আগামীর সময়

শাসন নয় আচরণ পরিবর্তনই কি ট্রাম্পের লক্ষ্য?

শাসন নয় আচরণ পরিবর্তনই কি ট্রাম্পের লক্ষ্য?

ছবিঃ আগামীর সময়

ভেনেজুয়েলা থেকে মাদুরোকে তুলে নেওয়া কিংবা ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথ অভিযানে খামেনিকে হত্যা করে ডোনাল্ড ট্রাম্প তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর শাসন পরিবর্তন করতে চান— এমন আলোচনা এখন সর্বত্র। তবে ইরানে শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দিতে প্রস্তুত মনে হলেও ট্রাম্প যে পুরো শাসন কাঠামো উৎখাত করতে আগ্রহী নন তা দৃশ্যমান।

আরও বিস্তৃতভাবে দেখলে ভেনেজুয়েলা, কিউবা, এমনকি ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ইরানের ওপর চাপ— সকল ক্ষেত্রেই তিনি অপছন্দের সরকারকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে অভিনব পন্থা গ্রহণে আগ্রহী।

গণতন্ত্রের একনিষ্ঠ সমর্থক নন ট্রাম্প। সৌদি আরব থেকে এল সালভাদর— যে কোনো স্বৈরশাসকের সঙ্গে তিনি কাজ করতে প্রস্তুত যদি তারা তার চাওয়া অনুযায়ী চলে। ট্রাম্পের কৌশলকে বলতে হয় পুরো শাসনব্যবস্থা উৎখাত করতে না পারলেও অন্তত তার আচরণ বদলালেই তিনি সন্তুষ্ট। আর যে আচরণ তিনি সবচেয়ে বেশি বদলাতে চান, তা হলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সেই সরকারের সম্পর্কের ধরন।

ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডকে বিংশ শতাব্দীর সমাধিস্থকরণ মনে করেন পলিটিকোর জ্যেষ্ঠ নির্বাহী সম্পাদক আলেকজান্ডার বার্নস। তার মতে, মার্কিন দৃষ্টিতে যারা বিংশ শতাব্দীর খলনায়ক, তাদের জোট, রাজনৈতিক রীতি ও যুদ্ধবিরতি সবকিছুর কবর রচনা করেছেন ট্রাম্প। বিনিময়ে তিনি এমন এক ভবিষ্যৎ উন্মোচন করছেন যা অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতায় ভরা, যেখানে নতুন কোনো ভারসাম্যের আভাস নেই।

প্রেসিডেন্ট হিসেবে দুই মেয়াদেই নীতিনির্ধারণ, শাসন ও সংস্কৃতির নানা ক্ষেত্রে তার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অর্জনগুলো ছিল ধ্বংস করা। তার মনোনীত সুপ্রিম কোর্ট বিচারপতিরা এমন একটি রায় বাতিল করেন যা সত্তরের দশক থেকে যুক্তরাষ্ট্রে গর্ভপাত অধিকার নিয়ে চলমান রাজনৈতিক ও আইনি অচলাবস্থার অবসান ঘটায়। লাতিন আমেরিকায় তার সামরিক হস্তক্ষেপ কিউবার সরকারকে পতনের কিনারায় নিয়ে গেছে।

একজন মার্কিন কর্মকর্তার উদ্বৃতি দিয়ে পলিটিকোর সিনিয়র ফরেইন অ্যাফেয়ার্স কোরেস্পনডেন্ট নাহাল তুসি লিখেছেন, ‘আমাদের সংস্করণে শাসন পরিবর্তন মানে আচরণ পরিবর্তন। ইরাক ও আফগানিস্তান থেকে আমরা কিছু শিক্ষা পেয়েছি।’

তবে ট্রাম্প বিষয়টি সম্পূর্ণ ভেবে দেখেছেন কিনা জোর দিয়ে বলার সুযোগ নেই। কারণ সাক্ষাৎকারে তিনি প্রায়ই নিজেকেই বিরোধিতা করেন।

শব্দচয়ন ও সূক্ষ্ম পার্থক্যগুলোও বিভ্রান্তিকর। কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকরা ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা ‘রেজিম কলাপস’ উভয়ই ব্যবহার করেন। তাছাড়া ঠিক কতজনকে সরালে একটি ‘শাসন’ শেষ হয়ে যায়? শাসনের আচরণে যথেষ্ট পরিবর্তন কি শাসন পরিবর্তনের সমান হতে পারে? শেষ পর্যন্ত শাসন যারা পরিচালনা করে শুধু তাদের নিয়ে নয়; রাজনৈতিক ক্ষমতা কীভাবে অর্জিত, বণ্টিত ও ব্যবহৃত হয় সেটিও এর অংশ।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের শীর্ষ ইরান বিশ্লেষক আলি ভায়েজের মতে, ‘শাসন পরিবর্তন’ মানে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের এমন এক প্রক্রিয়া, যা ট্রাম্পের দল করতে চায় না।

এই বিশ্লেষক অবশ্য ‘রেজিম ট্রান্সফরমেশন’ শব্দটি পছন্দ করেন যা দিয়ে তিনি ইরানে ট্রাম্প যা করছেন তা বর্ণনা করেন। তার ভাষায়, এর অর্থ হলো কাঠামো মোটামুটি আগের মতোই থাকবে, কিন্তু আচরণ এমনভাবে বদলাবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। তা অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যবোধের সঙ্গে নয়, বরং স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।

ইরানে ট্রাম্পের হামলা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় তিনি নিজের চাওয়া বাস্তবায়নে একটি শাসনকে বাধ্য করতে অসাধারণ ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত (যখন তিনি ঠিক করেন তার চাওয়া কী)। ভেনেজুয়েলা ও কিউবায় তার পদক্ষেপের সঙ্গে তুলনা করলে বোঝা যায় তিনি প্রতিটি দেশকে আলাদাভাবে বিবেচনা করছেন এবং কৌশলও ভিন্নভাবে সাজাচ্ছেন। এতে তিনি তিন দেশেই কাঙ্ক্ষিত আচরণ পরিবর্তন পেতে পারেন।


এই মুহূর্তে ট্রাম্পের অনেক সহযোগী ‘শাসন পরিবর্তন’ শব্দযুগল এড়িয়ে চলছেন। যদিও ট্রাম্প ইরানি নাগরিকদের সরকার ‘দখল’ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সোমবার বলেছেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল অভিযান তথাকথিত শাসন পরিবর্তনের যুদ্ধ নয়, তবে শাসন অবশ্যই বদলেছে। আবার ট্রাম্পের কিছু মিত্র, যেমন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম বলছেন, শাসন ভেঙে পড়লে ইরানে যা ঘটবে তার জন্য যুক্তরাষ্ট্র দায়ী নয়।

যৌথ অভিযানে শাসনব্যবস্থার বহু শীর্ষ ব্যক্তিত্ব নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিও রয়েছেন। হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব নিয়েছে ইসরায়েল, তবে স্পষ্টতই ট্রাম্পের অনুমোদন ছিল।

এ অভিযান ইঙ্গিত দেয় নির্বাচনের চিন্তা থেকে মুক্ত ও প্রধান সেনাপতির ভূমিকায় আরও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করা ট্রাম্প নিজেকে বাঁধনহীন মনে করছেন। তিনি সম্ভাব্য বহু মার্কিন হতাহতের কথাও খোলাখুলি বলেছেন এবং অভিযান পাঁচ সপ্তাহ বা তারও বেশি চলতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন।

প্রথম মেয়াদে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রতি তার অবস্থানের তুলনায় এটি একধাপ এগিয়ে। তখন ট্রাম্প প্রশাসন তেহরানের কাছে এমন এক বিস্তৃত দাবির তালিকা দিয়েছিল যেন তারা শাসনব্যবস্থার ‘ডিএনএ’ বদলাতে বলছে। সে সময় ট্রাম্প যুদ্ধের বদলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন। কিন্তু তাতে শাসন বা তার সামগ্রিক আচরণ বদলায়নি।

তবু এখন বোমাবর্ষণের মধ্যেও ট্রাম্প বলেছেন তিনি ইরানের ইসলামপন্থী নেতৃত্বের অবশিষ্ট অংশের সঙ্গে আলোচনায় প্রস্তুত। যা ইঙ্গিত দেয় তিনি বিদ্যমান শাসনের মৌলিক কাঠামো অক্ষত রাখতে রাজি। তবে শীর্ষ ইরানি নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলি লারিজানি সোমবার সামাজিক মাধ্যমে বলেছেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করবে না।

মূল কথা হলো যা প্রকাশ্যে জানা গেছে তাতে দেখা যায় হামলা শেষ হলে তেহরানে বসানোর মতো যুক্তরাষ্ট্রের হাতে প্রস্তুত কোনো বিকল্প সরকার নেই।

ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করতে এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর প্রতি তার সমর্থন বন্ধ করতে বদ্ধপরিকর যা আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি।

যদি ইরানের অবশিষ্ট শাসনব্যবস্থা এসব দাবিতে সম্মত হয়, তবে সেটুকু আচরণ পরিবর্তনই ট্রাম্পের কাছে সামরিক পর্যায় শেষ করার জন্য যথেষ্ট হতে পারে। অন্যদিকে, যদি ট্রাম্প শাসনের সমঝোতার ইচ্ছা ভুলভাবে বিচার করে থাকেন, তবে তিনি একটি ব্যর্থ ইরানি রাষ্ট্র রেখে যেতে পারেন, যার ভূখণ্ড সন্ত্রাসীদের খেলাঘরে পরিণত হবে। অথবা ইরানের সশস্ত্র বাহিনী সম্পূর্ণ ক্ষমতা দখল করে নতুন এক স্বৈরতন্ত্র চাপিয়ে দিতে পারে। কোনোটিই যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য শুভ নয়।

তবুও সামরিক অভিযান শেষ হলে নতুন নেতৃত্ব প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছে— এ ব্যাপারে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ট্রাম্প নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবেন না বা অন্যান্য চাপ কমাবেন না।

ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের অভিযান তুলনামূলক সহজ ছিল।  ট্রাম্পের কাছে আলোচনায় আগ্রহী মাদুরোর সহযোগীরাও ছিলেন। ডেলসি রদ্রিগেজের নেতৃত্বে অবশিষ্ট নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রকে ভেনেজুয়েলার তেলে প্রবেশাধিকার দিয়েছে এবং কিছু রাজনৈতিক বন্দি মুক্তিসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে।

ভেনেজুয়েলার আচরণ ধীরে ধীরে এতটাই বদলাচ্ছে যে ট্রাম্প তার স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে ‘আমাদের নতুন বন্ধু ও অংশীদার, ভেনেজুয়েলা’ বলে গর্ব করেছেন। ট্রাম্প ব্যক্তিগত সম্পর্ককে গুরুত্ব দেন যেমন রদ্রিগেজের সঙ্গে তার সম্পর্ক ভালো।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি প্রদর্শন কারাকাসে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ইরান অভিযান সফল হলে ভেনেজুয়েলার নেতৃত্ব ট্রাম্পের অনুকম্পায় থাকার জন্য আরও উৎসাহী হবে। ব্যর্থ হলে তারা যুক্তরাষ্ট্রের বিভ্রান্তিকে কাজে লাগাতে পারে।

কিউবাও মধ্যপ্রাচ্যে ট্রাম্পের পদক্ষেপ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, কারণ ট্রাম্প প্রশাসন তাদের কমিউনিস্ট শাসনের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। ইরানের শাসন কিউবার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার ছিল (ভেনেজুয়েলার মতোই) এবং সেই সম্পর্ক এখন ঝুঁকিতে।

ট্রাম্প বলেছেন, তার প্রশাসন কিউবা সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করছে। সামরিক হামলার কোনো ইঙ্গিত নেই, তবে যুক্তরাষ্ট্র অস্বাভাবিক মাত্রায় অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বাড়িয়েছে বিশেষত তেল ও জরুরি পণ্যের প্রবেশাধিকার কমিয়ে।

সম্প্রতি ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র কিউবায় একটি ‘বন্ধুত্বপূর্ণ দখল’ নিতে পারে। এতে শাসনের গঠনে কিছু পরিবর্তন আসতে পারে। কারণ কিউবার নেতৃত্ব মাদুরো বা খামেনির মতো একক ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যা বলেছেন তাতে মনে হয় যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে অর্থনৈতিক সংস্কার চাইবে।

রুবিও দীর্ঘদিন হাভানার শাসন শেষ করতে চেয়েছেন। কিন্তু গত মাসে তিনি ব্লুমবার্গ নিউজকে বলেছেন, কিউবার মৌলিক সমস্যা হলো, তাদের কোনো অর্থনীতি নেই। পরে সাংবাদিকদের বলেছেন, কিউবাকে একসঙ্গে সব পরিবর্তন করতে হবে না। যদি তারা এমন নাটকীয় সংস্কার করে যা অর্থনৈতিক এবং শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক স্বাধীনতার পথ খুলে দেয়, যুক্তরাষ্ট্র অবশ্যই তা দেখতে চাইবে। আমরা সহায়তা করব।

নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিনিময়ে এই অর্থনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যে থাকতে পারে কিছু শিল্প বেসরকারিকরণ ও বিদেশি বিনিয়োগের অনুমতি। রাজনৈতিক বন্দি মুক্তির দাবিও আসতে পারে।

হয়তো ইরান, কিউবা ও ভেনেজুয়েলার নেতারা যারা টিকে থাকবেন তাদের শাসনের আচরণ এমনভাবে বদলাবেন যাতে ট্রাম্প সন্তুষ্ট হন। সম্ভবত একসময় তারা এমন পরিবর্তনও আনবেন, যা নাগরিকদের আরও স্বাধীনতা দেবে।

    শেয়ার করুন: