স্কুলে শিশুদের খাবারে অনিয়ম, ঠিকাদারের দায়িত্বে সরকারি চাকরিজীবী

নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের খাবারে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। স্কুলে সরকারিভাবে ঠিকাদারের মাধ্যমে বিতরণকৃত খাবারে সিদ্ধ ডিমের পরিবর্তে কাঁচা ডিম দেওয়া হয়েছে, আবার কোনো কোনো দিন ডিম ও কলা দেওয়া হয়নি। ফলে শিশুরা নির্ধারিত পুষ্টিকর খাবার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকরা এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
আজ বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) পৌরশহর ও উপজেলার কয়েকটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করে এমন অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ৮৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গত ২৯ মার্চ থেকে টিফিনের খাবার বিতরণ শুরু করা হয়। এসব বিদ্যালয়ে ১৩ হাজার ৩৫৭ শিক্ষার্থীকে সপ্তাহে পাঁচ দিন রুটি, সিদ্ধ ডিম, দুধ ও স্থানীয় মৌসুমি ফল দেওয়ার কথা। ঢাকার সততা এন্টারপ্রাইজ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এ কাজের দায়িত্ব পায়। মোহনগঞ্জ এলাকায় ঠিকাদারের মনোনীত প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন জেলা পূর্বধলার মো. ওলিউল্লাহ। তিনি ময়মনসিংহের গৌরিপুর উপজেলায় উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। সরকারি চাকরির পাশাপাশি তিনি ঠিকাদারি কাজও দেখছেন।
পৌরশহরের দেওথান এলাকার অভিভাবক স্বর্ণা আক্তার জানান, তার ছেলে মাইলোড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে। গতকাল শুধু বনরুটি দেওয়া হয়েছে। সিদ্ধ ডিম দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু দেওয়া হয়নি। পরে বিকেলে ঠিকাদার ডিম সরবরাহ করেছে। আজ বৃহস্পতিবার বনরুটি ও কাঁচা ডিম দেওয়া হয়েছে।
মাইলোড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক খায়রুল ইসলাম জানান, গতকাল ঠিকাদার বিকেলে রুটি ও ডিম নিয়ে আসে। তখন অর্ধেক শিক্ষার্থী স্কুলে উপস্থিত ছিল। আজ সকালেই কাঁচা ডিম ও বনরুটি বিতরণ করা হয়েছে। তবে খাবার বেলা সাড়ে বারোটায় স্কুলে পৌঁছায়, তাই যথাযথ সময়ে দেওয়া হয়নি। তিনি শিক্ষার্থীদের খাবার সময়মতো পৌঁছানোর বিষয়ে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
উপজেলার বড়কাশিয়া-বিরামপুর ইউনিয়নের নয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মোস্তফা কামাল জিয়া জানান, সিডিউল অনুযায়ী টিফিনে শিক্ষার্থীদের বনরুটি ও সিদ্ধ ডিম দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ঠিকাদারের পক্ষ থেকে শুধু বনরুটি দেওয়া হয়েছে। গতকালও একইভাবে শুধু রুটি দেওয়া হয়েছে।
তিনি দাবি করেন, সরকার নির্ধারিত সিডিউল অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের খাবার যথাযথভাবে সরবরাহ করতে হবে।
গলগলি মল্লিকপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কৌশিক তালুকদার জানান, গতকালের খাবারে অনেক শিক্ষার্থী বমি করেছে এবং অসুস্থ হয়েছে। তিনি মানসম্মত খাবার বিতরণের বিষয়ে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
ঠিকাদারের দায়িত্বে থাকা গৌরিপুরের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. ওলিউল্লাহ বললেন, তিনি আসলে ঠিকাদারের প্রতিনিধি নন। তবে ঠিকাদারের পরিচিত হিসেবে তদারকি করতে এসেছেন। তিনি জানিয়ে দেন, স্কুলে খাবার বিতরণ মাত্র দুই দিন হলো, তাই এত বড় পরিমাণ খাবারের সরবরাহ ও তদারকি করা কঠিন কাজ। কয়েক দিনের মধ্যে সব ঠিক হয়ে যাবে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবুল হোসেন বললেন, খাবার বিতরণে অনিয়মের বিষয়টি জানার পর ঠিকাদারকে ডাকা হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ তাকে সতর্ক করা হয়েছে। যথাসময়ে খাবার সরবরাহ করতে বলা হয়েছে এবং লোকবল বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমেনা খাতুন জানান, অনিয়মের বিষয়টি জানার পর ঠিকাদারকে ডেকে সতর্ক করা হয়েছে। নতুনভাবে কাজ শুরু হওয়ায় কিছু সমস্যা হয়েছে, তবে ঠিকাদার পরবর্তীতে শিক্ষার্থীদের সঠিক সময়ে মানসম্মত খাবার দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।
'ঠিকাদারির দায়িত্বে কোনো সরকারি চাকরিজীবী থাকার নিয়ম নেই, তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।' যোগ করেন তিনি।

