‘বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে মানুষকে আনন্দ দেওয়ার মাঝেই আমার সুখ’

ছবি: আগামীর সময়
বেহালার মিষ্টি সুর ভেসে উঠতেই মেলার ভিড়ের মধ্যে কেমন যেন এক আলাদা সাড়া পড়ে। কেউ থেমে যায়, কেউ মোবাইল বের করে ভিডিও করতে থাকে। আবার কেউ সুরের টানে এগিয়ে আসে একটু কাছ থেকে দেখার জন্য। সুরের এই অদ্ভুত আকর্ষণ যেন পথচলতি মানুষকেও আটকে দেয়। আর এই সুরের উৎস মো. সালাহউদ্দিন।
ঢাকা থেকে আসা এই বেহালা বাদককে চেনেন মেলার নিয়মিত দর্শনার্থীরা। কারণ, তিনি নতুন কেউ নন; টানা প্রায় ৪০ বছর ধরে ঐতিহ্যবাহী জব্বারের বলীখেলার মেলায় আসছেন। বছরের পর বছর ধরে তার বেহালার সুর যেন এই মেলারই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।
তবে তার বেহালাটি একটু ভিন্ন। এটি প্রচলিত বেহালা নয়, বরং একতারার আদলে তৈরি এক ধরনের বিশেষ বাদ্যযন্ত্র। নিজ হাতে কাঠ, তার আর সহজ কিছু উপকরণ দিয়ে তিনি এই যন্ত্র তৈরি করেন। প্রতিদিন ১০ থেকে ১২টি পর্যন্ত এমন যন্ত্র বানাতে পারেন তিনি। প্রতিটির দাম রাখেন সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যেই প্রায় ১০০ টাকা।
সালাহউদ্দিন বলেছেন, ‘এই মেলা আমার কাছে শুধু রোজগারের জায়গা না। আমি যখন বাজাই, দেখি মানুষ থেমে যায়, হাসে, ভিডিও করে ওই আনন্দটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি তৃপ্তি দেয়। মানুষকে আনন্দ দেওয়ার মাঝেই আমার সুখ।’
তার কথার সত্যতা মেলে মেলার ভিড়েই। কেউ দাঁড়িয়ে মন দিয়ে শুনছে, কেউবা নিজের শৈশবের স্মৃতির সঙ্গে মিল খুঁজে নিচ্ছে। আবার অনেকেই আগ্রহ নিয়ে কিনে নিচ্ছেন তার তৈরি বাদ্যযন্ত্র। যেন একটু হলেও সেই সুরকে নিজের করে নেওয়া যায়।
মেলার অন্য প্রান্তে গেলেই শোনা যায় বাঁশির সুর। সেই সুরের মালিক কুমিল্লা থেকে আসা নারায়ণ সরকার। তিনিও নতুন নন, ৩২ বছর ধরে এই মেলায় বাঁশি বিক্রি করছেন। তার ছোট্ট দোকানে সাজানো রয়েছে ছোট-বড় মিলিয়ে ১৩ ধরনেরও বেশি বাঁশি। দামও বিভিন্ন রকম ২০ টাকা থেকে শুরু করে ৬০০ টাকা পর্যন্ত।
নারায়ণ সরকার জানান, শিশু-কিশোররাই বেশি আগ্রহ নিয়ে বাঁশি কিনে। তবে বড়রাও কম যায় না। অনেকেই শখ করে কিনে নেয়। আসলে সুরের প্রতি মানুষের টান তো সবসময়ই থাকে।
পাশেই দাঁড়িয়ে বাঁশি কিনছিলেন চাকরিজীবী আসাদ উদ্দিন। বাঁশিটি হাতে নিয়ে তিনি বলেছেন, ‘ছোটবেলায় গ্রামে গেলে প্রায়ই বাঁশির সুর শুনতাম। এখন আর সেই পরিবেশ নেই। তাই নিজেই চেষ্টা করছি আবার সেই অনুভূতিটা ফিরিয়ে আনতে।’
মেলার আরেক কোণে দেখা মেলে নওগাঁ থেকে আসা বাবুল মণ্ডলের। তিনি ঢোল ও তবলা তৈরি ও বিক্রি করেন। নিজের হাতে তৈরি এসব বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে শিশুদের জন্য রয়েছে ২০০ থেকে ৩০০ টাকার ছোট ঢোল-তবলা। আর বড়দের জন্য আছে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকার উন্নত মানের যন্ত্র।
ঢোলের তালে তালে ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি। প্রতিটি আঘাতে যেন ভেসে ওঠে গ্রামবাংলার চিরচেনা ছন্দ। তার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে অনেকেই তাল মিলিয়ে হাত নেড়ে বা মাথা দুলিয়ে উপভোগ করেন সেই সুর।
পুরো মেলাজুড়েই যেন ছড়িয়ে আছে সুরের এক অদ্ভুত মায়া। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ একতারা-বেহালার সুর, একটু পরেই বাঁশির টান, আবার কোথাও ঢোলের ছন্দ সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক অনন্য পরিবেশ। এই সুরই ডেকে আনে মানুষকে, তৈরি করে ভিড়, জাগিয়ে তোলে স্মৃতি আর অনুভূতি।
এই মেলায় শুধু কেনাবেচা হয় না; এখানে বিক্রি হয় আনন্দ, ছড়িয়ে পড়ে অনুভূতি, আর জীবনের ছোট ছোট সুখগুলো খুঁজে পান শিল্পীরা। তাদের কাছে বাদ্যযন্ত্র শুধু পেশা নয়, বরং মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর এক মাধ্যম।



