১৪ লাখ ড্রাইভিং লাইসেন্স ঝুলিয়ে গেছে ইউনূস সরকার, ইতিহাসের সর্বোচ্চ জটের অপেক্ষা

সংগৃহীত ছবি
গত বছরের আগস্ট থেকে ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাপতে পারছে না বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। মূলত ঠিকাদার না থাকায় লাইসেন্স প্রিন্ট করার কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। নতুন করে কবে থেকে লাইসেন্স প্রিন্ট করা শুরু হবে তা-ও জানে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। বিদায়ী ঠিকাদারের মেয়াদ শেষ হলেও নতুন ঠিকাদার নিয়োগ দিতে ব্যর্থ হয়েছে গত অন্তর্বর্তী সরকার। তাই এমন জট তৈরি হয়েছে।
জমা লাইসেন্সের সংখ্যা এখন প্রায় ১৪ লাখে গিয়ে ঠেকেছে। গত ২২ জানুয়ারি এই সংখ্যা ছিল ১২ লাখ ৪৪ হাজার ৫৬৩। ছাপা না হলেও লাইসেন্স পাওয়ার আবেদন ও পরীক্ষা কার্যক্রম থেমে নেই। আবেদনে ছাপার অপেক্ষায় আটকে থাকা ড্রাইভিং লাইসেন্সের সংখ্যা তাই দিন দিন আরও বাড়ছে। এর আগে সর্ব্বোচ সাড়ে ১৪ লাখ লাইসেন্সের জট তৈরি হয়েছিল। এখন ইতিহাসের সর্ব্বোচ জট তৈরি হওয়া শুধুই সময়ের অপেক্ষা।
গত বছরের ২৮ জুলাই সর্বশেষ ঠিকাদারের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়। তখন সাত লাখ ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রিন্টের জন্য জমা ছিল। সংশ্লিষ্টদের মতে, তিন থেকে চার লাখ লাইসেন্স প্রিন্টের অপেক্ষায় থাকাকে স্বাভাবিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
৫০ লাখ কার্ড ছাপানোর জন্য সরকার থেকে যে টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল তার থেকে অন্তত তিনগুণ বেশি দর দরপত্রে জমা পড়ে। তাই কোনো ঠিকাদারকে কাজ দিতে পারেনি বিআরটিএ। প্রথমে লাইসেন্স ছাপানোর জন্য ঠিকাদার না পেয়ে গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়। সেই সময়ও শেষ হয়েছে। এখন দরপত্র মূল্যায়ন পর্যায়ে রয়েছে। এই দরপত্রের মাধ্যমে ঠিকাদার নিয়োগ করা যাবে কিনা- তা নিয়েও সংশয় দেখা দিয়েছে।
বিআরটিএর ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার কার্যক্রম পরিচালনা করা হয় প্রকৌশল শাখা থেকে। এই বিভাগের প্রধান (পরিচালক) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ ‘লাইসেন্সের জট তৈরি হয়েছে’ এমনটি মানতে রাজি না। তার মতে, ই-লাইসেন্স দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে কোনো লাইসেন্স জমা নেই।
এক প্রশ্নের জবাবে মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি প্রজ্ঞাপন জারি করেছেন ই-লাইসেন্স গ্রহণযোগ্য। সেটি দিয়ে তো চলা যাচ্ছে। এমন না যে পুলিশ সেটা মানছে না। তাহলে ছাপা লাইসেন্সের দরকারটা কী! তাই আমি বলবো কোনো লাইসেন্স আটকা নেই। সব দিয়ে দেওয়া হয়েছে।’
এবার লাইসেন্সের ছাপা কেন বন্ধ হলো?
সদ্য বিদায়ী ভারতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্সের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে সরকার ঠিকাদার নিয়োগ কার্যক্রম শুরু করেনি। ঠিকাদার নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বাভাবিকভাবে শেষ হতে ৪-৬ মাস সময় লাগে। অর্থাৎ এই সময়টি লাইসেন্স প্রিন্টের কাজ বন্ধ থাকতো- সরকার এটি জানতো।
তবুও কেন ঠিকার নিয়োগ কার্যক্রম শুরু করা হয়নি- এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে তৎকালীন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় দায়িত্বে থাকা প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী শেখ মইনউদ্দিন। তিনি বলেন, ‘একটা কোম্পানি থাকতে আরেকটা কোম্পানি নেওয়ার বিজ্ঞপ্তি দিলে চলমান কোম্পানির কাজের গতি কমে যেত। আমরা চেয়েছিলাম তাদের কাজগুলো সময়ের মধ্যে গুছিয়ে নিতে। কোনো ধরনের ঝুঁকি নিতে চাইনি। তাদের ধারণা ছিল যেহেতু কাজ বাকি আছে এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি মেয়াদ বাড়ানো হবে। আবার তারাও তো নতুন দরপত্রে অংশ নিতে পারে। এসব বিবেচনায় বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়নি।’
যদিও মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্সকে যখন নিয়োগ দেওয়া হয়। তখন অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের কাজ চলমান ছিল।
নাম প্রকাশ না করা শর্তে আসল কারণ জানিয়েছেন বিআরটিএর সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা। তিনি বলছেন, একটি উন্নত মানের কার্ডের দাম ৮০-৯০ টাকা। তাতে চিপ বসাতে আরও ২৫-৩০ টাকা খরচ আছে। তারপর ছাপা খরচ। মেশিন ও জনবলের খরচ রয়েছে। সব মিলিয়ে লাইসেন্সের একটি কার্ড ছাপাতে অন্তত ২৮০-৩০০ টাকা খরচ হয়। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার চাচ্ছিল ১৫০ টাকার মধ্যে কার্ড ছাপাতে। তাই কোনো প্রতিষ্ঠান এই কাজ করতে রাজি হয়নি।
পুরোনো জট কবে, কেন, কীভাবে শুরু হলো?
২০১৯ সালে একবার ড্রাইভিং লাইসেন্সের লম্বা জট তৈরি হয়। ২০২১ সাল পর্যন্ত ছাপার অপেক্ষায় লাইসেন্সের আবেদন জমা পড়েছে প্রায় ১৪ লাখ। তখন প্রাথমিক চাপ সামাল দিতে সেনাবাহিনী পরিচালিত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। সদ্য বিদায়ী ঠিকাদার মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্স কাজে যুক্ত হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটি নতুন জমা পড়া আবেদন নিয়ে কাজ করা শুরু করে। আর পুরোনো জট সামাল দেয় সেনাবাহিনী। এবারও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকে কাজে লাগানোর আলোচনা উঠেছিল। কিন্তু সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সেই প্রস্তাবে জারি হয়নি।
পরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি এবার ঠিকাদারি কাজ পেতে দরপত্রে অংশ নিয়েছে। তাই তখন সরাসরি প্রতিষ্ঠানটিকে সরকার দায়িত্ব দিতে পারেনি।
এদিকে ২০১৬ সালের আরেক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান টাইগার আইটির সঙ্গে পাঁচ বছরের জন্য চুক্তি করে বিআরটিএ। এই পাঁচ বছরের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির ১৫ লাখ লাইসেন্স প্রিন্ট দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু ২০১৮ সালে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের কারণে ড্রাইভিং লাইসেন্স করার চাপ বেড়ে যায়। ফলে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যেই টাইগার আইটিকে ১৪ লাখ লাইসেন্স প্রিন্ট করতে হয়। এরপর কার্ডসংকটের কারণেই মূলত লাইসেন্সের জট লাগা শুরু হয়।
টাইগার আইটির সঙ্গে চুক্তি শেষ হওয়ার আগেই ২০২০ সালের ২৯ জুলাই নতুন করে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্সের সঙ্গে চুক্তি করে বিআরটিএ। এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পাঁচ বছরে ৪০ লাখ লাইসেন্স দেওয়ার চুক্তি করা হয়। কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী, মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্সও কাজ করতে পারেনি। তবে তাদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে সরকার ঠিকাদার নিয়োগের নতুন বিজ্ঞপ্তি দেয়নি।

