ছবিটি কার তোলা, মানুষের না বানরের?

এই ছবি নিয়েই ঘটে গেছে যত কাণ্ড
ইন্দোনেশিয়ার ঘন, আর্দ্র জঙ্গলে ২০১১ সালের কোনো একদিন। বন্য প্রাণীর ছবি তুলছিলেন ব্রিটিশ বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী ডেভিড স্ল্যাটার। সামনে একদল ক্রেস্টেড ব্ল্যাক মাকাক বানর; বিরল, বুদ্ধিমান, কিন্তু ক্যামেরার সামনে তাদের ভীষণ অস্বস্তি।
কাঙ্ক্ষিত ছবি মিলছিল না। তখন ডেভিড এক অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নিলেন। ক্যামেরাটি ট্রাইপডে বসিয়ে অটোফোকাস চালু রেখে বানরদের হাতে ছেড়ে দিলেন। কৌতূহলী প্রাণীগুলো সেটি ঘিরে নাড়াচাড়া করতে লাগল। হঠাৎ এক বানর লেন্সের দিকে তাকিয়ে শাটার চাপল। মুহূর্তেই তৈরি হলো ইতিহাসের সবচেয়ে অদ্ভুত প্রতিকৃতি, একটি ‘বানরের সেলফি’।
প্রথমে এটি ছিল নিছক এক মজার ঘটনা। ছবিটি দ্রুত ভাইরাল হলো, বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দিল। এর কল্যাণে স্ল্যাটার ব্যাপক পরিচিতি পেলেন। কিন্তু আনন্দ বেশিদিন টিকল না। ছবিটি উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশনে আপলোড হলে মানুষ তা বিনামূল্যে ব্যবহার করতে শুরু করে, তখনই শুরু হয় জটিলতা।
স্ল্যাটার দাবি করেন, এতে তার বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু উইকিপিডিয়ার অবস্থান ছিল স্পষ্ট- এই ছবির কোনো কপিরাইট নেই, কারণ এটি কোনো মানুষ তোলেনি।
এই যুক্তিই পরে আইনি রূপ পায়। যুক্তরাষ্ট্রের কপিরাইট অফিস আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, মানুষের বাইরে অন্য কোনো সত্তা; যেমন প্রাণীর তৈরি করা কাজ কপিরাইটের আওতায় পড়ে না। ‘একটি বানরের তোলা ছবি’ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ঘটনাটি এখানেই শেষ হতে পারত, কিন্তু গল্প আরও অদ্ভুত মোড় নেয়।
প্রাণিঅধিকার সংগঠন পেটা বানরের পক্ষ হয়ে মামলা করে বসে, দাবি তোলে- ছবির সব আয় সেই বানরের হওয়া উচিত। আদালত শেষ পর্যন্ত মামলাটি খারিজ করে দেয় একটি সরল যুক্তিতে: প্রাণী আইনি সত্তা হিসেবে মামলা করতে পারে না।
তবে এ ঘটনাটি যে প্রশ্ন উত্থাপন করেছিল, সেটি সেখানেই থেমে থাকেনি। বছর কয়েক পর একই প্রশ্ন আবার সামনে আসে, তবে এবার বানরের জায়গায় আসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। কম্পিউটার বিজ্ঞানী স্টিফেন থেলার তৈরি করেন একটি এআই সিস্টেম; যার নাম দাবুস। তার দাবি, এই সিস্টেম কোনো সৃজনশীল মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই নিজে নিজেই একটি ছবি তৈরি করেছে।
একই সঙ্গে এআই সিস্টেমের বানানো ‘এ রিসেন্ট এন্ট্রেন্স প্যারাডাইস’ নামের ছবিটির কপিরাইট দাবি করেন থেলার। কিন্তু আবারও একই যুক্তি সামনে আসে: স্রষ্টা যদি মানুষ না হয়, তাহলে কপিরাইটও নেই।
এই বিতর্ক শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টে পৌছায়। কিন্তু সর্বোচ্চ আদালত মামলাটি শুনতে অস্বীকৃতি জানিয়ে নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্ত বহাল রাখে। অর্থাৎ, এআই তৈরি কোনো কাজের মালিকানা কেউই দাবি করতে পারবে না- না সেই এআই, না সেটি বানানো ব্যক্তি, এমনকি সেটি ব্যবহার করা ব্যক্তিও।
এই সিদ্ধান্ত প্রযুক্তি ও সৃজনশীলতার জগতের জন্য একটি বড় প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছে। কারণ এতদিন ধারণা ছিল, ভবিষ্যতে হয়তো বিশাল কোম্পানিগুলো পুরোপুরি এআই-নির্ভর সিনেমা, গান বা বই তৈরি করবে। কিন্তু কপিরাইট না থাকলে সেই কনটেন্ট থেকে লাভ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে মানুষের সৃজনশীল ভূমিকা এখনও অমূল্য থেকে যাচ্ছে। ডিজনির মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা, মানুষকে বাদ দিয়ে পুরোপুরি এআই-নির্ভর শিল্প গড়ে তোলা সহজ নয়।
তবে বিতর্ক এখানেই শেষ নয়।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, মানুষ ও এআই একসঙ্গে কিছু তৈরি করলে সেটির মালিক কে? উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে এমন ঘটনা, যেখানে একজন শিল্পী শত শত প্রম্পট দিয়ে এআইকে নির্দেশনা দিয়েছেন, পরে নিজে সম্পাদনা করেছেন। তাহলে সেই কাজ কি পুরোপুরি মানবসৃষ্ট, নাকি আংশিকভাবে যন্ত্রের?
দেশভেদে উত্তরও ভিন্ন।
যুক্তরাষ্ট্র যেখানে এআই-নির্মিত কাজকে কপিরাইটের বাইরে রাখছে, যুক্তরাজ্য সেখানে কিছু ক্ষেত্রে আংশিক ভূমিকা রাখা ব্যক্তিকে মালিক হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে। তবে সেখানেও আইন পরিবর্তনের আলোচনা চলছে, কারণ জেনারেটিভ এআই এই সীমারেখাগুলোকে ক্রমেই অস্পষ্ট করে দিচ্ছে।
সবকিছুর মধ্যে একটি বিষয় ক্রমেই পরিষ্কার হচ্ছে। মানুষের সৃজনশীলতা এখন শুধু নান্দনিক বা আবেগের দিক থেকে নয়, আইনি দিক থেকেও আলাদা মূল্য বহন করে। এআই যত উন্নত হোক, ‘মানুষের স্পর্শ’ এখনও এক বিশেষ পরিচয়।
একটি বানরের হঠাৎ তোলা সেলফি থেকে শুরু হওয়া এই গল্প আজ আমাদের নিয়ে এসেছে প্রযুক্তি, আইন ও মানব পরিচয়ের গভীর এক সন্ধিক্ষণে। সামনে হয়তো আরও অনেক মামলা, আরও অনেক বিতর্ক আসবে। তবে সে যা-ই হোক, প্রতিটি সৃজনশীল কাজের পেছনে একজন মানুষ থাকার প্রয়োজন যে ফুড়াবে না তা নিশ্চিত।



