পীরগঞ্জ
সেতুর অভাবে দুর্ভোগ, আটকে যায় বিয়েও

ছবি: আগামীর সময়
ভোরের কুয়াশা কাটতে না কাটতেই ভিড় জমে করতোয়া নদীর কুলানন্দপুর ঘাটে। কেউ স্কুলগামী শিক্ষার্থী, কেউ কৃষক, কেউ বা অসুস্থ স্বজনকে নিয়ে শহরমুখী। সবার চোখে একই অপেক্ষা— একটি নৌকা, আর একটি সেতুর।
অনেক বছর ধরে এই ঘাটের মানুষের জীবন যেন নদীর স্রোতের সঙ্গেই আটকে আছে। বর্ষা এলেই নদী ফুলে ওঠে, স্রোত হয় ভয়ংকর। তখন এই পারাপার শুধু সময়সাপেক্ষ নয়, হয়ে ওঠে জীবনের ঝুঁকিও। তবুও বিকল্প নেই, পার হতেই হবে নদী।
রংপুরের পীরগঞ্জ ও দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত করতোয়া নদী। এ নদীর কুলানন্দপুর ঘাটে সেতু না থাকায় দুপাড়ের মানুষের শেষ নেই দুর্ভোগের। এ এলাকার লোকজন যোগাযোগব্যবস্থার এমন অবস্থায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন। এখানে দীর্ঘদিনের সেতু নির্মাণের দাবি এখন তাদের প্রাণের দাবিতে পরিণত হয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এই ঘাট দিয়ে পারাপার হয় হাজার হাজার মানুষ। স্থানীয় কৃষক, শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী মানুষ থেকে শুরু করে রোগী- সবাইকে নির্ভর করতে হয় নৌকা কিংবা অস্থায়ী ভেলার ওপর। বর্ষা মৌসুমে নদীর পানি বেড়ে স্রোত তীব্র হওয়ায় পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। তখন পারাপার হয়ে ওঠে ঝুঁকিপূর্ণ।
কুলানন্দপুর ঘাট শুধু মানুষের যাতায়াতের পথ নয়, এটি স্থানীয় অর্থনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফসল বাজারে নিতে এই ঘাট ব্যবহার করেন। কিন্তু সঠিক যোগাযোগব্যবস্থা না থাকায় অনেক সময় পণ্য নষ্ট হয়। ন্যায্য দাম পান না তারা।
প্রবল বর্ষণে বন্ধ হয়ে যায় এ এলাকার মানুষের পারাপার। তখন ঘরবন্দি হয় এখানকার মানুষ। কৃষি অর্থনীতিনির্ভর এই অঞ্চলের মানুষের জন্য সেতুর অভাব যেন এক অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাঠ থেকে উৎপাদিত ধান, ভুট্টা, আলু, কাঁচামরিচ ও শাকসবজি বাজারে নিতে বড় ধরনের ভোগান্তির শিকার হতে হয় এ এলাকার প্রান্তিক কৃষকদের। এতে তাদের আর্থিক ক্ষতি যেমন বাড়ছে, তেমনি কমে যাচ্ছে কৃষি উৎপাদনের আগ্রহও।
করতোয়া নদীপাড়ের বাসিন্দা কুলানন্দপুর গ্রামের বকুল মিয়ার বলেছেন, নদীর দুপাড়ের ১৫ থেকে ১৬টি গ্রামের মানুষ এই ঘাটের ওপর নির্ভরশীল। ব্রিজ না থাকায় আমাদের প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হয়। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য এই পারাপার অত্যন্ত কষ্টকর।
একই গ্রামের আরেক বাসিন্দা হারুন মিয়া হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে জানালেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এত উন্নয়ন হয়েছে; কিন্তু আমাদের এই এলাকায় উন্নয়নের কোনো ছোঁয়া লাগেনি। রাস্তা-ঘাটের অবস্থাও খারাপ। নদী পারাপারে নেই কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা। এপারের ছেলেমেয়েকে ওপারে বিয়ে পর্যন্ত দেয় না। আমরা যেন এখনো পিছিয়ে পড়া জনপদের মানুষ হয়ে আছি।
বর্ষা মৌসুম এলেই নদীর পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দুর্ভোগ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। তখন নৌকাও ঠিকমতো চলতে পারে না। অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। জরুরি প্রয়োজনে কেউ হাসপাতালে যেতে চাইলে বিপদের শেষ থাকে না, মন্তব্য কুয়াতপুর গ্রামের দেলোয়ার হোসেনের।
মাটিয়ালপাড়া গ্রামের মিঠু মিয়া জানান, প্রতিদিন স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীরা ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হচ্ছে। অনেক অভিভাবক সন্তানদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে স্কুলে পাঠাতে ভয় পান। একটি ব্রিজ হলে অনেকটা নিরাপদ হতো আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ।
সুধী ও বিশ্লেষকরা মনে করেন, শুধু যাতায়াত নয়, সেতুর অভাবে এ এলাকার সামগ্রিক উন্নয়নও থেমে আছে। ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারিত হচ্ছে না। ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগও সীমিত হয়ে পড়েছে। অনেক তরুণ বাধ্য হয়ে অন্য জেলায় কাজের সন্ধানে চলে যাচ্ছেন। কুলানন্দপুর ঘাটে একটি সেতু নির্মাণ করা হলে পীরগঞ্জ ও ঘোড়াঘাট উপজেলার মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে। এতে সময় ও খরচ উভয়ই কমবে, পাশাপাশি কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারজাত করা সম্ভব হবে।
করতোয়া নদীর কুলানন্দপুর ঘাটে দাঁড়িয়ে সন্ধ্যায় নদীর ওপারে তাকালে দেখা যায় সূর্য ডুবে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে ডুবে যাচ্ছে এখানকার মানুষের বহু বছরের আশা। তবুও তারা স্বপ্ন দেখে একদিন এই নদীর ওপর একটি সেতু হবে, আর সেই সেতু বয়ে আনবে নিরাপদ ও স্বস্তির নিঃশ্বাস।



