আগামীর সময়

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে এবার ‘দুর্বল’ বলে কটাক্ষ ট্রাম্পের

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে এবার ‘দুর্বল’ বলে কটাক্ষ ট্রাম্পের

সংগৃহীত ছবি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারকে এবার ‘দুর্বল’ বলে কটাক্ষ করেছেন। একই সঙ্গে ব্রিটেনের নৌবাহিনী নিয়েও নতুন করে বিদ্রূপ করেছেন তিনি। এমন সময় এ মন্তব্য এল, যখন ইরান যুদ্ধের মধ্যে বন্ধ হয়ে যাওয়া হরমুজ প্রণালী খুলতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় নেতৃত্ব দিচ্ছে যুক্তরাজ্য।

হোয়াইট হাউসে ইস্টার উপলক্ষে এক ব্যক্তিগত মধ্যাহ্নভোজের ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ্যে আসার পর বিষয়টি সামনে আসে। সেখানে স্টারমারকে অনুকরণ করে ট্রাম্প বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাজ্য তাদের বিমানবাহী রণতরী পাঠাবে কি না, সে সিদ্ধান্ত নিতে প্রধানমন্ত্রী স্টারমারকে নাকি তার দলের সঙ্গে পরামর্শ করতে হয়৷

বুধবারের ওই মধ্যাহ্নভোজে ট্রাম্প বলেন, ‘আসলে দুই সপ্তাহের মধ্যে রাজা (কিং চার্ল এখানে আসছেন, তিনি ভালো মানুষ।
আমি বললাম, আপনাদের দুটি পুরোনো, ভাঙাচোরা বিমানবাহী রণতরী আছে, সেগুলো কি পাঠাতে পারেন?’

এরপর স্টারমারকে অনুকরণ করে ট্রাম্প বলছেন, ‘ওহহ, আমাকে আমার টিমকে জিজ্ঞেস করতে হবে। আমি বললাম, ‘আপনি তো প্রধানমন্ত্রী, আপনার তো তা করতে হবে না।’ না, না, না, আমাকে আমার টিমকে জিজ্ঞেস করতেই হবে। আমার টিমকে নিয়ে বসতে হবে, আমরা আগামী সপ্তাহে বৈঠক করছি।’

তিনি যোগ করেন, ‘কিন্তু যুদ্ধ তো ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। আগামী সপ্তাহে তো যুদ্ধ তিন দিনের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে।’

এই মন্তব্যকে যুক্তরাজ্য-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের নতুন এক নিম্নগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে সূত্র বলেছে, ট্রাম্প কখনোই ব্রিটেনের কাছে ওই রণতরীগুলো চাননি এবং যুক্তরাজ্যও তা পাঠানোর কোনো প্রস্তাব দেয়নি।

ভিডিওটি প্রথমে হোয়াইট হাউসের একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম চ্যানেলে প্রকাশ করা হয়েছিল, পরে তা সরিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ওয়েবসাইট বিজনেস ইনসাইডার-এর এক রাজনৈতিক প্রতিবেদক সেটি ডাউনলোড করে আবার প্রকাশ করেন।

ব্রিটেনের বিমানবাহী রণতরী নিয়ে ট্রাম্পের বিদ্রূপ নতুন নয়। এর আগে তিনি সেগুলোকে ‘খেলনা’ বলে উড়িয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘ওগুলো তেমন ভালো নয়।’

এ সপ্তাহের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও যুদ্ধরত অঞ্চলে যুদ্ধজাহাজ না পাঠানোয় যুক্তরাজ্যের সমালোচনা করেন।

তিনি বলেছেন, ‘আমার যতদূর মনে পড়ে, এখানে তো একটা বড়, শক্তিশালী রয়্যাল নেভি থাকার কথা ছিল, যারা এ ধরনের কাজের জন্য প্রস্তুত থাকবে।’

ব্রিটিশ সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান হিসেবে রাজা তৃতীয় চার্লসের এ মাসের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে। আমেরিকার স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে এ রাষ্ট্রীয় সফর হওয়ার কথা।

ইরানের সঙ্গে সংঘাতে সরাসরি জড়াতে অস্বীকৃতি জানানোয় ট্রাম্প বারবার যুক্তরাজ্যের সমালোচনা করেছেন। ইরানে প্রথম দফার হামলার সময় ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি না দেওয়া এবং চাগোস দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব মরিশাসের কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েও তিনি ব্রিটেনকে আক্রমণ করেছেন।

একই মধ্যাহ্নভোজে ট্রাম্প ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাখোঁকেও বিদ্রূপ করেন। তিনি বলেছেন, ম্যাখোঁ এখনো ‘চোয়ালে ঘুষি খাওয়ার ধাক্কা সামলে উঠছেন’ এবং তার স্ত্রী ব্রিজিত ম্যাখোঁ নাকি তাকে ‘খুব খারাপভাবে ব্যবহার করেন’।

এদিকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলা চলতে থাকায় তেহরান হরমুজ প্রণালীতে নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করেছে। বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস সরবরাহের বড় একটি অংশ এই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ দিয়ে যায়। এতে বিশ্ববাজারে তেল-গ্যাসের দাম বেড়ে গেছে।

এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র যেহেতু বলেছে, এ পথ পুনরায় চালু করা অন্যদের দায়িত্ব, তাই ফ্রান্স, জার্মানি এবং কয়েকটি উপসাগরীয় দেশকে নিয়ে যুক্তরাজ্যের কূটনৈতিক উদ্যোগ সামনে এসেছে।

বৃহস্পতিবার ৪০টির বেশি দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার। তিনি ইঙ্গিত দেন, হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে না দিলে ইরানের বিরুদ্ধে আরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হতে পারে।

ভার্চ্যুয়াল বৈঠকের পর এক বিবৃতিতে কুপার বলেছেন, ‘হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ায় বৈশ্বিক সমৃদ্ধির ওপর সরাসরি হুমকি তৈরি হয়েছে। ইরান হরমুজ প্রণালীতে গোটা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে জিম্মি করে রাখতে চাইছে। তারা সফল হতে পারে না। সে লক্ষ্যেই আজ অংশীদার দেশগুলো প্রণালীটি অবিলম্বে ও নিঃশর্তভাবে খুলে দেওয়ার এবং নৌ চলাচলের স্বাধীনতা ও সমুদ্র আইনের মৌলিক নীতিগুলো মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে।’

পরে সম্প্রচারমাধ্যমকে কুপার বলেছেন, ‘শুরু থেকেই আমরা যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ভিন্ন অবস্থান নিয়েছি এবং মধ্যপ্রাচ্যে আক্রমণাত্মক অভিযানে আমরা জড়াইনি। কারণ, উত্তেজনা আরও বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি, এর প্রভাব, বিশেষ করে অর্থনীতির ওপর প্রভাব, এবং একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আমাদের বাস্তব উদ্বেগ ছিল।’

তিনি আরও জানান, আগামী মঙ্গলবার সামরিক পরিকল্পনাবিদদের আরেকটি বৈঠকে দীর্ঘমেয়াদে ‘নৌ চলাচল কীভাবে নিরাপদ রাখা যায়’, তা নিয়ে আলোচনা হবে। এর মধ্যে তেহরান সম্ভবত সমুদ্রপথে যে মাইন পেতে রেখেছে, সেগুলো অপসারণের বিষয়টিও থাকবে।

এদিকে ট্রাম্পের কটাক্ষের সরাসরি জবাব না দিয়ে স্টারমার বলেছেন, তিনি শুধু জাতীয় স্বার্থের দিকেই মনোযোগী থাকবেন।

পার্লামেন্টের লিয়াজোঁ কমিটিতে ট্রাম্পের ‘বেশ রূঢ়’ মন্তব্য নিয়ে প্রশ্ন করা হলে স্টারমার জানান, ‘আমার দেশের সর্বোত্তম স্বার্থে কী আছে, আমি সম্পূর্ণভাবে সেদিকেই মনোযোগী এবং এ জন্য আমি একটুও দুঃখিত নই। বাইরের যেখান থেকেই চাপ আসুক না কেন, আমি ব্রিটিশ জাতীয় স্বার্থের দিকেই একদম নিবিড়ভাবে মনোযোগ ধরে রাখব।’

তিনি উল্লেখ করেন, ‘আমি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এবং আমার দায়িত্ব হচ্ছে ব্রিটিশ জাতীয় স্বার্থে সম্পূর্ণ মনোযোগী থাকা। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে এই নীতিই আমাকে কাজে দিয়েছে এবং সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়ও আমি এই নীতিই অনুসরণ করে যাব।’

অন্যদিকে ট্রাম্প পরে ইরানকে আরও হামলার হুমকিও দিয়েছেন, যদি দেশটির নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রের দাবিতে সাড়া না দেয়।

    শেয়ার করুন: