আগামীর সময়

আঠারো মাসের ঝড়ের শেষে

নইলে অতীত হবে নূতন পুনরায়
আঠারো মাসের ঝড়ের শেষে

ফাইল ছবি

এভাবেও ফিরে আসা যায়! প্রায় নিশ্চিহ্নের মুখ থেকে অবিশ্বাস্য কামব্যাক করেছে বিএনপি। সরকার গঠনেরও দ্বারপ্রান্তে। যাদের ‘সহায়তায়’ এই তুফানবিজয়, সেই এনসিপির বিশ্লেষণ—এ কী হলো! পাঁচ আগস্টের মতো একটি আন্দোলনের ফসল তারা ঘরে তুলতে পারেনি।

২০২৪ সালের জুলাই থেকে যা ঘটেছে, তার রেশ কাটতে শুরু করেছে। পরিস্থিতি ছিল বিভীষিকাময়। মব সন্ত্রাসে অতিষ্ঠ। ধারাবাহিক সম্মানহানিতে নারীরা সব সময় শঙ্কিত। ঘর থেকে বের হয়ে সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে দিন গুজরান দায় হয়ে উঠেছিল।

মাঠে সেনানি থাকার পরও আইনশৃঙ্খলা ছিল গরম তেলে চোবানো বেগুনভাজার মতো। রাজনৈতিক সহিংসতা বেড়েছিল। রেকর্ড বুকে জায়গা করে নিয়েছে হামলা ও হত্যা। ছিনতাইয়ে অতিষ্ঠ হয়ে রাত জেগে পাহারায় সাধারণ মানুষ। ছোটখাটো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে বড় প্রতিষ্ঠানেও চাঁদাবাজি ও দখল চলেছে দেদার। সাইবার অপরাধও ছিল মাত্রাছাড়া।

ত্রুটিপূর্ণ গ্রেপ্তার আর ঝুঁকিপূর্ণ বিচারে ঘুরপাক খেতে হয়েছে। অথচ এখানে মানুষের প্রত্যাশা ছিল ব্যাপক। আওয়ামী লীগ আমলে শত শত নিহত, হাজার হাজার আহত হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের হাতেও। এফআইআরে যাদের নাম আছে, তারা অপরাধী হতে পারেন। তাদের গ্রেপ্তারও আইনসিদ্ধ। কিন্তু তদন্ত শুরুর আগেই অনেকে আটক হয়েছেন। আংশিক তদন্তের পরও পুলিশ আদালতকে জানায় না গ্রেপ্তার ব্যক্তির সঙ্গে অপরাধ সংশ্লিষ্টতার তথ্য।

ছোটখাটো নীতিগত সিদ্ধান্তেও ভুলের ছড়াছড়ি। খেলাধুলার বিশ্বপরিসরে ক্রিকেটই অন্ধের যষ্টি। সেখানেও তালগোল পাকিয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে নিষেধাজ্ঞার খড়গ নেমে আসবে। আর নীতিগত সিদ্ধান্তের মধ্যে বন্দরের টার্মিনাল লিজ হয়েছে সাধারণ মানুষকে অন্ধকারে রেখেই। বিমানবন্দর কিংবা সমুদ্রবন্দর—সবেতেই সংস্কার দরকার। কিন্তু সমুদ্রবন্দরই দেওয়া হলো। বিমানবন্দরে হাত দেওয়া হলো না। কারণ ওখানে স্বার্থরক্ষার বিশেষ কিছু নেই।

টানা মূল্যস্ফীতিতে সংসার চালানোয় স্বামী-স্ত্রীর তালমিল ভেস্তে গেল। স্বপ্ন দেখিয়েও আহসান এইচ মনসুর হতে পারেননি নন্দলাল বীরাসিংহে, শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর। শ্রীলঙ্কার টালমাটাল অবস্থায় তিনি শক্ত হাতে হাল ধরেছিলেন রাজাপাকসের পতনের পর। সংকটের সময় দায়িত্ব নিয়ে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। কিন্তু বাংলাদেশে আহসান এইচ মনসুর মুদ্রানীতি কঠোর এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনলেও তাতে মূল্যস্ফীতির হাত থেকে মুক্তি মেলেনি সাধারণ ভোক্তার।

আগের সরকারের দীর্ঘ আয়ুর প্রভাবে ভোট নামের হাতিয়ার মুখ লুকিয়ে ছিল। সেটা আবার মানুষের কাছে ফিরে এসেছে। তার সুযোগেই দেশবাসী দেশ চালানোর চাবিকাঠি তুলে দিয়েছে তারেক রহমানের হাতে।

প্রতিপক্ষ চুপচাপ বসে থাকবে না নিশ্চয়ই। নিশ্চল জলে ঢিল ছুড়বেন প্রতিদ্বন্দ্বীরা। কতটা ঢেউ ছলাৎ করে কোথায় উঠে—তা মেপে পরবর্তী কৌশল ঠিক করবে। বিরোধীরা দুবেলা ধুনবে। আলগোছে এসব সরিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। মানুষের আস্থা কাজে লাগাতে না পারলে অদূর ভবিষ্যতে হয়তো আবার দূরে সরে যাবে। নতুন হিংসার ঢেউ এলে আবার এগিয়ে যাবে ধ্বংসের দিকে।

তারেক রহমানের কাছে সাধারণ মানুষ এমন কিছু পলিসি চায়, যার সুফল রাজনীতির ক্ষেতখামারে শস্যের মতো আলো হয়ে থাকবে। তা না হলে মানুষের আশা তাসের ঘরের মতো লুটিয়ে পড়বে। রাতারাতি কিছুই পাল্টায় না—এটা ঠিক। কিন্তু অন্তর্বর্তী আঠারো মাসের দীর্ঘ ঝড়ের শেষে মানুষ বদল চায়। নইলে অতীত হবে নূতন পুনরায়।

    শেয়ার করুন: