মেয়াদ নিয়ে ধূম্রজাল, আপাতত মেয়রের চেয়ারে শাহাদাত

সংগৃহীত ছবি
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) সর্বশেষ নির্বাচন অনুযায়ী আজ রবিবারই শেষ নির্বাচিত পরিষদের মেয়াদ। আদালতের রায়ে গত ১৬ মাস ধরে দায়িত্ব পালন করছিলেন ওই নির্বাচনে পরাজিত হিসেবে ঘোষিত প্রার্থী বিএনপি নেতা ডা. শাহাদাত হোসেন। এখন নির্বাচিত পরিষদের মেয়াদ শেষ হওয়ায় শাহাদাতকে বিদায় নিতে হবে কিনা তা নিয়ে তৈরি হয়েছে ধূম্রজাল। সরকারের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বক্তব্য আসেনি।
শাহাদাত হোসেন বলছিলেন, আদালতের রায় অনুযায়ী তিনি ২০২৯ সালের ৩ নভেম্বর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে যেতে পারবেন। এর ফলে তিনি আপাতত চসিক থেকে বিদায় নিচ্ছেন না, তা নিশ্চিত। তবে তিনি দ্রুততম সময়ের মধ্যে নির্বাচনও চেয়েছেন। আইনজীবীদের মতে, পুরো বিষয়টি এখন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে খোলাসা করা উচিত। অন্যথায় কেউ চাইলে আদালতের শরণাপন্ন হতে পারেন।
সর্বশেষ চসিক নির্বাচন হয়েছিল ২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি। ২৩ ফেব্রুয়ারি নির্বাচিত পরিষদের প্রথম সভা হয়। স্থানীয় সরকার আইনের (সিটি করপোরেশন) ৬ ধারায় বলা আছে, করপোরেশনের মেয়াদ প্রথম সভা হওয়ার তারিখ থেকে পাঁচ বছর হবে। এ হিসেবে চসিক মেয়রের নেতৃত্বাধীন ওই পরিষদের মেয়াদ আজ শেষ হয়েছে।
নির্বাচিত পরিষদের মেয়াদ শেষ হওয়ায় শাহাদাত হোসেন মেয়রের চেয়ারে থাকবেন কিনা, নতুন প্রশাসক নিয়োগ হবে কিনা— এ নিয়ে সরগরম সোশ্যাল মিডিয়া। রাজনৈতিক অঙ্গনে এবং চসিকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও এ নিয়ে কৌতূহল।
বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরুর পরপর গত ১৬ ফেব্রুয়ারি মেয়র শাহাদাত সাংবাদিকদের বলেছিলেন, তিনি চান সরকার স্থানীয় সরকার আইনের ৬ ধারা অনুসরণ করবেন। তার মতে, ওই ধারা অনুযায়ী পরবর্তী নির্বাচিত পরিষদের প্রথম সভা না হওয়া পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করে যেতে পারবেন।
আইনজীবীরা জানাচ্ছেন, মেয়রের বক্তব্য অনুযায়ী স্থানীয় সরকার আইনের ৬ ধারা অনুসরণ করতে গেলে তাকে পদত্যাগ করতে হবে এবং মন্ত্রণালয়কে প্রশাসক নিয়োগ দিতে হবে। অন্যথায় আদালতের নির্দেশনা চাওয়া যেতে পারে।
২০১৫ সালের এপ্রিলে অনুষ্ঠিত চসিক নির্বাচনে নির্বাচিতদের মেয়াদ শেষ হয় ২০২০ সালের ২৯ মার্চ। করোনা মহামারির কারণে নির্বাচন না হওয়ায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ১৮০ দিনের জন্য প্রশাসক নিয়োগ দেয়। প্রশাসকের মেয়াদ শেষে ২০২১ সালে নির্বাচন হয়।
এ অবস্থায় রবিবার দুপুরে নগরীর হালিশহরে একটি খেলার মাঠ উদ্বোধন করতে গিয়ে মেয়র শাহাদাত হোসেন মেয়াদ নিয়ে আবারও সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন।
‘আমি কোনো প্রশাসক নই, মেয়র। যেহেতু আমি একমাত্র মেয়র বাংলাদেশের এবং সেটা কোর্টের রায়ে আমাকে ঘোষণা করা হয়েছে, এখানে কেউ আমাকে ঘোষণা করেনি। কোর্ট অর্ডার দিয়েছে ২০২৯ সাল পর্যন্ত। কাজেই চাইলে ’২৯ সাল পর্যন্ত আমি থাকতে পারব। প্রশাসক দিতে পারবে না। চট্টগ্রামে প্রশাসক ছিলেন। প্রশাসককে বদলি করে আমাকে মেয়র করা হয়েছে। কাজেই পরে আর প্রশাসক দেওয়ার সুযোগ নেই’, বলছিলেন তিনি।
উল্লেখ্য, ২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ ওঠা ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরীকে ৩ লাখ ৬৯ হাজার ২৪৮টি ভোটে বিজয়ী দেখিয়ে চসিক মেয়র ঘোষণা করা হয়। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী শাহাদাত হোসেনের প্রাপ্ত ভোট দেখানো হয় ৫২ হাজার ৪৮৯টি। নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগে ওই বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে রেজাউল করিমসহ ৯ জনকে বিবাদী করে মামলা করেন চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির তৎকালীন আহ্বায়ক শাহাদাত হোসেন। মামলা চলমান থাকা অবস্থায় মেয়রের দায়িত্ব পালন করছিলেন রেজাউল করিম চৌধুরী।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আত্মগোপনে চলে যান চসিক মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী। অন্তর্বর্তী সরকার ১৯ আগস্ট মেয়র রেজাউল ও কাউন্সিলরদের অপসারণ করে। এরপর ১ অক্টোবর শাহাদাত হোসেনকে মেয়র ঘোষণা করে ওই মামলার রায় দেন আদালত। ৫ নভেম্বর তিনি মেয়রের দায়িত্ব নেন। তবে ওয়ার্ডগুলো এখনো কাউন্সিলরশূন্য।
‘রেজাউল করিম চৌধুরীর যে মেয়াদ, তার পুরোটাই অবৈধ ঘোষণা করেছেন আদালত। তাই যেদিন থেকে তিনি শপথ নিয়েছেন, সেদিন থেকে পাঁচ বছর মেয়াদ— এটা উনার। অর্থাৎ ২০২৯ সালের ৩ নভেম্বরের আগে আমার মেয়াদ শেষ হবে না। আর সরকার আমাকে যে কূটনৈতিক পাসপোর্ট দিয়েছে, তার মেয়াদও পাঁচ বছরের, দেড় বছরের নয়। তাই পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারব,’ সাংবাদিকদের জানাচ্ছিলেন শাহাদাত হোসেন।
‘কিন্তু জনগণের একজন প্রতিনিধি হিসেবে আমি চাই যে একটা ইলেকশন হোক। যে নির্বাচনের প্রতীক্ষা আমি অনেক বছর ধরে করছি এবং আমি আমার জনপ্রিয়তা যাচাই করতে চাচ্ছি। আমি বলছি, আমি নির্বাচন চাই। কাজেই এটা এখন দায়িত্ব হচ্ছে মিনিস্ট্রির, তারা নির্বাচন কী করে করবে। আমার এই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তারা কিন্তু অলরেডি একটি চিঠি ইসিকে দিয়েছে।’
সারাদেশেই সিটি করপোরেশনের নির্বাচন হওয়া উচিত বলে মনে করেন শাহাদাত হোসেন। ‘আমি বলছি, চট্টগ্রামসহ সারা বাংলাদেশের প্রতিটি সিটি করপোরেশনের নির্বাচন হওয়া উচিত। কেননা প্রতিটি ওয়ার্ডে কোনো নির্বাচিত কাউন্সিলর না থাকায় যে পরিমাণ সার্ভিস জনগণের পাওয়ার কথা, সে পরিমাণ সার্ভিস জনগণ পাচ্ছেন না। আমি এ জন্য মনে করছিলাম, চট্টগ্রামসহ সারা বাংলাদেশের যে সিটি করপোরেশনগুলোর নির্বাচন দরকার, সেখানে অবশ্যই নির্বাচন দেওয়া উচিত এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা উচিত’ এমনই ভাষ্য তার।
এ বিষয়ে আইনি ব্যাখ্যা মন্ত্রণালয়কেই দিতে হবে বলে অভিমত চট্টগ্রামের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জিয়া হাবিব আহসানের। ‘আইন অনুযায়ী, উনার (শাহাদাত) মেয়াদ শেষ হওয়ার ৯০ দিন আগে নির্বাচনে শিডিউল ঘোষণা করতে হবে। এখন উনার মেয়াদ শেষ হয়েছে কী হয়নি, এটা নিয়েও তো একটা আইনি ব্যাখার দরকার আছে। উনি যেদিন দায়িত্ব নিয়ে প্রথম সভা করলেন সেদিন থেকে মেয়াদ কাউন্ট হবে নাকি রেজাউল করিম সাহেব যেদিন দায়িত্ব নিয়ে প্রথম সভা করেছেন সেদিন থেকে মেয়াদ শুরু হবে, এটা খোলাসা করার দরকার আছে। এ ব্যাপারে আইনি ব্যাখা মন্ত্রণালয়কে দিতে হবে। অথবা এ বিষয়ে আদালতের কাছে নির্দেশনা চাইতে হবে’ এমনই ভাষ্য এই আইনজীবীর।

