এবং বিভিন্ন সামরিক অভিযানে অংশ নেন। সেই সময় তার সঙ্গে থাকা অনেক সহযোদ্ধা, যাদের মধ্যে কয়েকজন ধর্মীয় আলেমও ছিলেন। পরে নতুন প্রতিষ্ঠিত ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হন।

পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার অধীনে থাকা মোজতবা একাধিক দেশে সম্পদ গড়ার মাধ্যমে একটি অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যও গড়ে তুলেছেন।

কোনো ধরনের লেনদেনে যদিও তার নাম জড়ায়নি। তবে মনে করা হয়, ইরানি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত অভ্যন্তরীণ ব্যক্তি এবং সহযোগীদের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তিনি বছরের পর বছর ধরে কোটি কোটি ডলার পাচার করেছেন।

মোজতবাকে ইরানের ধনী ব্যবসায়ী আলি আনসারির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে। আলি আনসারির মালিকানাধীন একটি ব্যাংক গত বছরের শেষ দিকে সরকার জোর করে বন্ধ করে দেয়। কারণ ব্যাংকটি কিছু অজানা প্রভাবশালী লোককে বড় অঙ্কের ঋণ দিয়েছিল এবং এতে ব্যাংকটি দেউলিয়া হয়ে যায় ও প্রচুর ঋণের বোঝা তৈরি হয়। ব্যাংকটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে ইরানে আগেই যে মূল্যস্ফীতি ছিল, তা আরও বেড়ে যায়। এই ক্ষতির একটি অংশ জনগণের করের অর্থ দিয়ে সামাল দিতে হওয়ায় সাধারণ মানুষের আর্থিক অবস্থা আরও খারাপ হয়ে পড়ে।

মোজতবা বা আনসারি কেউই প্রকাশ্যে এই কেলেঙ্কারির সঙ্গে তাদের যোগসূত্র এবং অভিযোগের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।

মোজতবার ধর্মীয় যোগ্যতা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। কারণ তিনি হোজাতুল ইসলাম পদমর্যাদার একজন মধ্যম স্তরের আলেম, যা আয়াতুল্লাহ নামের উচ্চতর ধর্মীয় পদমর্যাদার চেয়ে নিচে। তবে তার বাবাও ১৯৮৯ সালে যখন দেশের নেতা হন তখন আয়াতুল্লাহ ছিলেন না। পরে তাকে নেতা বানানোর জন্য আইন পরিবর্তন করা হয়েছিল। তাই মোজতবার ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমঝোতা হওয়ার সম্ভাবনা থাকতে পারে।

এই মুহূর্তে এখনো পরিষ্কার নয়, ইসলামী প্রজাতন্ত্র কবে বা কীভাবে নতুন নেতৃত্ব ঘোষণা করবে। কারণ একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের তীব্র বোমা হামলার মধ্যে দেশজুড়ে আবারও ইন্টারনেট বন্ধ রাখা হয়েছে এবং তথ্য প্রবাহের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে।

এখন একটি তিন সদস্যের পরিষদকে অস্থায়ীভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এই পরিষদে রয়েছেন কট্টরপন্থী আলেম ও অভিভাবক পরিষদের সদস্য আলিরেজা আরাফি অত্যন্ত রক্ষণশীল আলেম ও বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম-হোসেইন মোহসেনি-এজেই এবং রাষ্ট্রপতি মাসউদ পেজেশকিয়ান।

ইরানের আইন অনুযায়ী, ৮৮ সদস্যের একটি ধর্মীয় পরিষদ, যাকে বিশেষজ্ঞ পরিষদ বলা হয়—নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের দায়িত্বে থাকে।

    শেয়ার করুন: