ইরান কী তার দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে?

সংগৃহীত ছবি
আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই টিকিয়ে রাখতে গিয়ে সর্বোচ্চ নেতা থেকে শুরু করে শীর্ষ অনেক নেতৃত্বকে বলি দিয়েছে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরান। এত ক্ষয়ক্ষতির পরেও যুদ্ধ থেকে পিছু হটেনি দেশটি। কিন্তু যুদ্ধ থেকে তেহরান আসলে কি চায়?
যুদ্ধ রাজনীতির শেষ নয়, বরং রাজনীতিরই একটি ভিন্ন রূপ। উক্তিটি বিখ্যাত সামরিক তাত্ত্বিক কার্ল ফন ক্লজউইৎজের। যখন ওমানের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে একটি শান্তি চুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, ঠিক তখনই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আলোচনার টেবিল ছেড়ে যুদ্ধের পথ বেছে নিলেন।
ঝামেলাটা হলো, ট্রাম্পের আসল উদ্দেশ্য কী তা পরিষ্কার নয়। যেখানে কূটনীতির মাধ্যমেই ইরানকে পরমাণু অস্ত্র থেকে দূরে রাখা সম্ভব ছিল, সেখানে তিনি কেন দেশটিকে ভেঙে ফেলা বা সরকার পরিবর্তনের মতো ঝুঁকিপূর্ণ যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিলেন তা এখনো ধোঁয়াশা।
যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য অস্পষ্ট থাকলেও ইরানের লক্ষ্য কিন্তু বেশ পরিষ্কার। মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার শিকার হয়ে তেহরান এখন এমন এক কৌশল নিয়েছে যা তারা অনেক আগে থেকেই পরিকল্পনা করে রেখেছিল। তাদের মূল লক্ষ্য হলো— একটি শক্তিশালী ‘প্রতিরোধ ব্যবস্থা’ (ডিটারেন্স) গড়ে তোলা যাতে ভবিষ্যতে কেউ তাদের ওপর হামলা করার সাহস না পায়।
ইরানি কর্মকর্তাদের মতে, গত তিন দশক ধরে তারা যে ধৈর্য দেখিয়েছিল, ওয়াশিংটন তাকে ইরানের দুর্বলতা আখ্যা দিয়ে ভুল ব্যাখ্যা করেছে। কাসেম সুলাইমানিকে হত্যার পর ইরান যখন ইরাকের আল-আসাদ ঘাঁটিতে নিয়ন্ত্রিত হামলা চালাল, ওয়াশিংটন ভেবেছিল বড় কোনো পাল্টা আক্রমণের সক্ষমতা ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের নেই। এই ভুল ধারণাই যুক্তরাষ্ট্রকে আরও সাহসী করে তুলেছিল।
গত জুনের ১২ দিনের যুদ্ধ ইরানের রাজনৈতিক মহলে একটি ঐকমত্য তৈরি হয়েছে— চুপচাপ সহ্য করার নীতি আর কাজে আসবে না। এতে শত্রু পক্ষ আরও বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে উঠে। আগে ইরান তার মিত্রদের ব্যবহার করে যুদ্ধ নিজের সীমানার বাইরে রাখতে চাইত। কিন্তু সাম্প্রতিক সরাসরি সংঘর্ষগুলো প্রমাণ করেছে শুধু এই কৌশলে ইরান নিরাপদ নয়।
তাই ইরান এখন রক্ষণাত্মক অবস্থান ছেড়ে আক্রমণাত্মক কৌশল গ্রহণ করেছে। ইরানের সামরিক প্রধান মেজর জেনারেল আবদুর রহিম মুসাভি ঘোষণা করেছেন, এখন থেকে তাদের জবাব হবে দ্রুত ও বিধ্বংসী। সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিও সতর্ক করেছিলেন, ইরানের ওপর যেকোনো মার্কিন হামলা হলে যুদ্ধ পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে যাবে।
ইরান এখন এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করতে চায় যেখানে যুদ্ধের খরচ মেটাতে হিমশিম খাবে যুক্তরাষ্ট্র। এ ক্ষেত্রে ইরানের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এই পথ দিয়ে যায়। যুদ্ধের শুরু থেকেই ইরান এই পথটি কার্যত বন্ধ করে রেখেছে। তাতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়ার পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতি হুমকির মুখে।
পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও তাদের তেল-গ্যাস ক্ষেত্রগুলোও এখন ইরানের নিশানায়। সম্প্রতি কাতার, সৌদি আরব ও কুয়েতের জ্বালানি স্থাপনায় ড্রোন ও মিসাইল হামলা চালিয়ে ইরান বুঝিয়ে দিয়েছে তারা প্রথাগত নিয়মের বাইরে গিয়ে যেকোনো বড় ধরনের আঘাত করতে প্রস্তুত।
ট্রাম্প হয়তো ইরানকে পুরোপুরি আত্মসমর্পণ করাতে চান, কিন্তু ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান ও গেরিলা যুদ্ধের সক্ষমতার কারণে তাদের হারানো প্রায় অসম্ভব। ইরানের নৌবাহিনী ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তাদের ছোট ছোট স্পিডবোট, সস্তা ড্রোন ও সমুদ্রে মাইন বিছানোর ক্ষমতা বিশ্ব অর্থনীতিকে মাসের পর মাস অচল করে রাখতে পারে।
ইরানের কাছে এই যুদ্ধটি এখন অস্তিত্বের লড়াই। তারা মনে করে, এখন যদি তারা নিজেদের শক্তি প্রমাণ করতে না পারে, তবে ভবিষ্যতে তাদের অস্তিত্ব বা সরকার— কোনোটাই টিকবে না। তাই পরিকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হওয়া সত্ত্বেও তারা পিছু হটতে রাজি নয়।
শেষ পর্যন্ত উভয় পক্ষকেই হয়তো আলোচনার টেবিলে ফিরতে হবে। তবে সেই আলোচনা আর আগের মতো হবে না। যুদ্ধের ময়দানে যে নতুন শক্তির ভারসাম্য তৈরি হবে, তার ওপর ভিত্তি করেই নির্ধারিত হবে আগামী দিনের কূটনীতি।
ফরেইন পলিসি থেকে ভাষান্তর

