নির্মমতায় নিথর আরও দুই ছোট্টদেহ

‘আমার ছেলেকে কীভাবে এভাবে হত্যা করতে পারল? আমি এত বছর ধরে বিদেশ, কারও তো কোনো ক্ষতি করি নাই! আপনেরা আমারে সাহায্য করেন, আমার ছেলেরে কে মারল, কেন মারল, বের করে দেন।’
উত্তর কোরিয়ায় বসে ভিডিওতে এই বিলাপ করছিলেন সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজারের প্রবাসী মোস্তাক আহমেদ। ছেলে হত্যার বিচারে এলাকাবাসী ও প্রশাসনের সাহায্য চাইছিলেন বারবার।
তার সাত বছরের ছেলে আব্দুল্লাহ আল মামুন নিখোঁজ ছিল গতকাল বুধবার দুপুর থেকে। সন্ধ্যায় তাকে পাওয়া গেল ধানক্ষেতে, রক্তাক্ত ও মৃত অবস্থায়। ছাতক-দোয়ারাবাজার সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার শেখ মো. মুরসালিন জানিয়েছেন এ তথ্য।
ছেলের মৃত্যু খবরে রাতে ফেসবুকে ভিডিওবার্তা পোস্ট করেন মোস্তাক। বিদেশ থাকায় ছেলের হত্যাকারী শনাক্তে এলাকার লোকজন ও প্রশাসনের কাছে চাইলেন সহযোগিতা।
মা ও দাদা-দাদির সঙ্গে উপজেলার মান্নারগাঁও ইউনিয়নের গোপালপুর-শ্রীনাথপুর গ্রামে থাকত শিশু মামুন। পড়ত স্থানীয় আমবাড়ি বাজার এলাকার আল হারামাইন একাডেমির দ্বিতীয় শ্রেণিতে।
থানা পুলিশ বলছে, বুধবার দুপুরে চাচাতো ভাই হাফিজুর রহমানের সঙ্গে বাড়ির পাশের বিলে মাছ ধরতে যায় মামুন। হাফিজুর পরে ফিরে এলেও মামুনের খোঁজ মেলেনি। সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষার পর শুরু হয় খোঁজাখুঁজি।
সন্ধ্যা ৬টার দিকে একই গ্রামের নুর আলমের ধানক্ষেতে পাওয়া যায় মামুনের রক্তাক্ত মরদেহ।
‘বাচ্চাটার মাথার পেছনে, ঘাড়ে ও পিঠে রক্তাক্ত ক্ষত চিহ্ন ছিল। পরিবারের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, বিলে মাছ ধরতে গিয়ে আর ফিরে আসেনি মামুন’-জানালেন মান্নারগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য জামাল উদ্দিন।
মরদেহ ময়নাতদন্তে পাঠানো হয়েছে এবং ঘটনার তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছেন সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মুরসালিন।
বুধবার আরেক শিশুর মরদেহ উদ্ধার হয় কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে। পারিবারিক বিরোধের জেরে আড়াই বছরের শিশু নুজাইফা আক্তারকে হত্যার অভিযোগে আটক করা হয়েছে তার চাচি ২০ বছর বয়সী কল্পনা আক্তারকে।
নিহত নুজাইফা ওই গ্রামের আবদুর রহমানের মেয়ে। বুধবার সন্ধ্যার দিকে বাড়ির পাশের একটি মেহগনি বাগানে গাছে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায় তার মরদেহ। গলায় প্যাঁচানো ছিল ওড়না। শিশুর বাবার অভিযোগে পুলিশ পরে কল্পনাকে আটক করে।
থানা পুলিশ জানিয়েছে, শিশুটির মা প্রিয়া খাতুনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের কলহ ছিল কল্পনার। এর জেরে মেহগনি বাগানে নিয়ে আড়াই বছরের শিশুটিকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন তিনি। মরদেহ গাছে ঝুলিয়ে রেখে পালিয়ে যান কল্পনা।
দৌলতপুর থানার ওসি আরিফুর রহমান জানালেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে নুজাইফাকে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন কল্পনা। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে এবং মামলার প্রস্তুতি চলছে।
একই দিন বরিশালে আরেক শিশু হত্যার বিচার দাবিতে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক আটকে হয়েছে বিক্ষোভ। বাবুগঞ্জ উপজেলায় ৯ বছরের শিশু রাইসা মনি হত্যার বিচার দাবি করছিলেন স্থানীয় লোকজন।
বিক্ষোভে দেখা গেছে এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদকেও।
রাইসার মৃত্যুর ঘটনাটি গত রবিবারের। সেদিন দুপুর ১২টার দিকে উপজেলার দেহেরগতি ইউনিয়নের দক্ষিণ রাকুদিয়া এলাকার বাড়ি থেকে আগে আগুন লাগা অবস্থায় উদ্ধার করা হয় রাইসাকে।
প্রথমে তাকে উজিরপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ও পরে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে আনা হয় ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। সেখানে রবিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে তার মৃত্যু হয়।
গায়ে আগুন নিয়ে বেরিয়ে আসা রাইসার একটি ভিডিও ছড়িয়েছে ফেসবুকে। সেখানে শিশুটিকে বলতে শোনা যায়- প্রতিবেশী কিশোর তাকে ‘খারাপ কাজ’ করতে বলে। রাজি না হওয়ায় তার গায়ে আগুন দেয়া হয়।
দুইদিন পর ওই কিশোর প্রতিবেশী ও তার বাবার নামে বাবুগঞ্জ থানায় মামলা করেন রাইসার বাবা নজরুল ইসলাম। তারা পলাতক।
এই রবিবারেই নরসিংদীর রায়পুরায় নিখোঁজ শিশুর মরদেহ উদ্ধার হয় প্রতিবেশীর বাড়ির ছাদ থেকে। ছয় বছরের আব্দুর রহমান মরজাল ইউনিয়নের চরমরজাল গ্রামের শুকুর আলীর ছেলে।
স্বজন ও প্রতিবেশীদের বরাতে জানা গেছে শনিবার সকাল থেকে নিখোঁজ ছিল আব্দুর রহমান। সন্ধ্যায় পরিবারের পক্ষ থেকে রায়পুরা থানায় জিডিও করা হয়। পরদিন দুপুরে প্রতিবেশী ইদ্রিস মিয়া গাছে পানি দিতে উঠলে শিশুটির মরদেহ দেখতে পান।
রায়পুরা থানা পুলিশ গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। থানার ওসি মজিবুর রহমান বলছেন, সুরতহালে মরদেহ আঘাতের কিছু চিহ্ন মিলেছে। গলায় ছিল কালো দাগ।
শ্বাসরোধে তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিক ধারণা পুলিশের। ঘটনাটি এখন তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ- সিআইডি।

