আগামীর সময়

ব্রহ্মপুত্র

দখল-দূষণে জীবনহারা নদ

দখল-দূষণে জীবনহারা নদ

ছবিঃ আগামীর সময়

জামালপুরে ব্রহ্মপুত্র নদ এক সময় মানুষের জীবনধারার অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। বর্তমানে অবৈধ দখল, দূষণ ও অব্যবস্থার কারণে নদটি মরা খালের পর্যায়ে চলে এসেছে। নদীর বিস্তৃত বুকে পানি নেই, জীববৈচিত্র্য ও জীবন-জীবিকার ভারসাম্য হ্রাস পাচ্ছে।

নদীটির দুইপারে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, বসতি ও ফসলের ক্ষেত অবৈধভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। পানি দূষণ ও ময়লা আবর্জনার কারণে নদীর জল দূষিত হচ্ছে। আগে নদটি কৃষি, সেচ ও পরিবহন সুবিধা দিত। এখন শুষ্ক মৌসুমে নদটি হেঁটেই পার হওয়া যায়। নদী ভরাট হওয়ায় ড্রেনেজ ব্যবস্থা ব্যাহত, রোগ-বালাই ছড়িয়ে পড়ছে।

স্থানীয়রা দাবি করেছেন, দ্রুত অবৈধ দখলদারদের কবল থেকে নদীর ভূমি উদ্ধার ও ড্রেজিং করলে নাব্যতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এতে নৌকা চলাচল, মাছ ধরার সুযোগ ও হাজার হাজার হেক্টর জমির সেচ নিশ্চিত করা যাবে। নদী রক্ষা না হলে নদীভিত্তিক অর্থনীতি ও পরিবেশ বিপর্যস্ত হবে।

হিমালয় পর্বতের কৈলাস শৃঙ্গে মানস সরোবরে ব্রহ্মপুত্রের উৎপত্তি। এটি ভারতের অরুণাচল ও আসামের মধ্য দিয়ে কুড়িগ্রাম জেলার উত্তর পাশ দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। জামালপুরে প্রবাহিত হয়ে মেঘনার সঙ্গে মিলিত হয়। এক সময় নদী মাছের অভয়ারণ্য ছিল, পণ্য পরিবহন ও মানুষের যোগাযোগের জন্য নদপারে ছোট-বড় হাট-বাজার, বন্দর, নগর ও গঞ্জ গড়ে উঠেছিল।

কয়েক বছর আগে নদীর তীরে হাজার হাজার একর জমির আবাদ হতো। উর্বর পলি মাটিতে বাম্পার ফলন হতো। এখন নদী হেঁটেই পার হওয়া যায়, কারণ অবৈধ দখল ও দূষণে নদী ভরাট হয়ে সরু খালে পরিণত হয়েছে। নাব্যহীনতার কারণে পরিবেশ দূষণ বেড়েছে, রোগ-বালাই ছড়াচ্ছে। নদীর পলি জমে ড্রেনেজ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে, শহরের ময়লা-আবর্জনা নিষ্কাশন বন্ধ প্রায়। এক সময় দূর-দূরান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা নৌকা ভেড়াতেন জামালপুরে। রানীগঞ্জ বাজার ও তমালতলা ছিল বণিকদের প্রিয় স্থান।

১৯৯৬ সালে জামালপুর পৌরসভার অংশে শহর রক্ষার নামে বাঁধ নির্মাণ করা হয়। এতে নদী মরে যায় এবং গতিপথ পরিবর্তিত হয়। নাওভাঙাচর এলাকায় ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে পৌনে এক কিলোমিটার ক্রস ডেম নির্মাণে সাড়ে তিন কোটি টাকা ব্যয় হয়। ধীরে ধীরে বিস্তৃত চর জেগে ওঠে, যা অবৈধভাবে দখল করা হয় এবং শেখ ফজিলাতুন্নেছা নামের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বর্তমানে প্রস্তাবিত ব্রহ্মপুত্র ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি) ক্যাম্পাস নির্মাণ করা হয়। পরিকল্পিতভাবে ক্রস ডেম নির্মাণের ফলে নদী শুকিয়ে গেলে নদী রক্ষা কমিটির নেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

জামালপুরের মানুষ জানিয়েছেন, দখল-দূষণে নদীর অবস্থা খুবই নাজুক। নাব্য সংকটে ধানি ও সবজি জমিতে সেচ, জলপথে যাতায়াত ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। এক সময় স্টিমার ও বড় নৌকা চলত, হাজার হাজার মানুষ মাছ ধরত। নাব্য সংকট সবই ইতিহাস হয়ে গেছে। নদী পুনঃসঞ্চারের দাবিতে নদপারের সচেতন মহল ও পরিবেশবিদরা সুর চেয়েছেন।

জামালপুর পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন কমিটির সভাপতি ও জেলা নদী রক্ষা কমিশনের সদস্য জাহাঙ্গীর সেলিম বলেছেন, ‘নদীখেকো ও ভূমিদস্যুর কারণে ব্রহ্মপুত্র নদ মৃতপ্রায়। নদী ভরাট ও দূষণের হাত থেকে রক্ষা পেতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ জরুরি। ব্রহ্মপুত্রের জামালপুরের সীমানায় দুইপারে প্রায় ২৬ কিলোমিটার দখল হয়েছে। দূষিত ময়লা আবর্জনা নদীতে ফেলা হচ্ছে। বালুখেকোরা অবৈধভাবে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করছে।’

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইউসুপ আলী জানিয়েছেন, ‘ব্রহ্মপুত্র নদ রক্ষায় বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। অবৈধ দখলদারদের তালিকা তৈরির প্রস্তুতি চলছে। প্রাণীসম্পদ মন্ত্রণালয়কে অবহিত করে দ্রুত কাজ শুরু করা হবে।’

    শেয়ার করুন: