আগামীর সময়

রবার্টস-পেনের খোলামেলা আড্ডায় ৪০ বছরের স্মৃতি

রবার্টস-পেনের খোলামেলা আড্ডায় ৪০ বছরের স্মৃতি


দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব, অভিনয়জীবনের অভিজ্ঞতা এবং নতুন সিনেমা নিয়ে খোলামেলা আড্ডায় মেতেছিলেন হলিউডের দুই কিংবদন্তি তারকা জুলিয়া রবার্টস ও শন পেন। আন্তর্জাতিক বিনোদনমাধ্যম ভ্যারাইটি ও সিএনএনের যৌথ অনুষ্ঠান ‘অ্যাক্টরস অন অ্যাক্টরস’-এ দুই তারকা নিজেদের ক্যারিয়ার, সিনেমা নির্বাচন এবং পরিচালকদের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়েও বিস্তর কথা বলেন।

এ বছর দুজনই অভিনয় করেছেন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের দুটি ভিন্নধর্মী সিনেমায়। পরিচালক লুকা গুয়াদাগনিনোর ‘আফটার দ্য হান্ট’ সিনেমায় জুলিয়া রবার্টস অভিনয় করেছেন ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের অধ্যাপক আলমা ইমহফ চরিত্রে। গল্পে দেখা যায়, একজন শিক্ষার্থী তার সহকর্মীর বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তোলার পর আলমা ইমহফকে নিজের বিশ্বাস, পক্ষপাত এবং অতীতের সিদ্ধান্তগুলো নতুন করে ভাবতে হয়। অন্যদিকে পরিচালক পল থমাস অ্যান্ডারসনের ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’ সিনেমায় শন পেন অভিনয় করেছেন কর্নেল স্টিভেন জে. লকজো চরিত্রে। রাজনৈতিক প্রতিশোধের এক মিশনে নেমে এই চরিত্রটি এক বাবা-মেয়ের জীবনে তীব্র অস্থিরতা ও সহিংসতা ডেকে আনে।

আলোচনার শুরুতেই তারা স্মৃতিচারণ করেন তাদের প্রথম পরিচয়ের সময়কার কথা। শন পেন জানান, নিউইয়র্কে ‘দ্য পোপ অব গ্রিনিচ ভিলেজ’ ছবির শুটিং চলাকালে একটি হোটেলে তার প্রথম দেখা হয়েছিল রবার্টসের সঙ্গে। তখন জুলিয়া রবার্টস ছিলেন ১৬ বছর বয়সী কিশোরী। সেই পরিচয় থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তাদের বন্ধুত্ব টিকে আছে। এখন তারা প্রতিবেশীও।

পেনকে রবার্টস জিজ্ঞেস করেন, পল থমাস অ্যান্ডারসনের মতো একজন পরিচালকের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা কেমন। উত্তরে পেন বলেন, অ্যান্ডারসনের সেটে কোনো ধরনের অহংকার বা কর্তৃত্বের সুযোগ নেই। তারকাদের জন্য আলাদা সুবিধাও থাকে না। সবাই নিজের কফি নিজে তৈরি করেন। পুরো মনোযোগ থাকে সিনেমা তৈরির দিকে। তিনি জানান, পরিচালক বেশি বেশি টেক নিতে পছন্দ করেন। গল্পের প্রয়োজনে ভালো দৃশ্যও বাদ দিতে পারেন।

নিজের চরিত্র তৈরির অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে পেন জানান, এই চরিত্রটি তার কাছে স্ক্রিপ্ট পড়ার সময়ই খুব পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। তিনি অনুভব করেছিলেন, চরিত্রটির ভেতরে প্রবেশ করতে তাকে খুব বেশি সংগ্রাম করতে হবে না। বরং তিনি চেষ্টা করেছেন যেন দর্শকের অভিজ্ঞতার পথে কোনো বাধা না তৈরি হয়।

পেন দীর্ঘদিন ধরেই পরিচালক হিসেবেও কাজ করছেন। তাই রবার্টস জানতে চান, অন্য পরিচালকের অধীনে অভিনয় করার সময় তার মধ্যে পরিচালকসুলভ চিন্তা আসে কি না। পেন বলেন, একজন দক্ষ পরিচালকের সঙ্গে কাজ করলে সেই চিন্তা মাথায় আসে না। কারণ তখন অভিনেতা হিসেবে তিনি জানেন, পুরো কাজটি একজন শক্তিশালী পরিচালকের নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে।

অন্যদিকে জুলিয়া রবার্টস লুকা গুয়াদাগনিনোর সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। তিনি জানান, বহুদিন ধরেই এই পরিচালকের কাজের ভক্ত ছিলেন। ‘আফটার দ্যা হান্ট’ ছবির স্ক্রিপ্ট পড়ে তিনি প্রথমবারেই হ্যা বলেন। ছবিটির বিষয়বস্তু বেশ সংবেদনশীল হওয়ায় প্রস্তুতির সময় পরিচালক ও সহশিল্পীরা দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। রবার্টস জানান, পরিচালক, সহশিল্পী এবং কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সহকর্মী তার বাড়িতে এসে বহুদিন ধরে রান্নাঘরের টেবিলে বসে আলোচনা করেছেন। তারা নানা মতামত ভাগাভাগি করেছেন, আবার অন্যদের কথাও মন দিয়ে শুনেছেন। তার মতে, আজকের সমাজে আমরা সবচেয়ে বেশি হারিয়ে ফেলেছি শোনার ক্ষমতাটি—কারণ অনেকেই কেবল নিজের কথা বলার সুযোগের অপেক্ষায় থাকে।

রবার্টস বলেন, ছবিটির শুটিং ছিল খুবই আনন্দময়। এমনকি একদিন পরিচালক নিজেই তাকে বলেছিলেন, এই প্রথম তিনি কোনো সেটে এত আনন্দ পেয়েছেন। ছবির কাজ শেষ হওয়ার পরও তাদের যোগাযোগ বজায় রয়েছে।

এই প্রসঙ্গে শন পেন বললেন, সব গল্প বা শিল্পকর্ম দর্শককে আরাম দেওয়ার জন্য তৈরি হয় না। কখনো কখনো অস্বস্তিকর সত্যও সামনে আনা জরুরি। তার মতে, বর্তমান সময়ে মানুষের অনুভূতি ও মানসিক আঘাত নিয়ে অনেক আলোচনা হয়, কিন্তু লজ্জাবোধ বা আত্মসমালোচনাকেও গুরুত্ব দেওয়া দরকার। কারণ সেই অনুভূতি মানুষকে আরও বিনয়ী ও সচেতন করে তোলে।

আলোচনার এক পর্যায়ে তাদের দীর্ঘ অভিনয়জীবনের প্রসঙ্গও উঠে আসে। জুলিয়া রবার্টস অনুমান করেন, শন পেন হয়তো ৫০টির মতো সিনেমায় অভিনয় করেছেন। কিন্তু পেন জানান, ছোট-বড় সব মিলিয়ে সংখ্যাটি প্রায় ১০০-এর কাছাকাছি হতে পারে। এতে রবার্টস বিস্ময় প্রকাশ করেন এবং বলেন, এতগুলো সিনেমায় অভিনয় করাও এক ধরনের বড় অর্জন।

শেষদিকে আলাপটি আরও ব্যক্তিগত হয়ে ওঠে। দুজনেই একে অন্যের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও প্রশংসা প্রকাশ করেন। শন পেন রবার্টসের পারিবারিক জীবন, সন্তানদের বড় করে তোলার ধরণ এবং পেশাগত সাফল্যের প্রশংসা করেন। অন্যদিকে রবার্টসও পেনের চিন্তাভাবনা ও ব্যক্তিত্বের প্রতি তার মুগ্ধতার কথা জানান।

চার দশকের বন্ধুত্ব, অসংখ্য সিনেমার অভিজ্ঞতা এবং শিল্প নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনা—সব মিলিয়ে এই আড্ডা যেন ছিল দুই হলিউড তারকার জীবনের এক অন্তরঙ্গ ঝলক। কথা শেষ করে তারা যখন ডিনারের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়েন, তখনও বোঝা যাচ্ছিল, তাদের গল্প আর আলোচনা হয়তো সেখানেই আরও দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকবে।

সূত্র: ভ্যারাইটি

    শেয়ার করুন: