সড়কে ৭ দিনে ২০৪ মৃত্যু, সরকারি-বেসরকারি তথ্যে বড় ফারাক

সংগৃহীত ছবি
পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটি কেন্দ্র করে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির চিত্র উদ্বেগজনক আকার ধারণ করেছে। এ নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার পরিসংখ্যানের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা গেছে, যা তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) জানিয়েছে, ঈদের সাত দিনের ছুটি (১৭-২৩ মার্চ) সময়ে সারাদেশে ৯২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১০০ জন নিহত এবং ২১৭ জন আহত হয়েছেন।
তবে বেসরকারি সংস্থা রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, একই সময়ে ২৬৮টি দুর্ঘটনায় অন্তত ২০৪ জন নিহত এবং ছয় শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। দুই সংস্থার তথ্যের এই বড় পার্থক্য দুর্ঘটনার প্রকৃত চিত্র নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি হিসাবের বাইরে অনেক দুর্ঘটনা থেকে যাচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার রেলক্রসিংয়ে সংঘটিত ভয়াবহ বাস দুর্ঘটনায় ১২ জন নিহত হওয়ার ঘটনা সরকারি হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। বিআরটিএর ২১ মার্চের তালিকায় কুমিল্লার কোনো দুর্ঘটনার উল্লেখই নেই।
ঈদের ছুটিতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে দুর্ঘটনায় আহতদের চাপ ছিল চোখে পড়ার মতো। রাজধানীর জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (পঙ্গু হাসপাতাল) জানিয়েছে, ঈদের আগের রাত থেকে পরদিন বিকেল পর্যন্ত ১৫১ জন আহত রোগী চিকিৎসা নিতে এসেছেন। অন্যান্য হাসপাতালেও ছিল একই চিত্র।
চিকিৎসকদের মতে, আহতদের বড় একটি অংশ মোটরসাইকেল, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক দুর্ঘটনার শিকার। এতে সড়ক ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা জানান, ঈদযাত্রা সাধারণত ১৫ দিনের একটি সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ঈদের আগে সাত দিন, ঈদের দিন এবং পরের সাত দিন। গত বছর একই সময়ে ৩১৫টি দুর্ঘটনায় ৩২২ জন নিহত হন। আর ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল আরও বেশি ৩৭২টি দুর্ঘটনায় ৪১৬ জনের মৃত্যু, যা এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ।
এবারের ঈদযাত্রা শুরু হয় ১৭ মার্চ এবং ২৩ মার্চ পর্যন্ত সাত দিনের সরকারি ছুটি শেষ হলেও এখনো অনেক প্রতিষ্ঠানে ছুটি চলমান রয়েছে। ফলে সড়কে যানবাহনের চাপ পুরোপুরি কমেনি এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকিও এখনো রয়ে গেছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১৭ মার্চ ১২টি দুর্ঘটনায় ১৫ জন নিহত ও ১৫ জন আহত হন। ১৮ মার্চ ১৮টি দুর্ঘটনায় ১৩ জন নিহত ও ৬২ জন আহত হন। ১৯ মার্চ ১১টি দুর্ঘটনায় নিহত হন ৮ জন এবং আহত ৭ জন। ২০ মার্চ ছয়টি দুর্ঘটনায় ৮ জন নিহত ও ৩৬ জন আহত হন। ২১ মার্চ ১৭টি দুর্ঘটনায় ১৫ জন নিহত ও ২৫ জন আহত হন। ২২ মার্চ ১৯টি দুর্ঘটনায় সর্বোচ্চ ৩২ জন নিহত ও ৬০ জন আহত হন। আর ২৩ মার্চ ৯টি দুর্ঘটনায় ৯ জন নিহত ও ১২ জন আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেছেন, এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য প্রাথমিক। ছুটি শেষে পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহ করা হলে প্রাণহানির সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। তার আশঙ্কা, এবারের ঈদযাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর নতুন রেকর্ড তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেছেন, ঈদের পর কর্মস্থলে ফেরার সময় দুর্ঘটনা বাড়ার প্রবণতা থাকে। কারণ এ সময় সড়কে নজরদারি ও আইন প্রয়োগ তুলনামূলকভাবে কমে যায়।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর নজরদারি, আইন প্রয়োগ এবং সচেতনতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।

