আগামীর সময়

শিশুদের গল্পের বইয়ে পাতায় পাতায় ভুল

শিশুদের গল্পের বইয়ে পাতায় পাতায় ভুল

ছবিঃ আগামীর সময়

বই শিশুদের মৌলিক ভাষাদক্ষতা গড়ে তুলতে সাহায্য করে। শুধু তাই নয়, বই শিশুর শব্দভান্ডারকে সমৃদ্ধ করতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে, যা অন্য কোনো মাধ্যমের তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর।

এর অন্যতম কারণ, শিশুতোষ বইয়ে গল্পের পাশাপাশি বিভিন্ন ইলাস্ট্রেশন, গ্রাফিক্স ডিজাইন, চিত্রণ থাকে। সেজন্যই অন্য বইয়ের পাশাপাশি শিশুদের কমিক্স বইয়ের প্রতি আগ্রহী হতে দেখা যায়।

গবেষণায় পাওয়া গেছে যে, বইয়ের পাতা উলটে পাঠ করার সময় মানুষের মস্তিষ্ক সবচেয়ে বেশি কার্যকর থাকে। বই পড়ার সময় শিশুর মস্তিষ্ক শব্দের সঙ্গে দৃশ্যের গভীর সংযোগ ঘটায়।

আর সেজন্যই বাজারজাত শিশুতোষ বইয়ে শুদ্ধ বানানের ব্যবহার হচ্ছে কি-না তা নিশ্চিত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

অথচ সেই শিক্ষণীয় বইয়ের পাতায় পাতায় যদি থাকে বানান ভুলের ছড়াছড়ি, তাহলে তা নিশ্চয়ই চিন্তার বিষয়।

অভিভাবকদের অভিযোগ, তারা সন্তানের জন্য বই কিনতে চান, কিন্তু বাজারে এখন আর এমন বই নেই যা পড়তে শিশুরা আগ্রহী হবে।

বইয়ের প্রকাশনার মান শিশুদের আর আকৃষ্ট করে না, এ ধরনের অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায় অভিভাবকদের কাছ থেকে।

অন্য আরও নানা কারণ থাকলেও এর মূল কারণ বইয়ে থাকা অসংখ্য বানান ভুল।

শিশুতোষ সাহিত্যের সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে বানান ভুলের এই প্রবণতা। অমর একুশে বইমেলায় বা বাজারে পাওয়া শিশুতোষ বইগুলোর পাতা মেললেই দেখতে পাওয়া যায় এই বানান ভুলের আধিক্য।

শুধু তাই নয়, বাক্যের গঠনগত অসামঞ্জস্য এবং অযাচিত বিরাম চিহ্নের ব্যবহারে অনেক বই-ই এখন পড়ার অযোগ্য। লেখক, অনুবাদক এবং প্রকাশনার প্রুফ রিডিংয়ের গাফিলতি এর জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী।

অভিযোগ রয়েছে, দ্রুত বই বাজারজাত করার প্রতিযোগিতায় প্রুফ রিডিংয়ের ধাপটিকে পুরোপুরি উপেক্ষা করছেন প্রকাশকরা।

অনুসরণ করা হচ্ছে না প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম। আবার একই বইয়ের একেক জায়গায় লেখা হয়েছে একেক রকম বানান।

এক অভিভাবক অভিযোগ করলেন, শিশুদের জন্য লেখা প্রায় বইয়েরই প্রচ্ছদ বেশ ভালো, প্রিন্টও মন্দ নয়। কিন্তু ভেতরের বানানগুলো ভুলে ভরা। বানান ভুলের কারণে আমি দুই পাতাও পড়তে পারি না।

বর্তমানে বাজারে নতুন শিশুতোষ বই তেমন না থাকলেও পুরনো উপদেশমূলক শিশুতোষ গ্রন্থ ছাপা এবং বিক্রি করা হচ্ছে। তার মধ্যে বাংলা ভাষায় লেখা বইয়ের চাইতেও বেশি দেখতে পাওয়া যায় অনুবাদ বই। এইসব নীতিকথা সংবলিত গল্পের বইয়ের অনুবাদকের অথবা রূপান্তরকারীর নামের পাশে বিভিন্ন লেখকের নাম থাকলেও ভেতরের বাংলা অনুবাদ থাকে পাঠের অনুপযোগী।

বইগুলোতে বাক্য গঠনের গোলযোগ, বানান ভুলের ছড়াছড়ি আর কৃত্তিম বাক্য-বিন্যাস, সব কিছু মেনে নিয়েই যেন বই কিনতে হয় পাঠককে।

যে বই থেকে নিজেদের শেখার এবং বাচ্চাদের শেখানোর প্রয়াস হওয়ার কথা, সেই বইগুলো থেকেই ছোটরা এবং তাদের অভিভাবকরা খুঁজে বের করছেন বানান ভুল ।

যেমন ‘শিক্ষণীয় গল্প’ নামে একটি বইয়ের কথাই ধরা যাক। যেখানে গল্প রূপান্তরকারী হিসেবে রয়েছে সাঈদুর রহমানের নাম। এ বইয়ের ‘পিঁপড়ে আর ঘুঘু’ গল্পে ‘শিকারির’ জায়গায় লেখা আছে ‘শিকারের’। ‘ইঁদুরের সভা’ গল্পে ‘ঠুনঠুন’ বানানটি লেখা আছে ‘ঠুনঠূন’।

অনেক গল্পে ব্যবহার করা হয়েছে অযাচিত হাইফেন কিংবা সেমিকোলন।

ঈশপের একটি গল্প সমগ্রর কথাই ধরা যাক। এর সম্পাদনা করেছেন সানজিদা রহমান। এ বইয়ের ‘সাপের ডিম’ গল্পে ‘চড়ুই’ বানান অসংখ্য বার লেখা হয়েছে ‘চড়ই’।

বইয়ের শব্দ যেহেতু শিশুর নিজস্ব শব্দ ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করতে কাজে লাগে, সেজন্য এসব বাজারজাত শিশুতোষ বইয়ের বানান ঠিক রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

এছাড়াও কিছু গল্পের বইয়ে ঈশপ, ব্রাদারস্ গ্রীম, পঞ্চতন্ত্রের নাম উল্লেখ থাকলেও সেগুলো আসলেই উদ্বৃত উৎস থেকে নেওয়া কি-না, তা বলা মুশকিল।

যেখানে মনোবিদ এবং বিশেষজ্ঞরা বিশ্বের ক্রমবর্ধমান সহিংসতা রোধে বড়দেরও শিশুতোষ বই পাঠের উপদেশ দেন, সেই জায়গায় শিশুদের বইয়ে এরকম বানান বিভ্রাট হতাশাজনক ঘটনা।

শিশুতোষ বইয়ে নানা অসংগতির কথা স্বীকার করলেন ইমন প্রকাশনীর মিজানুর রহমান। তার মতে, বইয়ের ভুল সম্পর্কে আমি অবগত হয়েছি গত বছর, কিন্তু পরে সেগুলো সংশোধন করে বইমেলায় দেওয়া হয়নি। এ বছর ঈশপের বইগুলো সংশোধন করা হলেও তা এখনো প্রকাশ করা হয়নি। পরে যাতে এ ধরনের ভুল না হয়, সেদিক খেয়াল রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।

বাংলা একাডেমির বানান সমতা বিধান কমিটির সদস্য শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক অধ্যাপক মানবর্দ্ধন পাল বলেছেন, আমাদের দেশে তো শিশুসাহিত্যিকের সংখ্যা খুব বেশি নয়। আবার যারা শিশুদের জন্য লেখেন, তাদের কেউ কেউ বানান বিষয়ে যত্নবান হন না। তারা যদি বাংলা একাডেমির বানান বিধির সর্বশেষ সংস্করণটা অনুসরণ করেন, তাহলে বানান বিভ্রান্তি কিছুটা হলেও কমবে।

    শেয়ার করুন: