ফেরিওয়ালা থেকে কোটিপতি দুই ভাই

ছবি: আগামীর সময়
গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরের দুই ভাই জরিফ শেখ ও মোস্তফা শেখ। এককালে ফেরি করে দুধ বিক্রি করতেন তারা। কোনোদিন বিক্রি হতো ৩০ লিটার, কোনোদিন তারচেয়েও কম। সেই আয় দিয়েই কায়ক্লেশে চলতো সংসার।
তবে সেই দিন গত হয়েছে বেশ আগেই। দুই ভাই মিলে গড়ে তুলেছেন বড় দুগ্ধ শিল্প। এখন প্রায় ৭ হাজার খামারির কাছ থেকে প্রতিদিনই সংগ্রহ করা হয় ৩৩ হাজার লিটার দুধ। এর মধ্যে ৬ হাজার লিটার দিয়ে তৈরি হয় নিজেদের কারখানায় দই ও মিষ্টি। বাকি দুধ চলে যায় বিভিন্ন স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে। বর্তমানে দুধ বিক্রি করেই সফল উদ্যোক্তা দুই ভাই।
বর্তমানে মিল্ক ভিটায় ৯ হাজার লিটার, প্রাণ কোম্পানিতে ১১ হাজার লিটার এবং আড়ংয়ে ৭ হাজার লিটার দুধ প্রতিদিন সরবরাহ করছেন তারা। শহর থেকে ১১ কিলোমিটার দূরে সাদুল্লাপুর উপজেলার তরফবাজিত এলাকায় চার বিঘা জমির ওপর গড়ে ওঠা এই কারখানায় কাজ করছেন প্রায় ৩৫০ শ্রমিক।
কারখানার ঠিক সামনেই গাইবান্ধা-সাদুল্লাপুর-রংপুরের রাস্তা ঘেঁষে দুই ভাইয়ের আরেকটি প্রতিষ্ঠান ‘শেখ দই ঘর’। ২০১২ সালে ছোট পরিসরে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ সারা জেলায় সুপরিচিত। এখানকার দই ও মিষ্টি কিনতে অন্যান্য জেলা থেকেও আসে বহু মানুষ।
সরেজমিনে দেখা যায়, কারখানার সামনে রয়েছে দই ও মিষ্টির বিক্রয়কেন্দ্র। ভেতরে বড় বড় চিলিং প্ল্যান্টে সংরক্ষণ করা হচ্ছে খাঁটি দুধ। গ্রাম থেকে দুধ এনে এখানে বিক্রি করছেন খামারিরা। ভেতরে তৈরি হচ্ছে দই, ঘি ও বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি। শ্রমিকদের কেউ উৎপাদনে, কেউ বিক্রিতে ব্যস্ত।
ছোটবেলাতেই বাবা আবু বকর শেখকে হারিয়েছেন স্থানীয় শ্রীকলা গ্রামের এই দুই ভাই। আর্থিক সংকটে খুব বেশি এগোয়নি পড়াশোনা। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন মোস্তফা, ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত জরিফ। বাবার মৃত্যুর পর সংসারের দায়িত্ব পড়ে দুই ভাইয়ের কাঁধে। বাধ্য হয়ে দুধের ব্যবসা শুরু করেন মোস্তফা। সে-সময় তার বয়স ছিল মাত্র ১৮। একই ব্যবসায় যুক্ত হন জরিফও।
শুরুতে বাড়ি বাড়ি ঘুরে প্রতিদিন বিক্রি করতেন দুধ। ২০১২ সালে প্রতিদিন ১৩ হাজার লিটার দুধ নিয়ে শুরু করেন ব্যবসা। তারপর পেরিয়েছেন বহু চড়াই-উৎরাই। বর্তমানে সাদুল্লাপুর, পলাশবাড়ী, সুন্দরগঞ্জ, রংপুরের পীরগাছা, মিঠাপুকুর, পীরগঞ্জসহ প্রায় ২০টি দুধ সংগ্রহ কেন্দ্র রয়েছে দুই জনের।
কারখানার শ্রমিকরা জানাচ্ছিলেন, এখানে কাজ করে তাদের জীবনে এসেছে স্বচ্ছলতা। গোবিন্দগঞ্জের সাগর রায়ের ভাষ্য, দই তৈরির কাজ করেই মাসে আয় করছেন প্রায় ২৫ হাজার টাকা, তাই সংসারে ফিরেছে স্বচ্ছলতা। একই অভিজ্ঞতার কথা জানালেন মিঠাপুকুরের সুজন মিয়াও। সাদুল্লাপুরের সোহাগ মিয়া উল্লেখ করেছেন, আগে ছিলেন দিনমজুর, টাকাও পেতেন কম। এখন মিষ্টি তৈরির কাজে আয় করছেন বেশি, ফিরেছে পরিবারে স্বস্তি।
উপকৃত হচ্ছেন খামারিরাও। বদলাগাড়ী গ্রামের হামিদ মিয়া বলছিলেন, আগে দুধ বিক্রি নিয়ে পড়তেন সমস্যায়। এখন প্রতিদিন অনায়াসেই বিক্রি করতে পারছেন ২০০ থেকে ২২০ লিটার দুধ।
খামারিদের প্রয়োজনে বিনা সুদে ঋণও দেন মোস্তফা-জরিফ। সরবরাহ করেন কৃমিনাশক ট্যাবলেট, পশু অসুস্থ হলে করে দেন চিকিৎসার ব্যবস্থাও। অনেক সময় দেন অগ্রিম টাকাও দেন, যা পরে সমন্বয় করা হয় দুধ দিয়ে।
সাদুল্লাপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. সিরাজুল ইসলাম জানাচ্ছিলেন, এই প্রতিষ্ঠানের কারণে বেড়েছে দুধ উৎপাদন ও খামারের সংখ্যা। সরকারিভাবে তাদের দেওয়া হয়েছে প্রযুক্তিগত সহায়তা।
২০২১ সালে লাইভস্টক অ্যান্ড ডেইরি ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প থেকে ডেইরি আইকন সম্মাননা পান জরিফ-মোস্তফা। ২০২১ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত শিল্প উদ্যোক্তা ক্যাটাগরিতে উপজেলায় অর্জন করেছেন প্রথম স্থান। ২০২৩ সালে ডেইরি হাবের জন্য নির্বাচিত হন এবং সরকারি সহযোগিতায় স্থাপন করেছেন দুধ সংরক্ষণাগার।
স্থানীয়দের মতে, শুধু নিজেরাই সফল হয়নি জরিফ ও মোস্তফা, বরং জেলার দুধ উৎপাদন বাড়িয়ে দেশের চাহিদা পূরণেও রাখছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।



