দেশে ছাত্রলীগ ক্যাডার, দুবাই গিয়ে ‘শিবির ক্যাডার’

ইমতিয়াজ সুলতান ইকরাম
একসময় ‘ছাত্রলীগের ক্যাডার’ হিসেবে কিশোর গ্যাং নেতা হয়ে দাপিয়ে বেড়াতেন চট্টগ্রাম নগরীতে। আলোচিত এক স্কুলছাত্রী খুনের মামলার আসামি হয়ে পালিয়ে যান দুবাইয়ে। আট বছর পর দেশে ফেরেন আর তার কয়েক মাসের মধ্যেই আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। সেই ছাত্রলীগ ক্যাডার তখন আবির্ভূত হন মধ্যপ্রাচ্যে পলাতক শিবির ক্যাডার বড় সাজ্জাদের সহযোগী হিসেবে। দাপটের সঙ্গে চালিয়ে যাচ্ছিলেন চাঁদাবাজি-অস্ত্রবাজি। আবার সেই সাজ্জাদের সঙ্গেই পরে দ্বন্দ্বে জড়ান।
মঙ্গলবার (১৮ জানুয়ারি) রাতে ‘অস্ত্র কেনাবেচা’ করার সময় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ইমতিয়াজ সুলতান ইকরাম নামে এ সন্ত্রাসীসহ দুজনকে নগরীর আরেফিননগর এলাকার বায়েজিদ লিঙ্ক রোড থেকে গ্রেফতার করে র্যাব। গ্রেফতার ইমতিয়াজ সুলতান ইকরাম (২৭) নগরীর পাঁচলাইশ থানার মুরাদপুর এলাকার ফরেস্ট গেটের মো. ইসহাক মিয়ার ছেলে।
র্যাব জানায়, ইকরামের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত গাড়ির চালক আবুল কামাল আজাদকে (৬২) গ্রেফতার করা হয়েছে। ওই ব্যক্তি ইকরামের চাঁদার টাকা তুলতেন। গ্রেফতারের সময় ও পরে ইকরামের বাসায় অভিযান চালিয়ে ৭ পয়েন্ট ৬৫ বোরের দুইটি বিদেশি পিস্তল, পাঁচটি ম্যাগাজিন ও ৫৬ রাউন্ড গুলি উদ্ধার উদ্ধার করা হয়েছে।
ছাত্রলীগ ক্যাডার থেকে কিশোর গ্যাং লিডার
চট্টগ্রাম নগরীর মুরাদপুর, ফরেস্ট গেট, অক্সিজেন, বায়েজিদ বোস্তামি এলাকায় ২০১৫-১৬ সালের দিকে নিজেকে বর্তমানে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতা পরিচয় দিতেন ইমতিয়াজ সুলতান ইকরাম। ২০১৭ সালে নগরীর আশেকানে আউলিয়া ডিগ্রি কলেজের এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। তখনই তিনি ‘রিচ কিডস’ নামে একটি ‘কিশোর গ্যাং’ পরিচালনা করতেন। ওই গ্যাংয়ের অর্ধশতাধিক কিশোর নিয়ে এলাকায় দাপিয়ে বেড়াতেন বলে ভাষ্য পুলিশের।
র্যাবের চট্টগ্রাম অঞ্চলের (র্যাব-৭) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান বলেন, ‘চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র আওয়ামী লীগ নেতা আ জ ম নাছির উদ্দীনের ক্যাডার ছিলেন ইকরাম। ছাত্রলীগ নেতা পরিচয় দিত। কিশোর গ্যাং গড়ে তুলেছিল। এলাকায় মারামারি, মাদক সেবন, হিরোইজম দেখানো, ছিনতাই— সবই করত।’
পুলিশ সূত্র জানায়, বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত নগরীর মুরাদপুর এলাকার যুবলীগ ক্যাডার মো. ফিরোজ। একসময় তিনি ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ওপর অস্ত্র হাতে ঝাঁপিয়ে পড়া অবস্থায় ফিরোজের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। পরে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। সেই ফিরোজের অনুসারী পরিচয়ে মূলত ইকরাম বিভিন্ন অপরাধ কর্মে যুক্ত ছিলেন।
স্কুলছাত্রী খুনে জড়িয়ে পালিয়ে দুবাই
২০১৭ সালের ২ মে চট্টগ্রাম নগরীর পতেঙ্গায় নেভাল একাডেমির অদূরে ১৮ নম্বর ঘাট এলাকায় চোখ, নাক-মুখ থ্যাতলানো অবস্থায় তাসফিয়া আমিন (১৪) নামে এক কিশোরীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তাসফিয়া কক্সবাজার শহরের ডেইলপাড়া এলাকার মো. আমিনের মেয়ে। চট্টগ্রামের সানশাইন গ্রামার স্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্রী ছিলেন। নগরীর ওআর নিজাম রোডে তাদের বাসা ছিল।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ১ মে বিকেলে বন্ধু আদনান মির্জার (১৬) সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার পর তাসফিয়া আর বাসায় ফেরেননি। পরদিন তার লাশ পাওয়া যায়। ওই রাতেই আদনান মির্জাকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
এ ঘটনায় তাসফিয়ার বাবা বাদী হয়ে পতেঙ্গা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার আসামিরা হলেন- গ্রেফতার হওয়া তাসফিয়ার বন্ধু ও এলিমেন্টারি স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র আদনান মির্জা (১৬), সানশাইন গ্রামার স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র শওকত মিরাজ ও আসিফ মিজান, আশেকানে আউলিয়া ডিগ্রি কলেজের এইচএসসির ছাত্র ইমতিয়াজ সুলতান ইকরাম এবং যুবলীগ নেতা মো.ফিরোজ ও তার সহযোগী সোহায়েল ওরফে সোহেল।
র্যাব-৭ অধিনায়ক জানান, স্কুলছাত্রী তাসফিয়া হত্যা মামলায় আসামি হিসেবে নাম আসার পর কয়েকদিনের মধ্যেই ইকরাম ভারত হয়ে দুবাইয়ে পালিয়ে যান।
দেশে ফেরা ‘বড় সাজ্জাদের সহযোগী’ হয়ে
পুলিশ ও র্যাব সূত্রমতে, ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে এপ্রিলে দেশে ফিরে আসেন ইকরাম। ওই বছরের ২৪ জুন তাকে নগরীর লালদিঘীর পাড় এলাকা থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এ সময় তার বিরুদ্ধে তাসফিয়া হত্যাসহ ৫টি মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা ছিল। তবে কয়েকদিনের মধ্যেই তার জামিন হয়ে যায়।
জানতে চাইলে র্যাব কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান বলেন, ‘২০২৪ সালে দেশে ফিরে আসার পর ইকরাম গ্রেফতার হয়েছিল। কয়েকদিনের মধ্যেই সে জামিনে বেরিয়ে যায়। যতদূর জানি, তাসফিয়া হত্যা মামলায় ওইসময় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়নি। মারামারি, হত্যাচেষ্টা- এ ধরনের এক-দুইটি মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছিল। তবে বিষয়টি পুলিশ ভালো বলতে পারবে।’
র্যাব জানায়, দুবাইয়ে থাকা অবস্থায় ইকরাম চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ বোস্তামি, অক্সিজেন ও মুরাদপুর এলাকার বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের কাছে বিদেশি নম্বর ব্যবহার করে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করতেন। এ সময় তিনি শিবির ক্যাডার বড় সাজ্জাদের পরিচয় দিতেন।
র্যাব কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান বলেন, ‘দুবাইয়ে বড় সাজ্জাদের সঙ্গে ইকরামের সখ্যতা হয়। সাজ্জাদের নির্দেশে সেখানে বসে দেশে ব্যবসায়ীদের কাছে চাঁদা দাবি করতেন। দেশে ফিরে আসার পর কিছুদিন আড়ালে ছিলেন। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আরেকজন সন্ত্রাসী সরোয়ার বাবলার সঙ্গে তার সখ্যতা হয়। কিছুদিন আগে সরোয়ার বাবলাকে গুলি করে খুন করা হয়েছে। এরপর বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ, ইট, বালু, সিমেন্ট ব্যবসার নামে আধিপত্য বিস্তারসহ নানা অপরাধ করে আসছিলেন।’
গত বছরের ৫ নভেম্বর সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ বোস্তামি থানার চালিতাতলী খোন্দকিয়া পাড়ায় নির্বাচনী প্রচারণায় গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন নগর বিএনপির আহ্বায়ক ও চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও) আসনের সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ ও তার সঙ্গে থাকা বিএনপি কর্মী সরোয়ার হোসেন বাবলা। চিকিৎসাধীন অবস্থায় বাবলা মারা যান। এ ঘটনায় তার বাবা বড় সাজ্জাদসহ সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, বিদেশে পলাতক সাজ্জাদ আলী দীর্ঘদিন ধরে সরোয়ার হোসেন বাবলাকে হত্যার হুমকি দিয়ে আসছিলেন। সর্বশেষ ২ নভেম্বর সরোয়ারকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে বলেন, ‘সময় শেষ, যা খাওয়ার খেয়ে নে’। এরপর ৫ নভেম্বর সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম-৮ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর সঙ্গে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেওয়া সরোয়ারকে সরাসরি পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। সাজ্জাদের নির্দেশে তার অনুসারীরা পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন বলে অভিযোগ আনা হয় মামলার এজাহারে।
পুলিশ ও র্যাব সূত্র জানায়, ইকরাম দেশে ফিরে সরোয়ার বাবলার সঙ্গে যুক্ত হলেও বড় সাজ্জাদের সঙ্গেও তার সখ্যতা অব্যাহত ছিল। কিন্তু দেশে থাকা বড় সাজ্জাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ছোট সাজ্জাদের সঙ্গে সরোয়ার বাবলার বিরোধ ছিল। সেই বিরোধের জেরে ইকরাম ছোট সাজ্জাদকে পুলিশের কাছে ধরিয়ে দেন। এতে বড় সাজ্জাদ ইকরামের ওপর থেকে তার আশীর্বাদ তুলে নেন।
গত বছরের ১৫ মার্চ সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদকে রাজধানীর বসুন্ধরা শপিং কমপ্লেক্স থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এরপর ২০ মার্চ ইকরামের স্ত্রী রুমা আক্তার স্মৃতি নিরাপত্তা চেয়ে পাঁচলাইশ থানায় একটি মামলা করেছিলেন। সেখানে তিনি ছোট সাজ্জাদকে গ্রেফতারে পুলিশকে সহায়তা করার কথা উল্লেখ করেন।
মামলায় স্মৃতি উল্লেখ করেন, ছোট সাজ্জাদকে ধরিয়ে দেয়ার বিষয়টি জানতে পেরে তার স্ত্রী শারমিন আক্তার তামান্না তাদের হত্যার হুমকি দিচ্ছেন। এছাড়া বড় সাজ্জাদ ভারতীয় একটি নম্বর থেকে ফোন করে তার কাছে এক কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেন। টাকা না দিলে তিনি ব্যবসা করতে পারবেন না বলে হুমকি দেন।
ওই মামলায় স্মৃতি ছোট সাজ্জাদের স্ত্রী শারমিন আক্তার তামান্না, বড় সাজ্জাদ, হাবিব খান, রায়হান, হেলাল, হাসান, আরমান ওরফে ডবল হাজারি, ইমন, বোরহান, রাজু, মোহাম্মদ ও দিদারসহ ১১ জনকে আসামি করেন। এরপর ১৪ নভেম্বর রাত ৮টার দিকে বিদেশি নম্বর থেকে হোয়াটস অ্যাপে ফোন ও এসএমএম দিয়ে জোড়া খুনের আসামি রায়হান তাকে হুমকি দিয়েছে বলে অভিযোগ করে থানায় মামলা করেন ইকরাম। মেসেজগুলোতে লেখা হয়— ‘খুব দ্রুত সময়ে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করতে হবে। তোকে গুলি করে মারব না, ব্লেড দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মারব। তোর মামলার এক নম্বর আসামি হব আমি।’

