নবাবগঞ্জে বিলুপ্তির পথে শতবর্ষী মৃৎশিল্প

হাঁড়ি-পাতিল তৈরির কাজ নিয়ে ব্যস্ত এক নারী
নবাবগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প আজ বিলুপ্তির পথে। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কোনোরকম টিকে থাকলেও অনেকেই বাপ-দাদার পৈতৃক পেশা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন অন্য পেশায়। ফলে শত বছরের পুরনো এই শিল্প হারিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।
প্রতিবছর বাংলা সনের পহেলা বৈশাখের আগে পালপাড়ায় ধুম পড়ে মাটির জিনিসপত্র তৈরির। নবাবগঞ্জের জালালচর ও বর্ধনপাড়া এলাকার কুমার সম্প্রদায় ব্যস্ত হয়ে ওঠে এ সময়। তবে আগের মতো আর সেই জৌলুস নেই। প্রায় ২০০ বছরের পুরনো এই পেশা থেকে ক্রমেই সরে যাচ্ছেন কারিগররা। এক সময় ইছামতীর পাড় জুড়ে মাটির তৈজসপত্র তৈরির ব্যস্ততা ছিল। ছিল কোলাহল। এখন সেই দৃশ্য আর ধরা পড়ে না চোখে। বর্তমানে বর্ধনপাড়া, জালালচরসহ আশপাশের আরও কয়েকটি গ্রামে কোনোরকমে টিকে আছে এই শিল্প।
বৃহস্পতিবার সরেজমিন দেখা যায়, নবাবগঞ্জ উপজেলার যন্ত্রাইল ইউনিয়নের হরিশকুল ও যন্ত্রাইল পালপাড়ায় মাটির ঢিবিতে আগুনে পুড়িয়ে চলছে হাঁড়ি-কলসি তৈরির কাজ। এক সময় সকাল হলেই ধোঁয়ায় ঢেকে যেত আকাশ। কুয়াশাচ্ছন্ন মনে হতো চারপাশ। এখন সেই দৃশ্য অনেকটাই ফিকে। তবুও কুমার পল্লির কারিগররা তৈরি করছেন মাটির তৈজসপত্র।
জালালচরের পরনা পাল জানান, প্রায় ২০০ বছর আগে তাদের পূর্বপুরুষরা শুরু করেন এই পেশা। প্লাস্টিক ও মেলামাইনের কারণে এখন এই পেশা সংকটে। চাহিদা কমেছে, কিন্তু বেড়েছে উৎপাদন খরচ। আগে যেখানে শতাধিক পরিবার এই কাজে যুক্ত ছিল, এখন টিকে আছে মাত্র পাঁচ থেকে সাতটি পরিবার।
সাবেক স্কুল শিক্ষক হরিদাশ পাল উল্লেখ করেন, মৃৎশিল্প এখন বিলুপ্তির পথে। জ্বালানি কাঠ ও শ্রমের খরচ বেড়ে যাওয়ায় লভ্যাংশ পাওয়া যায় না। ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু হওয়া এই পেশায় এক সময় হাজারো মানুষ কাজ করতেন। তখন এ অঞ্চলের মুসলমানরাও যুক্ত ছিলেন শ্রমিক হিসেবে। এখন গ্রামবাংলার মেলাকে কেন্দ্র করে কিছু মানুষ নতুন করে তৈরি করছেন হাঁড়ি-পাতিল।
বর্ধনপাড়ার মৃৎশিল্পী ননী পাল জানান, তিনি ৩৫ বছর ধরে আছেন এই পেশায়, কিন্তু কোনো সরকারি সহায়তা পাননি। অনেকেই জীবিকার তাগিদে চলে গেছেন অন্য পেশায়। কেউ বিদেশে গেছেন, কেউ চালান নৌকা। কেউ রিকশা চালান বা ব্যবসা করেন। তবে মেলার সময় কিছু জিনিস তৈরি করা হয়।
তুলসী পাল বলেছেন, আগে কম খরচে শ্রমিক পাওয়া যেত, এখন দুইবেলা খাবারসহ ৭০০ টাকা দিতে হয়। সেই তুলনায় পণ্যের দাম বাড়েনি। বৈশাখী মেলা কেন্দ্র করে কিছুটা চাহিদা থাকায় কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।
হরিশকুল নদীর পাড়ে নৌকায় করে মাটির তৈরি হাতানি, পিঠার সাজ, মুড়ির ঝাঁজরি, কলসি ও হাঁড়ি নিয়ে শিববাড়ী মেলায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন নিতাই পাল। তিনি জানান, এক সময় সারা বছর নৌকায় করে বিভিন্ন এলাকায় এসব পণ্য বিক্রি করতেন। এখন শুধু টিকে আছে মেলাকেন্দ্রিক ব্যবসা।
বর্ধনপাড়ার বেদানা রানী পালের মতে, মাটির হাঁড়ি-পাতিল এখন কম কেনা হয়, মূলত শখের বশে মানুষ কেনে। তবে দইয়ের পাতিল বিক্রি হয় সারা বছর।
নবাবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দিলরুবা ইসলামের ভাষ্য, বৈশাখী মেলা গ্রামবাংলার ঐতিহ্য বহন করে। এসব মেলায় বিশেষ আকর্ষণ সৃষ্টি করে মাটির জিনিসপত্র। তিনি উল্লেখ করেন, এই শিল্প টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ। পাশাপাশি প্লাস্টিক ও মেলামাইনের ব্যবহার কমিয়ে মাটির তৈজসপত্র ব্যবহারে মানুষকে উৎসাহিত করা গেলে নতুন সুযোগ তৈরি হবে কুমার সম্প্রদায়ের জন্য।



