প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে মাকালু জয় বাবর আলীর

সংগৃহীত ছবি
ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। হিমালয়ের বরফঢাকা ঢালগুলো অন্ধকার আর আলোয় এক অদ্ভুত সীমারেখা এঁকে দাঁড়িয়ে আছে। সেই নিস্তব্ধ, নিষ্ঠুর উচ্চতায়, বাংলাদেশ সময় ভোর ৫টা ৪৫ মিনিটে, একজন মানুষ চুপচাপ দাঁড়িয়ে পড়লেন পৃথিবীর পঞ্চম উচ্চতম শিখরের চূড়ায়।
তার নাম বাবর আলী। আর সেই শিখর, মাউন্ট মাকালু।
এই স্পর্শ শুধু একটি ব্যক্তিগত সাফল্য নয়। এটি বাংলাদেশের জন্য এক নতুন উচ্চতার গল্প। কারণ ৮,৪৮৫ মিটার উঁচু এই শিখরে এটিই প্রথম কোনো বাংলাদেশির পা পড়া।
পৃথিবীতে আট হাজার মিটার বা তার বেশি উচ্চতার পর্বত আছে মাত্র চৌদ্দটি। এই কঠিন তালিকার পাঁচটি শিখর স্পর্শ করলেন বাবর আলী। এর আগে কোনো বাংলাদেশি এতদূর এগোতে পারেননি। মাকালু তার পঞ্চম জয়—আর প্রতিটি জয় যেন একেকটি অসম্ভবকে সম্ভব করার গল্প।
‘গ্রেট ব্ল্যাক ওয়ান’—নামের মধ্যেই আছে ভয় আর রহস্যের ছাপ। মাকালু তার খাড়া ঢাল, তীক্ষ্ণ রিজ আর ভয়ংকর আবহাওয়ার জন্য পর্বতারোহীদের কাছে এক দুঃস্বপ্নের মতো। সেই দুঃস্বপ্নের বুক চিরে এগিয়েছেন বাবর।
৭ এপ্রিল দেশ ছেড়েছিলেন তিনি। দীর্ঘ প্রস্তুতি শেষে ৯ এপ্রিল পৌঁছান নেপালের টুমলিংটার, সেখান থেকে সড়কপথে সেদুয়া গ্রাম। তারপর শুরু হয় পায়ে হাঁটা। ধাপে ধাপে, শ্বাসের সঙ্গে লড়াই করে, উচ্চতার সঙ্গে শরীরকে মানিয়ে নেওয়ার এক ধীর যুদ্ধ।
১৮ এপ্রিল পৌঁছান উচ্চতর বেসক্যাম্পে। কিন্তু এ ধরনের অভিযানে তাড়াহুড়োর সুযোগ নেই। তাই ২১ এপ্রিল ক্যাম্প-১, পরদিন ক্যাম্প-২, ৭ হাজার মিটার ছুঁয়ে আবার নেমে আসা। আবার ওঠা, আবার নামা। এই ওঠানামার মধ্যেই শরীর শেখে কীভাবে বেঁচে থাকতে হয় অক্সিজেনহীন নিষ্ঠুর উচ্চতায়।
২৭ এপ্রিল দ্বিতীয় দফার অভিযানে আবার ক্যাম্প-২। তারপর আবার বেসক্যাম্পে ফেরা। অপেক্ষা। শুধু একটি জিনিসের জন্য, সেটা অনুকূল আবহাওয়া।
অবশেষে সেই সুযোগ আসে ৩০ এপ্রিল।
সেদিন সরাসরি উঠে যান ৬৬০০ মিটারের ক্যাম্প-২ এ। পরদিন ৭৪০০ মিটারের ক্যাম্প-৩। বিকেলটা কাটে অপেক্ষায়, আর রাত নামতেই শুরু হয় শেষ লড়াই।
মাঝরাতে বেরিয়ে পড়েন শিখরের উদ্দেশ্যে। সামনে একটানা ১১০০ মিটারের ভয়ংকর চড়াই। প্রতিটি পা ফেলা মানে শ্বাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, শরীরের সীমা ভাঙার চেষ্টা। অন্ধকারের বুক চিরে, বরফ আর বাতাসের সঙ্গে লড়াই করে—শেষ পর্যন্ত ভোরে পৌঁছে যান চূড়ায়। তার পাশে ছিলেন আং কামি শেরপা, নিঃশব্দ সহযোদ্ধা।
এই অভিযানের নাম ছিল ‘এক্সপিডিশন মাকালু: দ্য ফিফথ ফ্রন্টিয়ার’। আয়োজন করেছে চট্টগ্রামের পর্বতারোহণ ক্লাব ‘ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স’। নেপালের আউটফিটার ‘মাকালু অ্যাডভেঞ্চার’-এর মোহন লামসালের মাধ্যমে খবরটি নিশ্চিত করেন ক্লাবের সভাপতি ফরহান জামান। তবে বাবর আলীর এই সাফল্য হঠাৎ করে আসেনি।
২০১০ সালে ট্রেকিং দিয়ে শুরু। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ে হাঁটতে হাঁটতেই পাহাড় তাকে ডেকে নেয়। ২০১৪ সালে শুরু করেন পর্বতারোহণ। ২০১৭ সালে ভারতের উত্তরকাশীর নেহরু ইনস্টিটিউট অব মাউন্টেনিয়ারিং থেকে নেন প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ।
তারপর একে একে ইতিহাস।
২০২২ সালে আমা দাবলাম—হিমালয়ের অন্যতম কঠিন টেকনিক্যাল শিখর—জয় করে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে নাম লেখান তিনি।
২০২৪ সালে একই অভিযানে এভারেস্ট ও লোৎসে দুটি আট হাজারি শিখর একসঙ্গে জয়, যা আর কোনো বাংলাদেশির নেই।
২০২৫ সালের এপ্রিলে অন্নপূর্ণা-১, বিশ্বের দশম উচ্চতম পর্বত। এরপর সেপ্টেম্বরে মানাসলু—এবার কৃত্রিম অক্সিজেন ছাড়াই, যা বাংলাদেশের জন্য আরেকটি প্রথম।
আর এখন—মাকালু।
প্রতিটি শিখর যেন তার স্বপ্নের মানচিত্রে একেকটি দাগ। চৌদ্দটি আট হাজারি শিখর স্পর্শ করার যে স্বপ্ন, তার পথে এটি পঞ্চম ধাপ।
তবে গল্প এখানেই শেষ নয়। চূড়ায় ওঠা যতটা কঠিন, নিরাপদে নেমে আসা তার চেয়েও কঠিন। পরিকল্পনা অনুযায়ী তিনি আজ ক্যাম্প-২ এবং আগামীকাল বেসক্যাম্পে নামবেন।
এই গল্প শুধু এক পর্বতারোহীর নয়। এটি ধৈর্য, প্রস্তুতি, ভয়কে জয় করা আর অসম্ভবকে চ্যালেঞ্জ করার গল্প।






