সুরের প্রেম বাস্তবে, ভাসতে গিয়ে বাধা মানেনি বয়স

রাহুল দেব বর্মণের সঙ্গে আশা ভোঁসলে
উপমহাদেশের সঙ্গীতে এক জ্বলজ্বলে নক্ষত্রের নাম আশা। আশা ভোঁসলে যে সুরের জন্ম দিয়েছিলেন, সেই সুর আজ থেমে গেল। ভারতীয় সঙ্গীতাঙ্গনে আজ শোকের ছায়া। আশার জীবন ছিল বর্ণাঢ্যময়। এই জীবনে আরেক সুরের জাদুকরের নাম জড়িয়েছিল। তিনি রাহুল দেব বর্মন। তাঁদের সম্পর্কের রসায়ন কেবল স্টুডিওর চার দেওয়ালে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা হয়ে উঠেছিল বিংশ শতাব্দীর অন্যতম আলোচিত এক প্রেমকথা। যা নিয়ে আজও বলিউডে কথা হয়।
১৯৫৬ সাল, শচীন দেব বর্মনের স্টুডিওতে প্রথমবার রাহুল দেব বর্মণকে দেখেছিলেন আশা। তবে পেশাগতভাবে সম্পর্ক তৈরি হতে থাকে ষাটের দশকের শেষ দিকে। ওপি নায়ারের যুগ তখন শেষ হতে চলেছে, আর পঞ্চম তখন হিন্দি গানে ওয়েস্টার্ন এবং জ্যাজ মিউজিকের বিপ্লব ঘটাচ্ছেন। রাহুলের ডাক নাম পঞ্চম। ‘তিসরি মঞ্জিল’ ছবিতে তাঁদের জুটি এক নতুন ইতিহাস তৈরি করল।
মজার কথা হলো, পঞ্চম এবং আশা— দুজনেই তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনে ভাঙা সম্পর্ক আর একাকিত্বের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। রিতা প্যাটেলের সঙ্গে বিচ্ছেদের পর আরডি ছিলেন বিধ্বস্ত, অন্যদিকে প্রথম বিয়ের তিক্ত অভিজ্ঞতা আশাকেও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল। এই সময়ে সুরের প্রতি ভালোবাসা আর একাকী জীবনের শূন্যতা তাঁদের কাছাকাছি নিয়ে আসে।
ভারতীয় সঙ্গীত জগতে এখনো শোনা যায়, পঞ্চম ছিলেন আশার বড় ভক্ত। কিন্তু বিয়ে করতে রাজি হওয়াটা খুব একটা সহজ ছিল না। পঞ্চমের মা মীরা দেব বর্মন প্রথমে এই সম্পর্ক মেনে নিতে চাননি। তবে পঞ্চমের জেদের কাছে হার মানতে হয় সবাইকে। ১৯৮০ সালে চার হাত এক হয়। বয়সে আশা পঞ্চমের চেয়ে ৬ বছরের বড় ছিলেন, কিন্তু সেই বাধা তাঁদের সম্পর্কের গভীরতায় বিন্দুমাত্র আঁচড় কাটতে পারেনি।
তাঁদের দাম্পত্য জীবনও ছিল এক সুরের জলসার মতো। একদিকে যেমন ‘দম মারো দম’ বা ‘চুরা লিয়া হ্যায়’ এর মতো বৈপ্লবিক গান তৈরি হয়েছে, তেমনই বাড়ির রান্নাঘরে চলতো রান্নাবান্নার প্রতিযোগিতা। কারণ দুজনেই ছিলেন ভোজনরসিক। তবে নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ব্যক্তিগত ও পেশাগত কারণে তাঁদের মধ্যে কিছুটা দূরত্ব তৈরি হয়েছিল বলে আলোচনা রয়েছে। যদিও ১৯৯৪ সালে যখন অকালপ্রয়াণে পঞ্চম বিদায় নিলেন, সেই শূন্যতা আশার জীবনে কোনওদিন পূরণ হয়নি।
আশা জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত মঞ্চে উঠলে বা কোনও অনুষ্ঠানে পঞ্চমের স্মৃতি চারণ করতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়তেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, পঞ্চম আজও তাঁর সুরের মধ্যে বেঁচে আছেন। তাঁদের এই প্রেম কেবল একটি সম্পর্ক নয়, বরং সুরের জগতে এক অবিনশ্বর যুগলবন্দী।
অনেক আগের এক সাক্ষাৎকারে আরডিকে বিয়ে করার প্রসঙ্গে আশা বলেছিলেন, "আমার পিছনেই পড়ে থাকত পঞ্চম। আর শুধু বলত, আমি তোমার কণ্ঠের জন্য পাগল। আমি তোমার সুরের প্রেমে রয়েছি। এতবার যখন বলেছিল, তাই বাধ্য হয়ে হ্যাঁ করে দিয়েছিলাম।”
সাক্ষাৎকারে এমনটা বললেও, পঞ্চমকে যে তিনিও ভালোবাসতেন, তা কিন্তু বার বার স্বীকার করেছিলেন। এই সাক্ষাৎকারে আশা এটাও জানান যে, লতা মঙ্গেশকর তাঁদের দুজনের এই সম্পর্ক নিয়ে মুখ ফুটে কখনই কিছু বলেননি। তবে গুঞ্জনে শোনা যায়, আরডির সঙ্গে আশার প্রেম, বিয়েটা খুব একটা ভালো চোখে দেখতেন না লতা।



