আগামীর সময়

শেষ সময়ে কৃষি খাতের অর্জন তুলে ধরলেন ফরিদা আখতার

শেষ সময়ে কৃষি খাতের অর্জন তুলে ধরলেন ফরিদা আখতার

ফাইল ছবি

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেছেন, স্বল্প সময়ের মধ্যেই টেকসই উৎপাদন, সম্পদ সংরক্ষণ, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং প্রান্তিক খামারিদের স্বার্থরক্ষায় একাধিক আইন, অধ্যাদেশ ও নীতিমালা প্রণয়ন বা সংশোধন করা হয়েছে।

আজ মঙ্গলবার অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে গৃহীত কার্যক্রম ও অর্জন তুলে ধরতে মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন তিনি।

উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, মৎস্য খাতে মৎস্য সুরক্ষা ও সংরক্ষণ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ ও ২০২৬ জারির মাধ্যমে মৎস্য অভয়াশ্রম ঘোষণা, ইলেক্ট্রোফিশিং নিষিদ্ধকরণ এবং অন্যান্য এলাকা-ভিত্তিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা (OECM) আইনগত স্বীকৃতি পেয়েছে। এছাড়া জাতীয় মৎস্য নীতিমালা, ২০২৬, জাতীয় মৎস্য পদক নীতিমালা, ২০২৬, মৎস্য খাদ্য বিধিমালা, ২০২৪, মৎস্য সঙ্গনিরোধ বিধিমালা, ২০২৪ এবং মৎস্য পরিদর্শন ও মাননিয়ন্ত্রণ বিধিমালা, ২০২৫ প্রণয়ন করা হয়েছে। সামুদ্রিক জলসীমায় ৬৫ দিনের পরিবর্তে ৫৮ দিনের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং গভীর সমুদ্র ব্যতীত বাণিজ্যিক ট্রলারে SONAR ব্যবহার দুই বছরের জন্য স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

মৎস্য উপদেষ্টা বলেন, প্রাণিসম্পদ খাতে জাতীয় পোল্ট্রি উন্নয়ন নীতিমালা, ২০২৬, প্রাণী ও প্রাণিজাত পণ্য সঙ্গনিরোধ অধ্যাদেশ, ২০২৬, জাতীয় প্রাণিসম্পদ বীমা নীতিমালা, ২০২৬, জাতীয় কৃত্রিম প্রজনন নীতিমালা, ২০২৬ (খসড়া) এবং ভেটেরিনারি ঔষধ অধ্যাদেশ, ২০২৬ (খসড়া) প্রণয়ন করা হয়েছে।

ফরিদা আখতার বলেন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে উৎপাদন ব্যয় কমাতে খামারিদের বিদ্যুৎ বিলে ২০ শতাংশ রিবেট সুবিধা এবং এ খাতে ১০০ কোটি টাকা ভর্তুকি প্রদানের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা উৎপাদন ব্যয় হ্রাস ও বাজারে মূল্য স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হবে।

তিনি বলেন, জেলেদের সামাজিক সুরক্ষা ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় নিবন্ধিত উপকারভোগী জেলের সংখ্যা ১৩,২৬,৪৮৬ থেকে বৃদ্ধি করে ১৫ লাখে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রথমবারের মতো সুন্দরবন ও হাওর এলাকার জেলেরা নিষেধাজ্ঞা সময়ে ভিজিএফ সুবিধার আওতায় আসছেন।

তিনি আরও বলেন, ইলিশের প্রজনন ও সংরক্ষণে পদ্মা-মেঘনা অববাহিকায় ৬টি অভয়াশ্রম এবং বঙ্গোপসাগরে ৭,০০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা প্রজনন ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত রয়েছে। প্রজনন মৌসুমে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা ও সমুদ্রে ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় মাছ সংরক্ষণে দেশে ৬৬৯টি অভয়াশ্রম পরিচালিত হচ্ছে। কাপ্তাই হ্রদে মৎস্য সম্পদের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে ৭টি অভয়াশ্রম রয়েছে।

প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা বলেন, হালদা নদীকে মৎস্য হেরিটেজ ঘোষণা করে ৫ নভেম্বর ২০২৫ গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। নদীর প্রজনন ক্ষেত্র ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ১৬টি শর্ত আরোপ করা হয়েছে। ২০২৫ সালে হালদা থেকে প্রায় ১৪ হাজার কেজি ডিম সংগ্রহ করা হয়েছে। হালদা থেকে জাতীয় অর্থনীতিতে ৮০০ কোটি টাকার অধিক অবদান রাখছে।

উপদেষ্টা বলেন, পিপিআর নির্মূলে ৩ কোটি ৬১ লক্ষাধিক ডোজ টিকা প্রদান করা হয়েছে। ক্ষুরারোগ (FMD) নিয়ন্ত্রণে প্রায় ৪৬ লক্ষ এর অধিক ডোজ টিকা প্রয়োগ করা হয়েছে। হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশুর ১৭টি রোগের বিরুদ্ধে ৩ কোটি ৬ লক্ষ ৬২ হাজার ৪ শত ৬২ ডোজ গবাদিপশুর টিকা এবং ৫৩ কোটি ৯৫ লক্ষ ৩৯ হাজার ৬ শত ডোজ হাঁস-মুরগির টিকা উৎপাদন করা হয়েছে। তিনি বলেন, এন্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্টেন্স (AMR) প্রতিরোধে স্টুয়ার্ডশিপ গাইডলাইন প্রণয়ন, স্ট্যান্ডার্ড ট্রিটমেন্ট গাইডলাইন চালু এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা জোরদার করার লক্ষ্যে জুনোটিক রোগ নির্ণয় ও নজরদারি কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য একটি বিশেষায়িত ভেটেরিনারি পাবলিক হেলথ ল্যাবরেটরি স্থাপন করা হয়েছে।

প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা বলেন, রমজানে সুলভ মূল্যে বিক্রয় রমজান মাসে ২৬ দিন ভ্রাম্যমাণ বিক্রয়কেন্দ্রের মাধ্যমে ড্রেসড ব্রয়লার (২৪৫ টাকা/কেজি), দুধ (৮০ টাকা/লিটার), ডিম (৮ টাকা/পিস) এবং গরুর মাংস (৬৫০ টাকা/কেজি) বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এছাড়া স্থানীয় উদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সঙ্গে সমন্বয় করে ভ্রাম্যমাণ বিক্রয়ের জন্য স্থায়ী স্থান নির্ধারণের মাধ্যমে বিক্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হবে।

ফরিদা আখতার বলেন, ২০২৫ সালে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত COP30 সম্মেলনে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় প্রথমবারের মতো অংশগ্রহণ করে। এতদিন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সাধারণভাবে খরা, বন্যা, বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা ইত্যাদির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল কিন্তু এখন তার সীমা অনেকদূর ছড়িয়ে গেছে। বিশেষ করে প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য সম্পদের ওপর তীব্র প্রভাব দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। তিনি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের ওপর ঝুঁকি মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।

উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান, প্রাণিজ আমিষের যোগান এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বড় ভূমিকা রাখার পরও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত ‘কৃষির উপখাত’ হিসেবে চিহ্নিত থাকায় নীতি ও পরিকল্পনায় যথাযথ গুরুত্ব পায়নি এবং বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এ কারণে প্রধান উপদেষ্টা এবং পরিকল্পনা কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নিকট এ খাতকে পূর্ণাঙ্গ খাতের মর্যাদা ও প্রাপ্য সুবিধা প্রদানের প্রস্তাব প্রেরণ করা হয়েছে।


    শেয়ার করুন: