‘সাবেক’ স্ত্রীর মামলায় অভিযোগপত্র, বিচারের কাঠগড়ায় বিচারক

মো. ছানাউল্ল্যাহ। ছবি: সংগৃহীত
মো. ছানাউল্ল্যাহ। পেশায় বিচারক। প্রেষণে বর্তমান কর্মস্থল বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন। কর্মরত প্রতিষ্ঠানটির আইন অনুবিভাগের উপসচিব (আইন) হিসেবে। এর আগে ছিলেন ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্বে। বহু ভুক্তভোগীর বিচারের রায় দেওয়া এই বিচারক নিজেই এখন বিচারের কাঠগড়ায়।
যৌতুক ও নির্যাতনের অভিযোগে ‘সাবেক’ স্ত্রীর করা মামলায় তাকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দিয়েছে পুলিশ। গত ৩০ এপ্রিল ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন এ চার্জশিট জমা দেয়। অভিযোগ উঠেছে, প্রভাবশালী এক মন্ত্রীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে ছানাউল্ল্যাহ প্রভাব খাটিয়ে গোপন রাখতে চেয়েছিলেন এ খবর। এমন পরিস্থিতিতে ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে সংশয়ে ভুক্তভোগী।
রাজধানীর বনানীর ধনাঢ্য গাড়ি ব্যবসায়ী নাসরিন আক্তার মৌ। তার ভাষ্য, বিচারক ছানাউল্ল্যাহ তার সঙ্গে দীর্ঘদিন ছিলেন বিয়েবহির্ভূত সম্পর্কে। পরে তাকে গোপনে বিয়ে করে হাতিয়ে নেন মোটা অঙ্কের টাকা। এরপর এড়িয়ে চলতে শুরু করেন। একপর্যায়ে বিয়েই অস্বীকার করে ঘটনাটি প্রকাশ না করতে দিতে থাকেন হুমকি। এমন পরিস্থিতিতে ছানাউল্ল্যাহর বিরুদ্ধে গত ১৩ জানুয়ারি মামলা করেন বনানী থানায়। মামলার পর আপসের কথা বলে আরেক দফা ব্ল্যাকমেইল করা হয় তাকে। সব মিটমাটের আশ্বাসে ঘনিষ্ঠ হন ফের। মামলা তুলে নেওয়ার শর্তে প্রতিশ্রুতি দেন সংসার করারও।
নাসরিন আক্তার মৌয়ের দাবি, ‘ছানাউল্ল্যাহ সংসার করার প্রস্তাব দিলেও একসঙ্গে থাকা সম্ভব নয় বলে জানান । কিন্তু ফের প্রতারিত হওয়ার ভয়ে এ প্রস্তাব মেনে নেননি; তোলেননি মামলাও।’
মামলার এজাহারে মৌ উল্লেখ করেন, ব্যবসায়িক লেনদেনে সহায়তার সূত্র ধরে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে তার সঙ্গে পরিচয় ছানাউল্ল্যাহর। পারিবারিক কলহের কারণে প্রথম স্ত্রীকে তালাক দিয়েছেন বলে জানান ছানাউল্ল্যাহ। তার রয়েছে তিন সন্তান, যারা থাকে মায়ের কাছে। এ ধরনের মিথ্যা তথ্য দিয়ে মৌকে বিয়ের প্রস্তাব দেন । এতে রাজি হয়ে গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বর ৫ লাখ টাকা দেনমোহরে তাকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর বিভিন্ন প্রয়োজন এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে যৌতুক দাবি করেন, নেন টাকা। সবশেষ নিশান ব্র্যান্ডের একটি গাড়ি এবং তার গ্রামের বাড়ির পাশে ৭ কোটি টাকা দামের সম্পত্তি যৌতুক হিসেবে কিনে দিতে চাপ দিতে থাকেন। এতে রাজি না হলে তাকে মারধর এবং গলা টিপে হত্যাচেষ্টা করেন ছানাউল্ল্যাহ।
জানা গেছে, এ মামলার তদন্ত শেষে গত ৩০ এপ্রিল আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছেন ডিএমপির উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন বিভাগের এসআই শাহানাজ বেগম।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, মামলার বাদী নাসরিন আক্তার মৌ প্রতিষ্ঠিত গাড়ি ব্যবসায়ী। তিনি তালাকপ্রাপ্ত এবং তিন সন্তানের জননী। সন্তানদের নিয়ে থাকেন গুলশানের একটি বাসায়। ব্যবসায়িক লেনদেনের পাওনা টাকা আদায়ে আইনি সহায়তার সূত্র ধরে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ছানাউল্ল্যাহর সঙ্গে তার পরিচয়। সেই সূত্রে তার সঙ্গে গড়ে ওঠে সম্পর্ক। গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বর বিয়ে করেন তারা। মৌ সন্তানদের নিয়ে গুলশানের নিজ বাসায় থাকলেও ছানাউল্ল্যাহর সঙ্গে সংসার করতে বনানীতে বাসা ভাড়া নেন দুজন।
মৌয়ের অভিযোগ, সংসার করতে দামি দামি সব আসবাব দিয়ে সাজিয়েছিলেন বাসা। স্বামীর কথামতো বাসা ভাড়ার টাকাও দিতেন। স্বামী ছানাউল্ল্যাহ ওই বাসায় মাঝেমধ্যে করতেন আসা-যাওয়া। কিন্তু বিয়ের পর থেকে নানা অজুহাতে তার কাছ থেকে নিতেন টাকা। এ ছাড়া গাড়ি ও জমি কিনে দিতেও চাপ সৃষ্টি করতেন ছানাউল্ল্যাহ।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, গত বছরের ২৭ নভেম্বর সন্ধ্যায় বনানীর বাসায় কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে স্ত্রী মৌয়ের কাছে যৌতুক হিসেবে গাড়ি ও জমি কিনে দেওয়ার দাবি করেন ছানাউল্ল্যাহ। মৌ রাজি না হলে ছানাউল্ল্যাহ তাকে মারধরে জখম করেন।
মামলার তদন্ত ও মেডিকেল সনদ পর্যালোচনায় ছানাউল্ল্যাহর বিরুদ্ধে এসব অপরাধ সত্য প্রমাণিত হয় বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ রয়েছে।
অভিযোগপত্রের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয় ডিএমপির নারী সহায়তা এবং তদন্ত বিভাগের এসআই শাহানাজ বেগমের কাছে। তিনি বললেন, তদন্তে সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ শেষে আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে চার্জশিট।
যদিও বিচারক মো. ছানাউল্ল্যাহর দাবি, মিথ্যা অভিযোগে করা মামলায় পুলিশকে ম্যানেজ করে দেওয়া হয়েছে এই অভিযোগপত্র। গত শুক্রবার দুপুরে মোবাইল ফোনে তিনি আগামীর সময়কে বললেন, ‘অভিযোগের সপক্ষে কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ নেই।’
‘অভিযোগপত্র এখনো আদালত গ্রহণ করেনি। এটা বিচারিক প্রক্রিয়ায় মোকাবিলা করা হবে। এই সাজানো অভিযোগপত্র আদালত গ্রহণ করবে না বলেই আমার বিশ্বাস’—যোগ করলেন ছানাউল্ল্যাহ।
একই সুর ছানাউল্ল্যাহর আইনজীবী আব্দুস সালাম হিমেলের কণ্ঠেও। তিনি বললেন, ‘মামলার আসামি ও বাদী দুজনে স্বামী-স্ত্রী ছিল। স্বামীর কথা হলো, তাকে জোরপূর্বক বিয়ে করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে বাদীকে ডিভোর্স দেওয়া হয়েছে। ডিভোর্স সম্পর্কে জানার পর বাদী মামলাটা করেছিল।’



