জামাইকার প্রবালস্বর্গের পতন
সমুদ্রের নিচে হারিয়ে যাওয়া এক পৃথিবীর গল্প

সংগৃহীত ছবি
১৯৬৬ সালের এক সকাল। ক্যারিবীয় সাগরের নীল জল তখনো মানুষের লোভ, উষ্ণতা আর দূষণের কাছে পুরোপুরি পরাজিত হয়নি। জামাইকার উত্তর উপকূলে দাঁড়িয়ে তরুণ সামুদ্রিক বিজ্ঞানী আইলিন গ্রাহাম ধীরে ধীরে ডুব দিচ্ছিলেন সমুদ্রের গভীরে। তার হাতে ছিল ক্যামেরা, চোখে বিস্ময়, উদ্দেশ্য ছিল প্রবালপ্রাচীরের জীবনকে ধরে রাখা। তখন কেউ জানত না, সেই ডুবই একদিন হয়ে যাবে ইতিহাস।
ডিসকভারি বে, রানঅ্যাওয়ে বে, আর রিও বুয়েনোর জলে টানা দুই বছর ধরে আইলিন গ্রাহাম তুলেছিলেন এক হাজারেরও বেশি ছবি। ডিজিটাল যুগ তখনো আসেনি। প্রতিটি ছবি ছিল যত্নে তোলা, সময় নিয়ে সংরক্ষণ করা। সেই ছবিগুলোতে দেখা গিয়েছিল এক অন্য জামাইকা—যেখানে সমুদ্রের তলদেশ রঙিন প্রবালে ঢাকা, ঢেউয়ের ভেতর ভেসে বেড়াচ্ছে স্ন্যাপার আর গ্রুপার মাছের দল। আর চারপাশ যেন জীবন্ত এক জঙ্গল।
আজ বহু বছর পর সেই ছবিগুলো আবার আলোচনায় এসেছে। তবে সৌন্দর্যের কারণে নয়, বরং হারিয়ে যাওয়া এক পৃথিবীর সাক্ষী হিসেবে।
সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হলো মানুষ ধীরে ধীরে এই ধ্বংসকে ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে মেনে নিতে শুরু করেছে। নতুন প্রজন্ম হয়তো জানেই না, সুস্থ প্রবালপ্রাচীর দেখতে কেমন ছিল। তাই আইলিন গ্রাহামের ছবিগুলো এখন শুধু স্মৃতি নয়, এক ধরনের সতর্কবার্তা
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার জামাইকান সামুদ্রিক বিজ্ঞানী জেলানি উইলিয়ামস বলেছিলেন, ‘আইলিনের ছবিতে প্রবালের যে বৈচিত্র্য দেখা যায়, তা অবিশ্বাস্য। পুরো পরিবেশটা যেন সমুদ্রের রেইনফরেস্ট।’
সত্যিই তাই। ছবিগুলো শুধু প্রবাল দেখায় না, দেখায় এক সময়ের জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র। কিন্তু সেই স্বর্গ এখন আর নেই।
একসময় জামাইকার প্রবালপ্রাচীরকে ক্যারিবীয় অঞ্চলের সবচেয়ে সমৃদ্ধ সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের অংশ হিসেবে ধরা হতো। কিন্তু ধীরে ধীরে বিপর্যয় নেমে আসে। ১৯৮০ সালে হারিকেন অ্যালেন ভয়াবহ আঘাত হানে প্রবালপ্রাচীরে। এরপর আসে দূষণ, অতিরিক্ত পর্যটন, আগ্রাসী প্রজাতির আক্রমণ, আর জলবায়ু পরিবর্তনের উষ্ণতা। সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়তে থাকে, ঝড় আরও শক্তিশালী হতে থাকে। আর প্রবালগুলো একে একে ভেঙে পড়ে।
এর সঙ্গে কমতে থাকে ম্যানগ্রোভ বনও— যে বন প্রবালকে রক্ষা করে, মাছের বংশবিস্তার নিশ্চিত করে এবং উপকূলকে স্থিতিশীল রাখে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হলো মানুষ ধীরে ধীরে এই ধ্বংসকে ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে মেনে নিতে শুরু করেছে। নতুন প্রজন্ম হয়তো জানেই না, সুস্থ প্রবালপ্রাচীর দেখতে কেমন ছিল। তাই আইলিন গ্রাহামের ছবিগুলো এখন শুধু স্মৃতি নয়, এক ধরনের সতর্কবার্তা।
ছবিগুলোতে দেখা যায় বিশাল শাখা-প্রশাখার মতো প্রবাল পুরো সমুদ্রতল ঢেকে রেখেছে। তাদের ফাঁকে ফাঁকে ছুটে যাচ্ছে রঙিন মাছের দল। আজ সেই দৃশ্য প্রায় অদৃশ্য। কোথাও কোথাও প্রবালের জায়গা দখল করেছে শৈবাল, কোথাও আবার মৃত সাদা কাঠামো পড়ে আছে সমুদ্রতলে। এই পরিবর্তনের প্রভাব শুধু পানির নিচেই সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব পৌঁছে গেছে সৈকত পর্যন্ত।
জামাইকার ইউনিভার্সিটি অব দ্য ওয়েস্ট ইন্ডিজের সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী ক্যামিলো ট্রেঞ্চ বলেছেন, ‘মানুষ যখন জামাইকার সাদা বালুর সৈকতে ঘুরতে আসে, তখন অনেকেই জানেন না। এই সাদা বালুর বড় অংশই এসেছে বহু পুরনো প্রবালপ্রাচীর থেকে।’
অর্থাৎ প্রবাল ধ্বংস মানে শুধু সামুদ্রিক প্রাণ হারানো নয়; হারিয়ে যেতে পারে সৈকতও। গবেষণা বলছে, প্রবালপ্রাচীর দুর্বল হলে উপকূল ভাঙন বাড়ে, সৈকত ক্ষয়ে যায়। জামাইকার প্রবালপ্রাচীর ধ্বংসের পেছনে আরও এক নীরব বিপর্যয়ের গল্প আছে।
১৯৮৩ সালে রহস্যজনক এক রোগে মারা যেতে শুরু করে ডায়াডেমা অ্যান্টিলারাম নামের কালো কাঁটাওয়ালা সামুদ্রিক সি-আর্চিন। ছোট এই প্রাণীগুলো প্রবালের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তারা শৈবাল খেয়ে প্রবালকে বাঁচিয়ে রাখত। কিন্তু হঠাৎ ব্যাপক হারে তাদের মৃত্যুতে শৈবাল দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রবালকে ঢেকে ফেলতে শুরু করে।
ধারণা করা হয়, জাহাজের ব্যালাস্ট পানির মাধ্যমে কোনো অজানা জীবাণু এসেছিল। সেই বিপদ এখনো শেষ হয়নি। ২০২২ সালেও আবার সি-আর্চিনের ব্যাপক মৃত্যু দেখা গেছে।
অন্যদিকে পর্যটন শিল্পের চাপও পরিস্থিতি আরও খারাপ করেছে। পর্যটকদের খাবারের চাহিদা মেটাতে অতিরিক্ত হারে ধরা হচ্ছে স্ন্যাপার আর গ্রুপার মাছ। অথচ এই মাছগুলোও শৈবাল নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখত। মাছ কমে যাওয়ায় শৈবাল আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, প্রবালের ওপর ছায়া ফেলে, সূর্যালোক আটকায় এবং শেষ পর্যন্ত প্রবালকে মেরে ফেলে।
তারপর এলো আরেক দুঃস্বপ্ন। গত বছর ক্যাটাগরি-৫ হারিকেন মেলিসা আঘাত হানে জামাইকায়। ঘণ্টায় ২৯৫ কিলোমিটার গতির বাতাস উপকূল জুড়ে তাণ্ডব চালায়। বাড়ির ছাদ উড়ে যায়, ফলের গাছ ভেঙে পড়ে, মানুষ সবকিছু হারায়। এটি ছিল দ্বীপটিতে আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী ঝড়।
ম্যানগ্রোভ আমাকে সবচেয়ে বেশি আশা দেয়। তারা খুব শক্তিশালী, জলবায়ু সহনশীল
জেলানি উইলিয়ামস বলছিলেন, ‘আমি জানতাম না ক্যাটাগরি-৫ হারিকেন আসলে কেমন হয়। এর ধ্বংস কত গভীর হতে পারে, তা নিজের চোখে না দেখলে বোঝা যায় না।’
মানুষ এখনো সেই ট্রমা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। আর সমুদ্রের নিচে প্রবালগুলোর ক্ষতি কতটা হয়েছে, তার পুরো চিত্র হয়তো এখনো জানা যায়নি। তবু আশা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।
ক্যামিলো ট্রেঞ্চ এখন কাজ করছেন ‘জামাইকা ম্যানগ্রোভস প্লাস’ প্রকল্পে। এর লক্ষ্য দ্বীপ জুড়ে ম্যানগ্রোভ বন সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার করা। কারণ অনেক সামুদ্রিক প্রাণী তাদের জীবনের প্রথম সময় কাটায় এই ম্যানগ্রোভ বনে। এগুলো যেন প্রবালের শিশুদের নার্সারি।
ম্যানগ্রোভ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজও করে। এগুলো বিপুল পরিমাণ কার্বন শোষণ করে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমাতে সাহায্য করে।
ট্রেঞ্চ বলেছিলেন, ‘ম্যানগ্রোভ আমাকে সবচেয়ে বেশি আশা দেয়। তারা খুব শক্তিশালী, জলবায়ু সহনশীল।’
অন্যদিকে উইলিয়ামস মনে করেন, শুধু প্রবাল নয়, প্রবালের সঙ্গে থাকা অণুজীবগুলোকেও রক্ষা করতে হবে। কারণ এই ক্ষুদ্র জীবাণুগুলোই প্রবালকে সুস্থ রাখে। তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা এখন ক্যারিবীয় অঞ্চলে এক নতুন স্বাভাবিক অবস্থার মধ্যে বাস করছি। তাই পুরনো পদ্ধতিতে আর হবে না। আমাদের আরও সামগ্রিকভাবে ভাবতে হবে।
২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ প্রবালপ্রাচীর মারা যেতে পারে। তাই আইলিনের মতো মানুষের সংরক্ষণ করা ছবিগুলো এখন শুধু ইতিহাস নয়, ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা
দুই বিজ্ঞানীরই মত, শুধু সচেতনতা দিয়ে হবে না; দরকার কঠোর সরকারি পদক্ষেপ। পরিবেশ আইন আরও শক্ত করতে হবে, হোটেল নির্মাণ ও জাহাজ চলাচল নতুনভাবে ভাবতে হবে এবং গবেষণায় বাড়াতে হবে বিনিয়োগ।
ট্রেঞ্চ সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘তাপমাত্রা আর দূষণ এভাবে বাড়তে থাকলে আরও বহু প্রজাতি হারিয়ে যাবে। কিন্তু এখনো সময় আছে। জামাইকা চাইলে ঘুরে দাঁড়াতে পারে। তবে তার জন্য কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’
আজ আইলিন গ্রাহামের সেই পুরনো ছবিগুলোর দিকে তাকালে মনে হয়, যেন হারিয়ে যাওয়া এক পৃথিবীর জানালা খুলে গেছে। এমন এক জামাইকা— যেখানে সমুদ্র ছিল প্রাণে ভরা, প্রবাল ছিল অরণ্যের মতো ঘন।
বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ প্রবালপ্রাচীর মারা যেতে পারে। তাই আইলিনের মতো মানুষের সংরক্ষণ করা ছবিগুলো এখন শুধু ইতিহাস নয়, ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা।
তবে গবেষক জনসন মনে করিয়ে দেন, শুধু অতীতের জন্য আফসোস করলে চলবে না। আমাদের এখনকার পরিবর্তনগুলোর প্রতিক্রিয়াও বুঝতে হবে। কিছু প্রবাল হয়তো এখনো লড়াই করছে, কিছু হয়তো বেশি সহনশীল।
তার কণ্ঠে উদ্বেগ স্পষ্ট। বলছিলেন, ‘আজ জামাইকা আর ক্যারিবীয় অঞ্চলে যা দেখা যাচ্ছে, সেটা স্বাভাবিক নয়। আইলিনের মতো আরও সংগ্রহ সংরক্ষণ করা জরুরি হারিয়ে যাওয়ার আগেই।
ভাষান্তর: মনির হোসেন রনি








