সংরক্ষিত আসনের এমপিরা কী করেন, নির্বাচিতদের সঙ্গে পার্থক্য কী?

ফাইল ছবি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনের জন্য দলীয় প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করেছে সরকারি দল বিএনপিসহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলো। এ নির্বাচনে আনুপাতিক হারে সর্বোচ্চ ৩৬টি সংরক্ষিত নারী আসন পেয়েছে বিএনপি। অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল জামায়াত পেয়েছে ১২টি এবং এনসিপি ও স্বতন্ত্র পেয়েছে একটি করে আসন।
আজ সোমবার দুপুরে রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ৩৬ প্রার্থীর তালিকা প্রকাশ করেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী।
প্রকাশিত তালিকায় রয়েছেন সেলিমা রহমান, শিরীন সুলতানা, রাশেদা বেগম হীরা, রেহানা আক্তার রানু, নেওয়াজ হালিমা আরলী, মোসা. ফরিদা ইয়াসমিন, বিলকিস ইসলাম, সাকিলা ফারজানা, হেলেন জেরিন খান, নিলোফার চৌধুরী মনি, নিপুণ রায় চৌধুরী, জীবা আমিনা খান, মাহমুদা হাবিবা, মোছা. সাবিরা সুলতানা, সানসিলা জেবরিন, সানজিদা ইসলাম তুলি, সুলতানা আহমেদ, ফাহমিদা হক, আন্না মিনজ, সুবর্ণা সিকদার (ঠাকুর), শামীম আরা বেগম স্বপ্না, মোসাম্মৎ শাম্মী আক্তার, ফেরদৌসী আহমেদ, বীথিকা বিনতে হোসাইন, মোছা. সুরাইয়া জেরিন, মানসুরা আক্তার, জহরত আদিব চৌধুরী, মমতাজ আলো, ফাহিমা নাসরিন, আরিফা সুলতানা, মোছা. সানজিদা ইয়াসমিন, নাদিয়া পাঠান পাপন, শওকত আরা আক্তার, মাধবী মার্মা, সেলিনা সুলতানা এবং রেজেকা সুলতানা।
একইদিন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে দলটির ১২ প্রার্থীর তালিকা প্রকাশ করা হয়। তবে, ওই তালিকায় জামায়াতের দলীয় প্রার্থীদের সঙ্গে রয়েছে ১১ জোটের অন্য দলগুলোর প্রার্থীদের নামও।
জামায়াত জোটের প্রার্থী তালিকায় রয়েছেন নূরুন্নিসা সিদ্দীকা, মারজিয়া বেগম, সাবিকুন নাহার মুন্নি, মারদিয়া মমতাজ, নাজমুন নাহার নীলু, মাহফুজা সিদ্দিকা, সাজেদা সামাদ, সামসুন নাহার, মনিরা শারমিন, মাহমুদা আলম মিতু, তাসমিয়া প্রধান, মাহবুবা হাকিম ও রোকেয়া বেগম।
কীভাবে নির্বাচিত হন সংরক্ষিত আসনের এমপিরা
সংসদের সংরক্ষিত ৫০টি নারী আসনে দলগুলো থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয় নির্দিষ্টসংখ্যক নারী প্রার্থীকে। মূলত সংসদে দলগুলোর কতজন করে প্রতিনিধি রয়েছেন, তার অনুপাতে নির্ধারণ করা হয় এই সংখ্যা। সেই হিসাবে একটি রাজনৈতিক দলের ছয়জন নির্বাচিত সংসদ সদস্য থাকলে ওই দল থেকে একজন প্রার্থী হবেন সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য।
এভাবে যে কয়টি দলের সংসদে ছয়ের বেশি নির্বাচিত সদস্য থাকবেন, সেই দলগুলো থেকে একাধিক নারী প্রার্থী সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। সেই দলের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের ভোটে বিজয়ী হয়ে সংরক্ষিত আসনের সদস্য নির্বাচিত হতে পারবেন নারী প্রার্থীরা।
সেই সমীকরণ অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রতিনিধি থাকবেন ৩৬ জন, জামায়াতের ১২ জন, এনসিপির একজন এবং স্বতন্ত্র একজন।
কিন্তু যখন সারা দেশের ৩০০টি নির্বাচনী আসন থেকে সাধারণ মানুষের ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা সংসদে থাকছেন, তখন এই সংরক্ষিত নারী আসনের প্রয়োজনীয়তা এবং গুরুত্ব আসলে কতটা
নির্বাচিত ও সংরক্ষিত এমপিদের মধ্যে পার্থক্য কী?
সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক একটি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় খুব একটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হন না সংরক্ষিত নারী আসনের এমপিরা। রাজনৈতিক বিবেচনায় বা রাজনৈতিক পরিবার থেকেই সাধারণত নির্বাচিত হন সংরক্ষিত নারী আসনের এমপিরা। কাজেই রাষ্ট্র পরিচালনায় বা সংসদের কার্যক্রমে অবদান রাখতে পারবেন— এ রকম বিবেচনায় সাধারণত সংরক্ষিত নারী আসনে এমপি নির্বাচন করে না দলগুলো।’
তবে সংরক্ষিত আসনের এমপিদের কার্যপরিধির ব্যাপ্তি বা দায়িত্বের বিষয়ে বাংলাদেশের সংবিধানে আলাদাভাবে উল্লেখ নেই বলে জানিয়েছেন তিনি। তার ভাষায়, ‘সংবিধানে শুধু বলা আছে সংরক্ষিত আসন থাকতে হবে, বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তন করা হয়েছে সেটির সংখ্যা। তবে সংরক্ষিত আসনের এমপিদের বিষয়ে আলাদা করে কিছু বলা নেই সংবিধানে। তবে, নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মতোই সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন সংরক্ষিত আসনের সদস্যরা।’
তবে সংরক্ষিত আসনের সাবেক এক সংসদ সদস্য জানিয়েছেন, অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মতো পেলেও সংরক্ষিত আসনে বরাদ্দ কম দেওয়া হয়ে থাকে। ‘সংসদে আইনপ্রণেতা হিসেবে একজন নির্বাচিত এমপির সমান অধিকার থাকে একজন সংরক্ষিত আসনের এমপির। সংরক্ষিত আসনের এমপিকে কয়েকটি এলাকার উন্নয়ন কাজের দায়িত্ব দেন সংসদ নেতা। একটি নির্বাচনী আসনে জনগণের ভোটে বিজয়ী এমপির পাশাপাশি ওই এলাকার বিভিন্ন ইস্যু সংসদে উপস্থাপন করার অধিকার রাখেন সংরক্ষিত আসনের এমপিরাও,’ বলেছেন তিনি।
সংরক্ষিত আসন কেন?
পুরো দেশে নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমার ভিত্তিতে ভাগ করা ৩০০টি আসনের প্রতিটিতে জনগণের ভোটে নির্বাচিত এমপি থাকার পরও সংরক্ষিত আসনের তাৎপর্য কী? আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেছেন, ১৯৭২ সালে যখন এই আইনটি তৈরি করা হয়, তখনকার প্রেক্ষাপটে তা ছিল যুক্তিসংগত ও সময়োপযোগী।
নারীর ক্ষমতায়ন ও রাষ্ট্র পরিচালনায় নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সে সময় এই আইন তৈরি করা হয়েছিল জানিয়ে তিনি বলেছেন, ‘সে সময় নারীরা তুলনামূলকভাবে ঘর থেকে কম বের হতেন এবং নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন, তেমন সামাজিক প্রেক্ষাপট ছিল না।’
কিন্তু বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে এই সংরক্ষিত আসন অনেকটাই অকার্যকর বলে মনে করেন তিনি। ‘সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি যেই এলাকার দায়িত্বে থাকেন, সেই এলাকায় তো জনগণের ভোটে নির্বাচিত একজন এমপি থাকেন। কাজেই তাদের (সংরক্ষিত আসনের এমপি) ভূমিকা সাধারণত থাকে গৌণ,’ যোগ করেন তিনি।
তার মতে, সংরক্ষিত আসনের এমপি হিসেবে কাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে, তা রাজনৈতিক বিবেচনায় নির্ধারণ না করে মেধাভিত্তিক বা অভিজ্ঞতাভিত্তিক বিবেচনায় নির্ধারণ করলে সংসদে অবদান রাখতে সক্ষম হবেন সংরক্ষিত আসনের নারী প্রার্থীরা। আইনজীবী বা উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন যিনি বা রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞানের মতো বিষয়ের অধ্যাপক হিসেবে যে নারী দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন— এমন কোনো নারী সংরক্ষিত আসনে এমপি হলে সংসদীয় বিতর্কে রাখতে পারবেন কার্যকর ভূমিকা। কিন্তু বাংলাদেশে সাধারণত সে রকম বিবেচনা করে সংরক্ষিত আসনের সাংসদ মনোনয়ন দেওয়া হয় না।



