সকালে মাছ খাওয়ালে বিকালে মাংস দিতে হয় ‘ডার্মোকে’

ডার্মোকে কাঁধে নিয়ে ঘুরছেন মাসুম। বরিশাল নগরীর মুক্তিযোদ্ধা পার্ক থেকে ছবিটি তুলেছেন তন্ময় দাস।
কাঁধের উপর চিল পাখি নিয়ে ঘুরছেন এক ব্যক্তি; হাতে করে খাইয়ে দিচ্ছেন খাবারও। কীর্তনখোলা নদী ঘেঁষা বরিশাল নগরীর মুক্তিযোদ্ধা পার্কে ঘুরতে গেলে চোখে মিলবে এমন দৃশ্য। পাখিটির নাম রাখা হয়েছে ‘ডার্মো’; এ নামে ডাকলে সাড়া দেয় সে। সব ধরণের খাবার মুখে নেয় না; দুই বেলা নিয়ম করে দিতে হয় মাছ ও মাংস। হাতে করে খাইয়ে না দিলে গ্রহণ করে না খাবার।
বিআইডব্লিউটিএর উদ্ধারকারী ‘নির্ভীক’ জাহাজের কর্মচারী মোহাম্মদ মাসুম রেজা ফেব্রুয়ারি মাস থেকে পালন করছেন এই চিলটি। কোনো কিছুর সাথে বেঁধে নয়, উন্মুক্ত রেখেই চিলটি পালন করছেন তিনি।
চিল পালন কেন করছেন এবং কোথায় পেলেন এমন প্রশ্ন ছিল তার কাছে। জবাবে মাসুম রেজা জানালেন, গত ১১ ফেব্রুয়ারি গুরুতর আহত অবস্থায় বাচ্চা চিল পাখিটিকে আমাদের জাহাজে পাওয়া যায়; শরীরে ছিল না কোনো পশম। অন্য কোনো পাখির আক্রমণের চিহ্ন ছিলে পাখিটির শরীরে। এরপরেই বই পুস্তক ঘেঁটে ওষুধ এনে চিলটির চিকিৎসা দেওয়া হয়; প্রাকৃতিক ভাবে হলুদ দিয়েও কিছুদিন দেওয়া হয় চিকিৎসা। ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠে পাখিটি। এরপর থেকেই আমার সাথে কোনো বাধা বিপত্তি ছাড়াই থাকছে পাখিটি।
মাসুম জানলেন, ছোট থেকে পাখিটিকে লালন-পালন করায় ওর সব কিছু আমার মুখস্থ। ব্রয়লার মুরগী, ছোট মাছ বা বড় মাছ ছোট ছোট পিস করে মুখের সামনে ধরলেই কেবল সে খায়, এছাড়া অন্য কিছু খায় না। সকালে যদি মাছ খায়, তাহলে বিকালে মাংস; আবার সকালে মাংস দিলে, তাহলে বিকালে দিতে হয় মাছ। ওর পেছনে দৈনিক আমার খরচ হয় ১৫০ টাকা। চিলটি পালনে আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মাঝে মধ্যেই আমাকে টাকা দেয়।
মাসুমের ভাষ্য, তিনি চিলের জীবন কাহিনী দেখেছেন ইউটিউবে, পড়েছেন চ্যাট জিপিটি থেকে। তিনি জানালেন, এরা সাত সপ্তাহের আগে উড়তে পারে না। ভালোভাবে উড়তে সময় লাগবে কমপক্ষে ৪ মাস। ‘তখন চিলটি অবমুক্ত করে দেবো, যদি না যেতে চায় তাহলে আমার সাথেই থাকবে। চলে গেলে প্রচুর কষ্ট হবে’—বলছিলেন মাসুম।
‘ওর নাম দিয়েছি ডার্মো। এই নামে ডাকলে ও তাকায় আমার দিকে। এখনো ঠিকভাবে উড়তে পারে না। যখন উড়তে পারবে তখন যদি পাখিটি তার স্বজাতির কাছে চলে যায় তাহলে তা নিয়ে আফসোস নেই, তবে যদি থেকে যায় তা নিয়েও কোনো আপত্তি নেই। এই পাখিটি বিলুপ্ত প্রজাতির প্রাণী। পাখিটি আহতাবস্থায় মৃত্যুর পথে ছিল’, যোগ করেন মাসুম।
নির্ভীক জাহাজের এই কর্মচারী অনুভূতি প্রকাশ করে বলেছেন, ‘প্রথমে অস্বস্তি লাগতো পাখিটিকে নিয়ে, তবে ধীরে ধীরে ভালো লেগেছে। ভাবছিলাম বন্য প্রাণী, এদের শরীর থেকে বাজে গন্ধ আসে। তবে সব কিছু আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে গেছে। এখন চিলটিকে আমি সন্তানের মতো করে পালন করি। যদি কেউ জোর করে নিয়ে যায়, তবে বাবার মতই খারাপ লাগবে।’
মাসুম বলছিলেন, এই চিল পাখিটি নিয়ে ঘোরাঘুরি করায় কেউ আমাকে পাগল বলে। অনেকে মনে করে যে ঘাড়ে নিয়ে ঘুরছে একটি চিল, কেমন মানুষ! অনেকে আবার ভালো বলতেছে; আবার কেউ বলছে, এই প্রাণী রেখেছ তাতে মামলা খাবে। তবে আমি তো পাখিটিকে আটকে বা বেধে রাখি না। হ্যাঁ, রাতে আমার রুমের মধ্যেই রাখি, কেননা বয়স কম, বিড়ালের আক্রমণের ভয় রয়েছে। তাছাড়া মানুষ শত্রুও রয়েছে।
মাসুমের এমন কাণ্ডে অবাক মুক্তিযোদ্ধা পার্ক এলাকার বাসিন্দারা। পার্ক এলাকার আঁচার বিক্রেতা জীবন আহম্মেদ বলছিলেন, ‘আমি এর আগে চিল পালন করতে দেখিনি কাউকে। চিল হিংস্র স্বভাবের হলেও মাসুমের পাখিটি খুব শান্ত স্বভাবের। ওর সঙ্গে ভালো সখ্যতা। কাঁধে করে মাসুম চিলটিকে নিয়ে প্রায়ই ঘুরতে বের হয়। তবে সব মিলিয়ে দেখতে খারাপ লাগেনা।’
মুক্তিযোদ্ধা পার্কে ঘুরতে আসা বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্রী আফরোজা নিশা বললেন, চিল পালন, তাও আবার কাঁধে করে! অবাক করা বিষয়! কাছে গিয়ে দেখেছি, ভালো লেগেছে।
বিআইডব্লিউটিএ কর্মচারী পাখি প্রেমী মাসুম রেজা দুই সন্তানের জনক। এছাড়াও স্ত্রী ও অসুস্থ পিতা নিয়ে টানা পোড়েনের মধ্যে সংসার চালান মাসুম। এমন মাংসাশী হিংস্র হিসেবে গণ্য করা চিল পাখি পালন দেখে অনেকেই প্রশংসা করছেন মাসুম রেজার।

