দুর্গম বালুচরে এক নারীর স্বপ্ন, তিস্তার চরে গড়ে উঠল ‘মিনার বাজার’

তিস্তার দুর্গম চর বাগডোহরা, রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার নোহালী ইউনিয়নে অবস্থিত এক সময় ছিল একেবারেই জনবিচ্ছিন্ন ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকা। বিস্তীর্ণ বালুচরে কিছু অভাবী মানুষের বসতি থাকলেও সেখানে ছিল না কোনো দোকান বা হাটবাজার।
নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে স্থানীয়দের প্রায় এক কিলোমিটার হেঁটে খেয়াঘাটে যেতে হতো, এরপর নৌকায় নদী পেরিয়ে আবার প্রায় দুই কিলোমিটার হেঁটে বড়াইবাড়ি হাটে পৌঁছাতে লাগত প্রায় এক ঘণ্টা সময়।
এই কষ্ট লাঘবের চিন্তা থেকেই ২০০৬ সালে সাহসী উদ্যোগ নেন মিনারা বেগম মিনা। নিজের সংসারের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি চরবাসীর সুবিধার কথা ভেবে তিনি বাগডোহরার বালুচরে একটি ছোট দোকান দিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। তার এই উদ্যোগ অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করে। ধীরে ধীরে আরও দোকান গড়ে ওঠে এবং একসময় সেখানে একটি বাজার প্রতিষ্ঠিত হয়, যা আজ “মিনার বাজার” নামে পরিচিত।
প্রায় দুই দশক ধরে এই বাজারে ব্যবসা করছেন মিনা। এটি কোনো বড় সুপারশপ নয়, বরং তিস্তার ভাঙনকবলিত চরে গড়ে ওঠা একটি ছোট কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাজার। চরাঞ্চলসহ পুরো গঙ্গাচড়া এবং রংপুর অঞ্চলে এটি পরিচিত। প্রতিদিন শ্রমজীবী মানুষ মাছ ধরা, দিনমজুরি বা অন্যান্য কাজ শেষে বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত কেনাকাটা করতে আসেন এখানে। পাশের লালমনিরহাটের কালীগঞ্জে যাতায়াতকারী মানুষজনও এখানে বিশ্রাম ও চা খাওয়ার জন্য থামেন।
দুর্গম এই চরের মাঝখানে অবস্থিত মিনার বাজার। জেলে, মাঝিমাল্লা, কৃষিশ্রমিক এবং আশপাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য খাদ্য ও পানির একমাত্র ভরসা। বড়াইবাড়ি খেয়াঘাট থেকে নদীর ওপারেই দেখা যায় বাজারটি। বর্ষায় নৌকায় প্রায় ৩০ মিনিট লাগলেও শুষ্ক মৌসুমে সময় লাগে প্রায় এক ঘণ্টা। ঘাটে নেমে স্বেচ্ছাশ্রমে তৈরি বাঁধ দিয়ে ১০ মিনিট হাঁটলেই পৌঁছানো যায় বাজারে। এই পথ ধরেই চরের ভেতর দিয়ে যাওয়া যায় প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরের কালীগঞ্জ উপজেলায়।
বর্তমানে মিনার বাজারে রয়েছে প্রায় অর্ধশতাধিক ছোট-বড় দোকান। চায়ের দোকানগুলোতে বিশেষ ভিড় দেখা যায়, বিশেষ করে দুপুরে বেশি থাকে শ্রমজীবী মানুষের আনাগোনা। এখানে গরুও জবাই করা হয়। মিনার নিজের দোকানে চা, রুটি, বিস্কুট, কেক, পরোটা, জিলাপি, ডিমসহ নানা খাবার পাওয়া যায়। তার ছেলেরা এবং একজন কর্মচারী তাকে কাজে সহায়তা করেন। এছাড়া তার আরেকটি বিদ্যুৎ সরঞ্জামের দোকানও রয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, এই চরে প্রথম দোকান চালু করেছিলেন মিনা। আর তার পথ অনুসরণ করেই গড়ে উঠেছে আজকের এই বাজার। ফলে অনেক সহজ হয়েছে চরবাসীর জীবনযাত্রা। আগে যেখানে সামান্য কেনাকাটার জন্যও নদী পার হতে হতো, এখন তা আর প্রয়োজন হয় না।
মিনা নিজেও সেই শুরুর দিনের কথা স্মরণ করে বললেন, অভাব-অনটনের কারণে মানুষ তখন না খেয়ে দিন কাটাত। তার ওপর বাজার করতে নদী পার হওয়া ছিল অত্যন্ত কষ্টকর। অসুস্থ স্বামী ও তিন সন্তানের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে এবং চরবাসীর দুর্ভোগ দেখে তিনি দোকান শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। পাশাপাশি অন্যদেরও উৎসাহিত করেন ব্যবসা শুরু করতে। তার সেই উদ্যোগ আজ সফল হয়েছে। এখন শুধু তার নিজের পরিবার নয়, অনেক মানুষের জীবিকা এই বাজারকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে এবং অনেকটাই লাঘব হয়েছে দীর্ঘদিনের কষ্ট।



