একুশে ফেব্রুয়ারি যেভাবে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হলো

সংগৃহীত ছবি
ভাষা মানুষের আত্মপরিচয়ের প্রথম ভিত্তি। যে ভাষায় আমরা স্বপ্ন দেখি, ভালোবাসি, প্রতিবাদ করি সেই মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার ইতিহাসে বাঙালির অবদান বিশ্বে অনন্য। রক্তের বিনিময়ে অর্জিত সেই ভাষা-অধিকারের স্মৃতি একসময় জাতীয় গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে। কিন্তু এই স্বীকৃতি হঠাৎ আসেনি, এর পেছনে ছিল প্রবাসী উদ্যোগ, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং দীর্ঘ পথচলা।
২১ শে ফেব্রুয়ারি আজ বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয়। কিন্তু এই স্বীকৃতি অর্জন মোটেও সহজ ছিল না। বহু ত্যাগ, সংগ্রাম ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফলেই দিনটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ছাত্রসমাজ রাজপথে নামে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর গুলিতে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ আরো অনেকে শহীদ হন। তাদের আত্মত্যাগ বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করে এবং ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ভিত্তি গড়ে দেয়।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ আসে নব্বইয়ের দশকে। ১৯৯৮ সালের ৯ জানুয়ারি কানাডাপ্রবাসী বাঙালি রফিকুল ইসলাম জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব কফি আনানের কাছে চিঠি পাঠান। এতে তিনি ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণার প্রস্তাব দেন। পরবর্তীতে বিষয়টি জানানো হয় ইউনেস্কোতে কারণ ভাষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক সিদ্ধান্তের দায়িত্ব এই সংস্থার অধীনেই পড়ে।
১৯৯৯ সালে প্যারিসে ইউনেস্কোর ৩০তম সাধারণ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব উত্থাপন করে। তবে শুরুতে কিছু জটিলতা দেখা দেয় দিবস পালনে সম্ভাব্য ব্যয় এবং নাম নির্ধারণ নিয়ে। তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী এ এইচ কে সাদেক অধিবেশনে ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সমর্থন আদায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি যুক্তি দেন এ দিবস পালনে আলাদা অর্থের প্রয়োজন নেই; মানুষ নিজ নিজ ভাষার মর্যাদা উদযাপন করবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে।
পরবর্তীতে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কোর ৩০তম সাধারণ সম্মেলনে সর্বসম্মতিক্রমে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ২০০০ সাল থেকে দিনটি বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে।
পেছনের ইতিহাস
১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ইউনেসকোর ৩০তম অধিবেশন বসে। ইউনেসকোর সেই সভায় একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণার প্রস্তাব পাস হয়। ফলে পৃথিবীর সব ভাষাভাষীর কাছে একটি উল্লেখযোগ্য দিন হিসেবে একুশে ফেব্রুয়ারি স্বীকৃতি পায়। বিশ্বের দরবারে বাংলা ভাষা লাভ করে বিশেষ মর্যাদা। ঠিক পরের বছর ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে পৃথিবীর ১৮৮টি দেশে এ দিনটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন শুরু হয়।
২১ ফেব্রুয়ারির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করার আগে, দিনটি মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালনের জন্য বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে দাবি শোনা যায়। তবে এ বিষয়ে প্রথম সফল উদ্যোক্তারা হলেন কানাডার বহুভাষিক ও বহুজাতিক মাতৃভাষা-প্রেমিকগোষ্ঠী। এই গোষ্ঠী প্রথমে ১৯৯৮ সালের ২৯ মার্চ জাতিসংঘের মহাসচিব কফি আনানের কাছে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ নামে একটি দিবস ঘোষণার প্রস্তাব উপস্থাপন করে। সেখানে তারা বলেন, বাঙালিরা তাদের মাতৃভাষাকে রক্ষার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সেটা ছিল তাদের ভাষার অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। কাজেই মাতৃভাষা দিবসের দাবিটি খুবই ন্যায়সংগত।
মাতৃভাষা-প্রেমিকগোষ্ঠীর এই চিঠিতে স্বাক্ষর করেছিলেন সাত জাতি ও সাত ভাষার ১০ জন সদস্য। জাতিসংঘ মহাসচিবের অফিস থেকে এই পত্রপ্রেরকদের জানিয়ে দেওয়া হয়; বিষয়টির জন্য নিউইয়র্কে নয়, যোগাযোগ করতে হবে প্যারিসে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংগঠন ইউনেসকোর সঙ্গে।
এরপর প্রায় এক বছর পেরিয়ে যায়। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি ইউনেসকো। কানাডাপ্রবাসী বাঙালি আবদুস সালাম ও রফিকুল ইসলাম (যাঁরা মাতৃভাষা-প্রেমিকগোষ্ঠীর সদস্য) এ বিষয়ে ইউনেসকোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করেন। প্রথমে টেলিফোনে এবং পরে চিঠিতে। ১৯৯৯ সালের ৩ মার্চ ইউনেসকো সদর দপ্তরের ভাষা বিভাগের কর্মকর্তা আন্না মারিয়া একটি চিঠিতে রফিকুল ইসলামকে জানান, ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণার তোমাদের অনুরোধটি বেশ আকর্ষণীয় মনে হয়েছে।
কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার একজন কর্মকর্তার কাছে এই প্রথম বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়। আন্না মারিয়া আরও জানান, বিষয়টি ব্যক্তিগতভাবে উত্থাপনের কোনো সুযোগ নেই, ইউনেসকোর পরিচালনা পর্ষদের কোনো সদস্য রাষ্ট্রের মাধ্যমে সভায় এটি তুলে ধরা হবে।
রফিকুল ইসলামকে ইউনেসকো পরিচালনা পর্ষদের কয়েকটি সদস্য দেশের ঠিকানাও পাঠিয়ে দেন মারিয়া। এতে বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, কানাডা, ফিনল্যান্ড ও হাঙ্গেরির নাম ছিল। ইউনেসকো সাধারণ পরিষদে বিষয়টি আলোচ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করতে হলে কয়েকটি সদস্য দেশের পক্ষে প্রস্তাব পেশ করা জরুরি। তখন হাতে সময় ছিল খুবই কম। কেননা, অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই সাধারণ পরিষদের সভা বসবে।
কানাডা থেকে রফিকুল ইসলাম বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। বিষয়টি রাষ্ট্রের জন্য গর্বের বিষয় মনে করে মন্ত্রণালয় অতি দ্রুত প্রধানমন্ত্রীর অফিসে অনুমতি চেয়ে নোট পাঠায়। বাংলাদেশ সরকারের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সময়স্বল্পতার বিষয়টি উপলব্ধি করেন। তিনি সব ধরনের জটিলতা উপেক্ষা করে নথি অনুমোদনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ছাড়াই ইউনেসকোর সদর দপ্তরে সরাসরি প্রস্তাবটি পাঠিয়ে দেন। ৯ সেপ্টেম্বর ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ জাতীয় ইউনেসকো কমিশনের পক্ষে এর সচিব অধ্যাপক কফিলউদ্দিন আহমদের স্বাক্ষরিত সেই প্রস্তাবটি প্যারিসে পৌঁছায়।
তখন ইউনেসকোর নির্বাহী পরিষদের ১৫৭তম অধিবেশন এবং ৩০তম সাধারণ সম্মেলন ছিল। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনের বিষয়টি নিয়ে ইউনেসকোতে দুটি সমস্যা দেখা দেয়। প্রথমত, ইউনেসকো ভেবেছিল, এমন একটা দিবস পালন করতে গেলে বড় অঙ্কের টাকাপয়সা প্রয়োজন হবে। খরচের কথা ভেবে প্রথমেই প্রস্তাবটি বাতিল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। একই সঙ্গে ইউনেসকো মহাপরিচালক International Mother Language Day নয়, International Mother Tongue Day নামে একে পরিচিত করতে চান। মহাপরিচালক এ জন্য এক লাখ ডলারের ব্যয় বরাদ্দের প্রস্তাব করেন এবং দুই বছর পর নির্বাহী পরিষদের ১৬০তম অধিবেশনে একটি সম্ভাব্যতা জরিপের মাধ্যমে বিষয়টি তুলে ধরার আদেশ দেন।

