সঞ্চয়পত্র কেনার চেয়ে ভাঙছে বেশি
- চলতি বছরে ১৮৫১ কোটি টাকা বেশি ভেঙেছে গ্রাহক
- জানুয়ারিতে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ ৭১৬১ কোটি
- সঞ্চয়পত্র সর্বোচ্চ সুদ হার ১১.৯৮ শতাংশ

ছবিঃ আগামীর সময়
এখনও সঞ্চয়পত্র কেনার চেয়ে ভাঙার প্রবণতা বেশি। স্বাভাবিক হয়নি অর্থনৈতিক অস্থিরতা। জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জানুয়ারি মাসে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ এসেছে ৭ হাজার ১৬১ কোটি টাকা। আর ৯ হাজার ১২ কোটি টাকা ভেঙে ফেলেছেন গ্রাহক। সুতরাং এই খাত থেকে প্রকৃতপক্ষে কোনো অর্থ পায়নি সরকার। বরং নিজের পকেট থেকে শোধ দিতে হয়েছে ১ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন— প্রক্রিয়াগত জটিলতা,সুদের হার ও ট্যাক্স রিটার্ন জনিত সমস্যার কারণে সঞ্চয়পত্র থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন গ্রাহক। তাছাড়া উচ্চ মূল্যস্ফিতিতো রয়েছেই। দৈনন্দিন খরচ সামাল দিতে গিয়ে সঞ্চয়ের দিকে নজর দিতে পরছেন না বহু আমানতকারী।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, করোনার পর থেকে পুরোপুরি শক্ত অবস্থানে যেতে পারেনি বাংলাদেশের অর্থনীতি। করোনার পর ওমিক্রন, এরপর ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, এরপর রাজনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফিতি, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ব্যাংক খাতের অস্থিরতা, এখন আবার শুরু হয়েছে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ। মানুষ সঞ্চয় করার মতো পরিবেশ পেয়েও পাচ্ছে না। একবার মনে হচ্ছে— সব ঠিক হয়ে যাবে। আর পরক্ষণেই মনে হচ্ছে ব্যাংকে টাকা রাখলে আর পাওয়া যাবে না। দোটানার মধ্যে রয়েছে জনগণ।
সঞ্চয়পত্র দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যবিত্ত ও অবসরপ্রাপ্ত মানুষের জন্য নিরাপদ বিনিয়োগ মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত। বিশেষ করে প্রবীণ নাগরিক, গৃহিণী ও স্বল্প আয়ের মানুষের কাছে এটি নিয়মিত আয়ের একটি নির্ভরযোগ্য উৎস। তবে চলতি অর্থবছরের শুরুতে সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের সুদহার কিছুটা কমিয়ে সর্বোচ্চ ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়।
অন্যদিকে সর্বশেষ ফেব্রুয়ারি মাসে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ, যা গত কয়েক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে গত বছর মে মাসে এই হার ছিল ৯ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। পরবর্তী সময়ে এটি ৯ শতাংশের নিচে থাকলেও গত এপ্রিলে ছিল ৯ দশমিক ১৭ শতাংশ এবং জুনে নেমে আসে ৮ দশমিক ৪৮ শতাংশে। এতে অদূর ভবিষ্যতে সঞ্চয় প্রবণতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের সঞ্চয়প্রবণতা কমেছে। আবার আমানত ও সরকারের বিল-বন্ডের সুদের হার বেড়েছে। এতে প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তি পর্যায়ের বিনিয়োগের বড় অংশ ব্যাংক ও বিল-বন্ডে স্থানান্তরিত হয়েছে। এক বছর মেয়াদি ট্রেজারি বিলে সুদহার এখন ১১.৬০ শতাংশ। দীর্ঘমেয়াদি বন্ডে সুদহার উঠেছে ১২.১৭ শতাংশ পর্যন্ত। আবার ব্যাংক বা সঞ্চয়পত্রের মুনাফার মতো এ ক্ষেত্রে কোনো কর দিতে হয় না। বিনিয়োগের ঊর্ধ্বসীমা নেই। চাইলেই বিক্রি করা যায় অন্যের কাছে।
‘বন্ড ও কিছু এফডিআরের সুদহার বাড়ার কারণে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ কমছে। সঞ্চয়পত্রের সুদের হারের তুলনায় এখন ব্যাংক আমানতের সুদহার কম নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যাংক আমানতেই বেশি সুদ পাওয়া যাচ্ছে। আর যেকোনো সময় ভেঙে ফেলা বা বিক্রি করে দিতে পারার কারণে এখন মানুষ ব্যাংক ডিপোজিট ও বন্ডের দিকে ঝুঁকছেন বেশি। আর সঞ্চয়পত্র কমপক্ষে তিন বছর মেয়াদি হয়। শেষ বছরে গিয়ে ভালো মুনাফা পাওয়া যায়। কিন্তু ব্যাংকে কোনো সীমাবদ্ধতা ছাড়াই প্রথম থেকেই বেশি সুদ পাচ্ছেন গ্রাহক। সে জন্য সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগ কমছে’—বলছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম।
চলতি অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে নিট ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, সর্বশেষ জানুয়ারি মাসে সঞ্চয়পত্রে নিট বিনিয়োগ এসেছে ঋণাত্মক ১ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। অর্থাৎ বিনিয়োগের চেয়ে ভাঙার পরিমাণ বেশি। আগের মাসে (ডিসেম্বরে) এসেছিল প্রায় ৩৮৫ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) সঞ্চয়পত্রে নিট বিনিয়োগ এসেছে ৬০৯ কোটি টাকা। অথচ গত অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে সঞ্চয়পত্রের নিট বিনিয়োগ ঋণাত্মক ধারায় ছিল প্রায় ৭ হাজার ১৩ কোটি টাকা।
তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত অর্থবছরের মূল বাজেটে সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে ১৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকার নিট ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। তবে বিক্রিতে নেতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকায় সংশোধিত বাজেটে সেটি কমিয়ে ১৪ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়। তারপরও পুরো অর্থবছরে নিট বিক্রি (বিনিয়োগ) ঋণাত্মক হয় প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ সঞ্চয়পত্র কেনার চেয়ে ভাঙানোর প্রবণতা বেশি ছিল।
তথ্য পর্যালোচনায় আরও দেখা যায়, তার আগের দুই অর্থবছরেও সঞ্চয়পত্রের নিট বিনিয়োগ ঋণাত্মক ধারায় ছিল। এর মধ্যে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মূল বাজেটে সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে নিট ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৮ হাজার কোটি টাকা। তবে বিক্রি ধারাবাহিক কমতে থাকায় সংশোধিত বাজেটে এই লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৭ হাজার ৩১০ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছিল। তবে পুরো অর্থবছরে নিট বিনিয়োগ ঋণাত্মক হয়েছিল প্রায় ২১ হাজার ১২৪ কোটি টাকা। আর ২০২২-২৩ অর্থবছরে নিট বিনিয়োগ ঋণাত্মক হওয়ার পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ২৯৬ কোটি টাকা।
বর্তমানে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের অধীনে চার ধরনের সঞ্চয়পত্র চালু রয়েছে। এগুলো হলো- পরিবার সঞ্চয়পত্র, পেনশনার সঞ্চয়পত্র, পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র এবং তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র। এর মধ্যে পরিবার সঞ্চয়পত্রে সাড়ে ৭ লাখ টাকার কম বিনিয়োগে পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্তিতে মুনাফার হার এখন ১১ দশমিক ৯৩ শতাংশ। আর সাড়ে ৭ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে এ মুনাফার হার ১১ দশমিক ৮০ শতাংশ।
পেনশনার সঞ্চয়পত্রে সাড়ে ৭ লাখ টাকার কম বিনিয়োগে পঞ্চম বছর শেষে মুনাফা ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ। আর সাড়ে ৭ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এই সঞ্চয়পত্রে মুনাফার হার ১১ দশমিক ৮০ শতাংশ। পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার সাড়ে ৭ লাখ টাকার কম বিনিয়োগে মেয়াদ পূর্তিতে মুনাফার হার ১১ দশমিক ৮৩ শতাংশ। আর সাড়ে ৭ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে মুনাফার হার ১১ দশমিক ৮০ শতাংশ। এ ছাড়া তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রে সাড়ে ৭ লাখ টাকার কম বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মেয়াদ পূর্তিতে মুনাফার হার ১১ দশমিক ৮২ শতাংশ এবং সাড়ে ৭ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এ মুনাফার হার ১১ দশমিক ৭৭ শতাংশ।

