আগামীর সময়

কেরানীগঞ্জ

গত বছরও আগুন লেগেছিল কারখানাটিতে

গত বছরও আগুন লেগেছিল কারখানাটিতে

ছবিঃ আগামীর সময়

কেরানীগঞ্জের কদমতলী চৌরাস্তা এলাকার কারখানায় আগুনে পুড়ে মারা গেছেন ৫ জন। গত বছরও এসআর গ্যাস প্রো লাইটার নামের এই কারখানায় অগ্নিকাণ্ড ঘটেছিল। স্থানীয়দের দাবি, এতদিন স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই চলছিল কারখানাটি। অপরদিকে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা জানাচ্ছেন, কাঁচামাল ও দাহ্য উপকরণ থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। নিহতদের পরিচয় শনাক্তে করতে হবে ডিএনএ টেস্ট। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন বেশ কয়েকজন। অনেকে এখনও নিখোঁজ।

সরেজমিনে দেখা যায়, অগ্নিকাণ্ডের পর গ্যাস রিফিলের মেশিনারিগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে কারখানায়। ছড়িয়ে ছোট ছোট ম্যাচ লাইটারও। আগুনের তাপে পুরো কারখানার ফ্লোর ফেটে গেছে। অবশিষ্ট নেই কিছুই। এর আগে শনিবার দুপুর পৌনে ১টায় দিকে কারখানাটিতে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত। ফায়ার সার্ভিসের ৭টি ইউনিট প্রায় দেড় ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

‘খবর পাওয়ার পর দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার ও অগ্নিনির্বাপণ কাজ শুরু করে ফায়ার সার্ভিস। আগুনের তীব্রতা বাড়তে থাকায় প্রথমে তিনটি ইউনিট, পরে আরও চারটি ইউনিট একসাথে কাজ করে’, বলছিলেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মিডিয়া সেলের কর্মকর্তা আনোয়ারুল ইসলাম দোলন।

তিনি জানান, দুপুর ২টা ৩০ মিনিটের দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। আগুন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসে ৪টা ৪৪ মিনিটে।

এ ঘটনায় পুড়ে অঙ্গার হওয়া নিহতদের পরিচয় এখনও মেলেনি। তারা পুরুষ না নারী তাও স্পষ্ট নয়। নিহতদের স্যার সলিমুল্লাহ কলেজ মিডফোর্ট হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। ডিএনএ টেস্টের পর শুরু হবে লাশ হস্তান্তর প্রক্রিয়া।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানাচ্ছেন, উদ্ধারকারী দল কারখানা থেকে ২০টির বেশি গ্যাস সিলিন্ডার উদ্ধার করে পাশের একটি মাঠে রেখেছে। সিলিন্ডারগুলো একসাথে ব্লাস্ট হলে পুরো এলাকা ধ্বংস হয়ে যেতে পারত। এ ঘটনায় পুড়ে গেছে কারখানার চারপাশের টিন। পুড়ে গেছে ভবনের একপাশে রাখা একটি গাড়িও। শুধু কারখানায় মূল ফটকটি রক্ষা পায় আগুন থেকে।

নিখোঁজ শাহিনূর, পারভীন ...

স্বামীর কথায় বছরখানেক আগে চাকরি ছাড়েন শাহিনূর আক্তার (৩৫)। কিন্তু অভাবের কারণে তিন দিন আগে এই কারখানায় যোগ দিয়েছিলেন। অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে তার খোঁজ পাচ্ছেন না স্বজনরা।

শাহিনূরের বাড়ি মাদারীপুরের কালকিনী থানায়। তিনি স্বামীর সাথে কেরানীগঞ্জের গোলামবাজারে থাকতেন।

শনিবার সন্ধ্যায় শাহিনূরের খোঁজ নিতে দেখা যায় স্বজনদের। ফোনে তার ছবি দেখিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন কেউ কেউ।

‘আমার চাচাতো বোন সকালে কাজে এসেছিল। আগুন লাগার খবর পাওয়ার পর থেকে তার ফোন বন্ধ পাচ্ছি, কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না’, আগামীর সময়কে বলছিলেন শাহিনূরের চাচাতো ভাই সাগর হোসেন।

শাহিনূরের মতো ওই কারখানায় কাজ করতেন পারভীন আক্তার। তাকেও খুঁজে পাচ্ছেন না স্বজনরা। তিনি দেড় বছর ধরে কারখানাটিতে কাজ করতেন।

পারভীনের এনআইডি কার্ড নিয়ে লোকজনকে দেখাচ্ছিলেন ছেলে জাহিদ। পারভীনের বাড়ি লক্ষীপুর। তিনি সন্তানের সাথে গোলামবাজারের ওয়াশমিলের গলিতে থাকেন। তার ছেলে পেশায় দিনমজুর। পারভীনের নাতনি মিম আক্তারও গত ৬ মাস ধরে তার সঙ্গে কাজ করে কারখানায়।

‘মা সকালে কাজে এসেছিল। এই কারখানায় আমার মেয়ে মিমও কাজ করে। আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে মেয়ে বের হয়ে বাসায় গিয়ে বলে, কারখানায় আগুন লেগেছে। দাদিকে খুঁজে পাচ্ছি না। এই কথা শুনে আমি দৌঁড়ে এসে দেখি দাউ দাউ আগুন জ্বলছে। চারদিক অন্ধকার। আগুন নেভার পর থেকে সব জায়গায় খুঁজছি। কোথাও মাকে পাচ্ছি না’, জানাচ্ছিলেন অশ্রুসিক্ত জাহিদ।

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় বেশ কয়েকজন নিখোঁজ বলে দাবি কারখানা কর্মচারীদের।

‘একটি মহিলার চেহারা চেনা যাচ্ছিল’

ওই কারখানার পাশেই একটি বাসায় থাকেন স্থানীয় মো. মাসুদ। অগ্নিকাণ্ডের পর মরদেহ বের করার কাজে সহযোগিতা করেছিলেন তিনি।

মাসুদের ভাষ্য, ‘আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। হঠাৎ বাসার লোকজন বলেন, আগুন লেগেছে। সঙ্গে সঙ্গে দৌঁড়ে আসি। এসে দেখি কয়েকজন বের হয়েছে। তারা জানিয়েছিল, ভেতরে কেউ নেই। কিন্তু আগুন নেভার পর কয়েকজনের লাশ বের হয়েছে। শুধু একটি মহিলার চেহারা চেনা যাচ্ছিল। ভেতরে পোড়াস্তূপে আরও মরদেহ থাকতে পারে।’

ফাযার সার্ভিসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, পোড়াস্তূপ সরাতে স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় ভেকু আনা হচ্ছে। ভেকু এলে আর মরদেহ আছে কিনা সেটি পরীক্ষা করে দেখা হবে।

গত বছরও আগুন লেগেছিল

‘এই কারখানায় গত বছরও আগুন লেগেছিল। প্রশাসন কোনো ব্যবস্থায় নেয়নি তখন। এ বছর আবার লাগল’, ঘটনাস্থলে থাকা স্থানীয় নুর ইসলাম ও কাইয়ুমের প্রতিক্রিয়া এমনই।

অপরদিকে মাসুদ নামে এক প্রত্যক্ষদর্শীর অভিযোগ, ‘আগুন লাগার সাথে সাথে কারখানার দারোয়ান ভেতরে লোকজন রেখে তালা আটকে দেয়, যেন বাইরের কেউ ভেতরে ঢুকতে না পারে। পরে ভেতরে আগুন বেড়ে গেলে তালা খুলে দেয়। ভিতরে শতাধিক শ্রমিক ছিল। কতজন মারা গেছে নিশ্চিত নই।’

মাসুদের দাবি, কেরানীগঞ্জের আনাচে-কানাচে এমন কারখানার অভাব নেই। প্রশাসনের দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া দরকার।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. মকবুলের মতে, গত বছরের আগুনে এমন ভয়াবহতা ছিল না। তবে চারপাশে আতঙ্ক ছড়িয়েছিল। তখন প্রশাসন থেকে কারখানাটি সিলগালা করার কথা ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে কিছুই হয়নি। সিলগালা করলে আজ ৫টি প্রাণ ঝরত না।

একই অভিযোগ পাশের ভাড়াটিয়া সাহেব আলীর। ‘আমাদের জানামতে কারখানাটির কাগজ নেই। অবৈধভাবেই চলছে। গত বছরও দুর্ঘটনা ঘটেছিল। সবাইকে ম্যানেজ করেই হয়তো আবার চালু করেছে।’

কারখানাটির কোনো কর্মচারী নিখোঁজ থাকলে থানায় অভিযোগ করার অনুরোধ জানিয়েছেন কেরানীগঞ্জ সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর আলম।

‘ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে নিহতদের লাশ হস্তান্তর করা হবে। যদি কেউ নিখোঁজ থাকে বা লাশের দাবি করেন তাও টেস্ট করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে সন্ধ্যা পর্যন্ত নিহতদের কোনো স্বজন থানায় আসেনি’, আগামীর সময়কে সর্বশেষ খবর জানাচ্ছিলেন তিনি।

কারখানাটির বৈধ কাগজপত্র ছিল কিনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলেও জানান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার।

    শেয়ার করুন: