আগামীর সময়

এক-এগারোর ক্ষত নিয়ে ক্ষমতায় বিএনপি, বার্তা স্পষ্ট

এক-এগারোর ক্ষত নিয়ে ক্ষমতায় বিএনপি, বার্তা স্পষ্ট

ছবিঃ আগামীর সময়

২০০৭ সালের এক-এগারো। বাংলাদেশের রাজনীতির বিতর্কিত ও আলোচিত অধ্যায়; যা আজও বহন করছে গভীর ক্ষতচিহ্ন। সেই অধ্যায়ের অন্যতম আলোচিত চরিত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর গ্রেপ্তার নতুন করে সেই ইতিহাস সামনে নিয়ে এসেছে। শুধু একটি গ্রেপ্তার নয়, বরং এটি এক-এগারোর পুরো প্রক্রিয়া ও সংশ্লিষ্টদের প্রতি সরকারের স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।

গতকাল সোমবার মধ্যরাতে রাজধানীর বারিধারা ডিওএইচএস এলাকা থেকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) তাকে আটক করে। ডিবিপ্রধান শফিকুল ইসলাম জানান, তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছিল।

এক-এগারোর সময় গঠিত ‘জাতীয় অপরাধ দমন সমন্বয় কমিটি’র সমন্বয়ক হিসেবে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

রাজনৈতিক বার্তার তিন মাত্রা

আলাপকালে বিএনপির নীতিনির্ধারকরা এই গ্রেপ্তারকে তিনটি প্রধান দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেছেন।

প্রথমত: বিএনপির মতে, এক-এগারো ছিল একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক প্রকল্প, যার লক্ষ্য ছিল দলটিকে নেতৃত্বশূন্য করা। ২০০৭ সালের ৭ মার্চ তারেক রহমানের গ্রেপ্তার এবং পরবর্তী নির্যাতনের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে। দলটির দাবি, তাকে রিমান্ডে নিয়ে অমানবিক নির্যাতন করা হয়েছিল। মাসুদ উদ্দিনকে সেই প্রক্রিয়ার অন্যতম নেপথ্য পরিচালনাকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ফলে এই গ্রেপ্তার বিএনপি দেখছে একটি বার্তা হিসেবে—‘অতীতের নির্যাতনের জন্য কেউই দায়মুক্ত নয়।’

দ্বিতীয়ত: এক-এগারোর পর শেখ হাসিনা সরকারের সময় মাসুদ উদ্দিন অস্ট্রেলিয়ায় হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং তার মেয়াদ একাধিকবার বাড়ানো হয়। পরে তিনি জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে সংসদ সদস্যও হন। এই প্রেক্ষাপটে তার গ্রেপ্তার অনেকে দেখছেন অতীতের রাজনৈতিক ‘সুরক্ষা বলয়’ ভেঙে দেওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে।

তৃতীয়ত: দীর্ঘদিন ধরে এক-এগারোকে ‘অন্যায়ের প্রতীক’ হিসেবে তুলে ধরে আন্দোলন করেছে বিএনপি। ফলে এই গ্রেপ্তার তাদের কর্মী-সমর্থকদের কাছে একটি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের বার্তা বহন করছে।

এক-এগারো: প্রেক্ষাপট ও প্রভাব

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি তীব্র রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে জরুরি অবস্থা জারি করে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদের নেতৃত্বে ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ নামে পরিচিত একটি পরিকল্পনার মাধ্যমে খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে রাজনীতির বাইরে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালানো হয়।

এই সময় দুর্নীতির অভিযোগে দুই দলের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হন। সমালোচকদের মতে, এটি ছিল একটি ‘নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা, যেখানে একটি তৃতীয় শক্তির উত্থান ঘটানোর পরিকল্পনা ছিল— যা শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি।

নতুন বাস্তবতা, পুরনো প্রশ্ন

বিশ্লেষকদের মতে, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর গ্রেপ্তার শুধু অতীতের একটি অধ্যায় পুনরুজ্জীবিত করেনি, বরং ভবিষ্যতের রাজনৈতিক গতিপথ সম্পর্কেও ইঙ্গিত দিচ্ছে। এটি কি শুধুই বিচারের প্রক্রিয়া, নাকি বৃহত্তর রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের অংশ— সেই প্রশ্ন এখন আলোচনার কেন্দ্রে।

    শেয়ার করুন: