বিক্ষোভ থেকে ব্যালট: নেপালের নির্বাচনে শেষ হাসি কার?

চলতি বছর বিশ্বে ৪০টিরও বেশি দেশে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। অন্তত ১৬০ কোটি মানুষ বেছে নেবেন তাদের সরকারপ্রধান। এর মধ্যে রয়েছে সাধারণ নির্বাচন, রাষ্ট্রপতি, সংসদীয় ও মধ্যবর্তী নির্বাচন। আগামী ৫ মার্চ সাধারণ নির্বাচন হবে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ নেপালে। ইতোমধ্যে নির্বাচন আয়োজনে পুরোপুরি প্রস্তুত দেশটি। তবে নেপালের নির্বাচন কমিশন বলছে, পাহাড়ি ও হিমালয় অঞ্চলের আবহাওয়া নিয়ে কিছু উদ্বেগ এখনো রয়ে গেছে।
গত সেপ্টেম্বরে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের জেরে জেন-জি বিক্ষোভের স্বাক্ষী হয় নেপাল। শুরুতে শান্তিপূর্ণ হলেও পরে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। নিরাপত্তা বাহিনী নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি চালায়। দুই দিনে নিহত হন প্রায় ৭৭ জন। বিক্ষোভে দেশটির তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলি উৎখাত হন। আসন্ন নির্বাচনে প্রচারণা চালাচ্ছেন এই বিক্ষোভকারীদের একটা অংশ। অংশ নিচ্ছেন ক্ষমতাচ্যুত কেপি শর্মা অলিও। যদিও আন্দোলনকে রাজনৈতিক প্রভাবে রূপান্তরিত করতে প্রচার চালাচ্ছেন নেপালের তরুণরা।
চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও প্রস্তুত প্রশাসন
গত সেপ্টেম্বরে সরকার পতনের পর দ্রুত নির্বাচন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নেয় দেশটি। এ জন্য সাধারণ সময়ের আগেই মার্চ মাসে ভোট হচ্ছে। সাধারণত নেপালে নির্বাচন হয় নভেম্বর মাসে। বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে দেশ চলছে। সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কি (৭৩) অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং তিনি নেপালের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী।
‘আমরা সব এলাকায় নির্বাচন করার জন্য প্রস্তুত। নিরাপত্তা, প্রশাসন ও লজিস্টিক ব্যবস্থাপনা ঠিকভাবে এগোচ্ছে’, দ্য হিমালয় টাইমসকে সম্প্রতি বলেছেন নির্বাচন কমিশনের সহকারী মুখপাত্র প্রকাশ ন্যাউপানে।
বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়গুলোর বেশকটি নেপালে। আছে মাউন্ট এভারেস্টও। ফলে শীতকালে অনেক পাহাড়ি এলাকা বরফে ঢেকে যায়। বিষয়টি নির্বাচনের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। এ সমস্যা মোকাবিলায় পাঁচটি দুর্গম জেলায় হেলিকপ্টারের মাধ্যমে ভোটের সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও নির্বাচনের তারিখ পেছানোর বিষয়টি উড়িয়ে দিয়েছে কমিশন। প্রকাশ ন্যাউপানের ভাষ্য, ‘রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করেই ৫ মার্চ তারিখ ঠিক করা হয়েছে। তারিখ পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই। এই দিনে নির্বাচন না হলে আরও সমস্যা তৈরি হতে পারে।’
ফেলে আসা সংকট
গত ১০ বছর ধরে নেপালের প্রধানমন্ত্রী পদটি ঘুরেফিরে প্রবীণ নেতাদের কাছে গেছে। কমিউনিস্ট নেতা কেপি শর্মা অলি, পুষ্প কমল দহল এবং মধ্যপন্থী নেতা শের বাহাদুর দেউবা পালাক্রমে ক্ষমতায় থেকেছেন। ২০২৬ সালে, বিশেষ করে গত বছরের রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের পর অনেক নেপালি এখন বড় পরিবর্তন চান।
২০২৫ সালে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতি সূচকে নেপালের অবস্থান ছিল ১৮২ দেশের মধ্যে ১০৯তম। ২০২৪ সালে যুব বেকারত্ব বেড়ে দাঁড়ায় ২০.৮ শতাংশে। একদিকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়ছিল, অন্যদিকে কাজের অভাবে বিদেশে পাড়ি জমানোর হার বাড়ছিল।
এ বছর প্রায় ১ কোটি ৮৯ লাখ মানুষ ভোট দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে, যা গত নির্বাচনের চেয়ে প্রায় ৯ লাখ বেশি। এর মধ্যে ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী প্রায় ৪০ লাখ ভোটার তরুণ। এই নির্বাচনে প্রায় ৬৫টি রাজনৈতিক দল থেকে তিন হাজারের বেশি প্রার্থী অংশ নেবেন। নির্বাচনের মাধ্যমে নেপালের ২৭৫ সদস্যের প্রতিনিধি পরিষদ বা লোকসভা গঠিত হবে। এর মধ্যে ১৬৫ জন সদস্য সরাসরি জনগণের ভোটে এবং বাকি ১১০ জন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রাপ্ত ভোটের ভিত্তিতে সমানুপাতিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত হবেন।
দেশটির জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (এনএইচআরসি) আগামী ৫ মার্চ অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনের জন্য পর্যাপ্ত লজিস্টিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, প্রয়োজনীয় সামগ্রীর ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগের পর এই নির্দেশনা দেওয়া হয়।
এনএইচআরসি চেয়ারম্যান সম্প্রতি চারটি নিরাপত্তা সংস্থার প্রধান ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। তিনি ভোটার, প্রার্থী, নির্বাচন পর্যবেক্ষক, মনিটর ও ভোটকেন্দ্রের কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে—সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য চেয়েছেন সরকারের কাছে। তার ভাষ্য, পর্যাপ্ত লজিস্টিক সহায়তা ছাড়া অবাধ, সুষ্ঠু ও ভয়মুক্ত পরিবেশে নির্বাচন সম্ভব নয়।
পুরনো শক্তির জোট
দেশটির প্রধান দল তিনটি। কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউএমএল), নেপালি কংগ্রেস এবং নেপাল কমিউনিস্ট পার্টি (কয়েকটি দলের জোট)। তবে নতুন প্রজন্মের কিছু নেতা এখন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছেন। বিশেষ করে কাঠমান্ডুর মেয়র হওয়া ৩৫ বছর বয়সী বালেন শাহ, বিদ্যুৎ পরিষেবায় আমুল বদল আনা সাবেক আমলা কুলমান ঘিসিং আর আরএসপি নেতা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রবি লামিছানে।
কুলমান ঘিসিং অল্প সময়ের জন্য আরএসপিতে যোগ দিলেও নিজের দল উজ্যালো নেপাল পার্টিতে ফিরে যান। আরএসপি (রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি) ২০২২ সালে চমক দেখায় এবং চতুর্থ বৃহত্তম দলে পরিণত হয়। কিন্তু পরে দলনেতা লামিছানের দ্বৈত নাগরিকত্ব ও প্রতারণার অভিযোগে জেলে যাওয়ায় জনআস্থা কমে যায়।
এবার পুরনো দলগুলো নতুনদের ঠেকাতে জোট বাধার চেষ্টা করছে। ইউএমএল নেপালি কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করতে চাইলেও কংগ্রেস তা প্রত্যাখ্যান করে। প্রো-রাজতন্ত্র ও মধেশ অঞ্চলের দলগুলোও জোট রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই জোট ক্ষমতা ভাগাভাগির জন্য, জনস্বার্থের সংস্কারের জন্য নয়। যদিও অন্তর্বর্তী সরকার ইতিমধ্যে সুশাসনের একটি রূপরেখা তৈরি করছে। এতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। নেপালি কংগ্রেসও পরিবর্তনের বার্তা দিতে জানুয়ারিতে বিশেষ সম্মেলন করে ৪৯ বছর বয়সী গগন থাপাকে দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী ঘোষণা করে।
পপুলিজমের ঝুঁকি
এবার কিছু নতুন নেতার মধ্যে পপুলিস্ট প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, শুধু জনপ্রিয়তা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার সম্ভব নয়। এতে স্বৈরাচারী ঝুঁকি থাকতে পারে। ‘জেন জেড ফ্রন্ট’ ও ‘জেন জেড মুভমেন্ট অ্যালায়েন্স’-এর মতো তরুণ সংগঠনগুলো রাজনীতিকে নজরদারিতে রাখতে চায়। তাদের কেউ দলীয় রাজনীতিতে যোগ দিচ্ছেন, কেউ স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সমর্থন করছেন, আবার কেউ নির্বাচনী পর্যবেক্ষক হিসেবে কাজ করবেন।
তবে কেউ কেউ মনে করেন, সবার রাজনীতিতে ঢোকার প্রয়োজন নেই। বাইরে থেকেও ক্ষমতায় থাকা মানুষদের প্রশ্ন করা যায়। পরিবর্তন নিশ্চয়ই একদিনে আসে না। কিন্তু সঠিক প্রার্থীকে বেছে নিলে ধীরে ধীরে পরিবর্তন সম্ভব। সেক্ষেত্রে আগামী নির্বাচন হতে পারে গেম-চেঞ্জার। কিন্তু এই নির্বাচন নেপালের তরুণদের স্বপ্ন পূরণ করবে, নাকি পুরনো রাজনীতিই ফিরিয়ে আনবে তা জানতে অপেক্ষা আরও কটা দিন।

