সাগরে হন্য হয়ে জলদস্যু খুঁজছে কোস্ট গার্ড

সংগৃহীত ছবি
কক্সবাজার উপকূলে ডাকাত ও জলদস্যুদের উৎপাত বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে সাগরে বিশেষ অভিযান জোরদার করেছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড। আজ সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত আধুনিক সক্ষমতাসম্পন্ন জাহাজ ও উচ্চগতির স্পিডবোট নিয়ে কক্সবাজার উপকূলজুড়ে জলদস্যুবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান চালানো হয়। তবে এ অভিযানে কাউকে আটক বা কোনো কিছু উদ্ধার হয়নি বলে জানিয়েছে কোস্ট গার্ড।
শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানান, সাম্প্রতিক সময়ে কক্সবাজার, মহেশখালী ও কুতুবদিয়া সংলগ্ন সমুদ্র এলাকায় ডাকাত ও জলদস্যুদের উপদ্রব বেড়েছে। এমন অভিযোগ পাওয়ার পর গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বিশেষ অভিযান জোরদার করা হয়েছে।
জানা যায়, দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকায় ২৪ ঘণ্টা টহলের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সমুদ্র ও নদী সীমান্তে সন্দেহজনক গতিবিধি পর্যবেক্ষণে রাডার, অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম (এআইএস), ভিএইচএফ ও এইচএফ যোগাযোগব্যবস্থা এবং জিপিএস প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশেষ করে নাফ নদী ও উপকূলীয় সমুদ্রসীমায় সব ধরনের জলযানের চলাচল সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত দুই মাসে পরিচালিত একাধিক অভিযানে কোস্ট গার্ড ৩০ জন ডাকাত ও জলদস্যুকে আটক করেছে। এ সময় চারটি আগ্নেয়াস্ত্র, ১৭টি দেশীয় অস্ত্র ও ছয় রাউন্ড তাজা কার্তুজ উদ্ধার করা হয়। পাশাপাশি জলদস্যুদের কবলে জিম্মি থাকা ৩২ জন জেলেকে জীবিত উদ্ধার করে তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। গোলাগুলিতে মারা যান জলদস্যু মো. আনিস।
এর ধারাবাহিকতায় শুক্রবার দিনভর কক্সবাজার উপকূলে অভিযান পরিচালনা করা হয়। এতে কোস্ট গার্ড বেইস চট্টগ্রাম, কোস্ট গার্ড জাহাজ কুতুদিয়া এবং বিসিজি স্টেশন কক্সবাজার, মহেশখালী, মাতারবাড়ী, কুতুবদিয়া ও শাহপরীর সদস্যরা অংশ নেন। সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জলদস্যু চক্র নির্মূলই ছিল অভিযানের মূল লক্ষ্য।
এদিকে জলদস্যুদের হামলার ঝুঁকি যে এখনো বড় উদ্বেগ, তা স্পষ্ট হয়েছে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায়।
গত বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) কুতুবদিয়ার পশ্চিম উপকূলে মাছ ধরতে গিয়ে ডাকাতের গুলিতে নিহত হন ১৭ বছরের জেলে শাহাদত হোসেন। তিনি উত্তর ধুরুং এলাকার মৃত মো. বাদশার ছেলে। ফিশিং বোটে ডাকাতদের হামলার সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন শাহাদত। পরে উপকূলে আনার পর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ছাড়া ২১ ফেব্রুয়ারি রাতে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপকূল থেকে প্রায় দুই নটিক্যাল মাইল দূরে নোঙর করা একটি জাহাজে ১২ জনের সশস্ত্র দল হামলা চালিয়ে প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে লুটপাট চালায়। নগদ টাকা, মোবাইল ফোন, জ্বালানি, গ্যাস সিলিন্ডার ও ওয়াকিটকি লুট হয়। এতে প্রায় সাত লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জাহাজ কোম্পানির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। এর আগে ৫ জানুয়ারি রাতে ‘জাহাজের হারি’ পয়েন্ট এলাকায় বড়ঘোপের একটি ট্রলারে সশস্ত্র হামলায় পাঁচ জেলে আহত হন। গুরুতর আহত একজনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠাতে হয়। ট্রলার মালিকের দাবি, মাছ, জাল ও জ্বালানি লুটে ক্ষতি হয়েছে প্রায় চার লাখ টাকা।
জেলেদের ভাষ্য, জলদস্যুতার ধরন এখন আরও সংঘবদ্ধ ও কৌশলগত। গভীর সমুদ্রে পরিকল্পিতভাবে হামলা চালানো হচ্ছে। অনেক সময় জিপিএস, মোবাইল ও ওয়াকিটকি ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়ায় জেলেরা দ্রুত সাহায্য চাইতেও পারছেন না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাবেক এক কোস্ট গার্ড কর্মকর্তা বলেন, জলদস্যু চক্রগুলো টহলের সময়সূচি ও জেলেদের চলাচলের রুট সম্পর্কে ধারণা রাখে। এতে দমন কার্যক্রম জটিল হয়ে উঠছে।
কোস্ট গার্ড জানায়, গত ২৫ ফেব্রুয়ারি মহেশখালী উপকূলে ‘জাহাঙ্গীর বাহিনী’র প্রধান জাহাঙ্গীরসহ নয় জলদস্যুকে আটক করা হয়েছে। জব্দ করা হয় তিনটি আগ্নেয়াস্ত্র, চার রাউন্ড কার্তুজ ও ছয়টি দেশীয় অস্ত্র। এর আগে ৯ জানুয়ারি কলাতলী সমুদ্র এলাকায় অভিযানে ১৯ জন জলদস্যু আটক হয়। সে সময় জলদস্যুদের পাল্টা গুলিতে মো. আনিস নামের এক জলদস্যু নিহত হন।
লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন বলেন, দেশের সাগর, নদীপথ ও উপকূলীয় এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিতে ভবিষ্যতেও কোস্ট গার্ডের এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
উপকূলীয় জেলেদের প্রত্যাশা, এই অভিযান আরও জোরদার হলে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে তাঁদের জীবন ও জীবিকা দুটোই কিছুটা হলেও নিরাপদ হবে।

