অধরা পরমাণুতেই ধরা ইরান!

সংগৃহীত ছবি
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। এর মধ্য দিয়ে অবসান হলো প্রায় চার দশকের শাসনের। একইদিন দেশটি হারিয়েছে সেনা কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন নেতাদের। ফলে দেশে-বিদেশে অনেকে ভাবছেন, পরমাণু শক্তিধর দেশ হলে ইরানের কি এমন পরিণতি হতো?
এ ঘটনায় ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) অঙ্গীকার করেছে ‘কঠিন প্রতিশোধ’ নেওয়ার। কিন্তু কীভাবে? ইসরায়েল বারবার সন্দেহের তীর তাক করলেও তেহরান কখনো পরমাণু শক্তিধর দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেনি।
বরং বর্তমানে ইরানে যৌথ হামলা, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে তেহরানের পাল্টা হামলা ঘিরে তীব্র উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে।
শেষ ভাষণে কী বলেছিলেন খামেনি
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি শেষবারের মতো প্রকাশ্যে ভাষণ দেন খামেনি। ‘আমাদের অবশ্যই প্রতিরোধমূলক অস্ত্র থাকতে হবে। যদি কোনো দেশের কাছে প্রতিরোধমূলক অস্ত্র না থাকে, তবে সেই দেশ শত্রুদের পায়ের নিচে পিষ্ট হবে’, জেনেভায় ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা শুরু হওয়ার বলেছিলেন তিনি।
প্রতিরোধমূলক অস্ত্র ইরানের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন উল্লেখ করেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। ‘মার্কিনিরা কোনো কারণ ছাড়াই এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছে। তারা (ওয়াশিংটন) বলছে, তোমাদের অমুক অমুক ক্ষেপণাস্ত্র থাকতে পারে, তোমাদের পাল্লা এতটুকু হতে পারে এর বেশি নয়। কিন্তু এসবের সঙ্গে তোমাদের (ওয়াশিংটন) কী সম্পর্ক? এটি একান্তই ইরানের বিষয়।’
একইসঙ্গে মার্কিন সামরিক শক্তির দম্ভের সমালোচনাও বাদ যায়নি। ‘তাদের (ওয়াশিংটন) কাছে মনে হয় এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারবার এটিই বলছেন— মার্কিন সেনাবাহিনী বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনী। তবে বিশ্বের এই তথাকথিত শক্তিশালী সেনাবাহিনীকেও মাঝে মাঝে এমন জোরে থাপ্পড় খেতে হতে পারে, যে তারা আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না’, বলছিলেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা।
ইরান কি আসলেই পরমাণু অস্ত্র তৈরি করছে?
নব্বইয়ের দশক থেকে মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি দেশ ইসরায়েলের অভিযোগ পরমাণু বোমা তৈরি করতে চাইছে ইরান। অন্যদিকে তেহরান বরাবরই তা অস্বীকার করে এসেছে। একইসঙ্গে শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরমাণু প্রকল্প পরিচালনার কথা জানিয়েছে তারা। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাও বলেছিল, ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরি করছে না।
তারপরও সন্দেহ করার মূল কারণ ইরানে ইউরেনিয়ামের ব্যাপক মজুদ। এ বিষয়ে স্বচ্ছতার অভাবও তেহরানের উদ্দেশ্য নিয়ে অনেক দেশকে উদ্বিগ্ন করেছে। জার্মান বার্তা সংস্থা ডয়চে ভেলে গত বছর এক প্রতিবেদনে জানায়, ইরান ৬০ শতাংশ বিশুদ্ধতায় সমৃদ্ধ ৪০০ কেজিরও বেশি ইউরেনিয়াম মজুদ করেছে।
সমালোচকদের মতে, এই ৪০০ কেজি ইউরেনিয়াম দিয়ে প্রায় ১০টি পারমাণবিক বোমা তৈরি সম্ভব। তবে ইরান আদৌ সে পর্যায়ে পৌঁছেছে কিনা বা তাদের ৯০ শতাংশ বিশুদ্ধ ইউরেনিয়াম থাকার কোনো প্রমাণ মেলেনি। যদিও ইরানের ‘পরমাণু কর্মসূচি’ ক্ষতিগ্রস্ত করতে বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেছে ইসরায়েল।
ইরানের পরমাণু কর্মসূচি কী অবস্থায় রয়েছে?
গত জুনে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ১২ দিনের যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পর ইরানের কর্মসূচির অবস্থা পুরোপুরি স্পষ্ট নয় বলে উল্লেখ করে বিবিসি। যুক্তরাষ্ট্রও স্বল্প সময়ের জন্য যুদ্ধে যোগ দিয়ে তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়। এর মধ্যে ছিল ইসফাহানে ইরানের বৃহত্তম পারমাণবিক গবেষণা কমপ্লেক্স এবং নাতাঞ্জ ও ফোর্দোতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র। সেসব স্থানে নির্দিষ্ট আইসোটোপের অনুপাত বাড়িয়ে পারমাণবিক জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের উপযোগী করা হয়।
হামলার পর ট্রাম্প বলেন, স্থাপনাগুলো সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করা হয়েছে। তবে এক সপ্তাহ পর আইএইএর প্রধান রাফায়েল গ্রোসি বলেন, হামলায় গুরুতর ক্ষতি হয়েছে, তবে ‘সম্পূর্ণ নয়।’ এ থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে কয়েক মাসের মধ্যে আবারও সমৃদ্ধকরণ শুরু হতে পারে।
আইএইএর ধারনা অনুযায়ী, ১৩ জুন যখন ইসরায়েল বিমান হামলা শুরু করে, তখন ইরানের কাছে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বিশুদ্ধ ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়াম মজুত ছিল। এর অর্থ ৯০ শতাংশ অস্ত্রমানের পর্যায়ে পৌঁছাতে প্রযুক্তিগতভাবে খুব কাছাকাছি। অক্টোবরে গ্রোসি অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেছিল, এই পরিমাণ ইউরেনিয়াম যদি আরও সমৃদ্ধ করা হয় তাহলে তা ১০টি পারমাণবিক বোমা তৈরির জন্য যথেষ্ট।
এরপর নভেম্বরে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি দ্য ইকোনমিস্টকে বলেন, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এখন বন্ধ হয়ে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি ফক্স নিউজকে বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ, আপনারা স্থাপনা ও যন্ত্রপাতি ধ্বংস করেছেন। কিন্তু প্রযুক্তিকে বোমা মেরে ধ্বংস করা যায় না, দৃঢ়তাও শেষ করা যায় না।’
জানুয়ারিতে গ্রোসি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, আইএইএ ইরানের ১৩টি পারমাণবিক স্থাপনা পরিদর্শন করতে সক্ষম হয়েছে যেগুলোয় হামলা করা হয়নি। তবে যে তিনটি মূল স্থাপনায় হয়েছে, সেখানে তারা পরিদর্শন করতে পারেনি। তিনি বলেন, আইএইএ ইরানের অত্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত যাচাই করার পর ৭ মাস পার হয়ে গেছে। মজুত ইউরেনিয়ামের অবস্থান ও অবস্থা, এবং সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রগুলোর কার্যক্ষমতা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন
অস্ত্র তৈরিতে প্রয়োজনীয় সমৃদ্ধতা অর্জন না করলেও যে পরিমাণ ইউরেনিয়ামের মজুদ এবং সক্ষমতা ইরানের আছে, তাতে প্রযুক্তি কাজে লাগালে ইরান খুব দ্রুত সে পর্যায়ে পৌঁছাতে পারবে— এমনটা বলেছেন অনেক পশ্চিমা বিশেষজ্ঞ। তবে কেবল ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করলেই পরমাণু বোমা বানানো যায় না৷ এজন্য কর্মক্ষম যুদ্ধাস্ত্র এবং সেটা নিক্ষেপে সক্ষম মিসাইলও প্রয়োজন৷ ইসরায়েলসহ অনেকে মনে করে ইরান গোপনে পরমাণু বোমা তৈরি করছে৷
তবে এই দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ হাজির করতে পারেনি ইসরায়েল। অনেক বিশ্লেষক ইরানকে পরমাণু শক্তিধর না বললেও পরমাণু বোমার ‘দ্বারপ্রান্তের দেশ’ হিসেবে বিবেচনা করেন৷
পরমাণু অস্ত্র কি নিরাপত্তা দেয়?
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনায় ফের সামনে এসেছে আন্তর্জাতিক রাজনীতির পুরনো বিতর্ক। পরমাণু অস্ত্র কি একটি রাষ্ট্রকে নিরাপত্তা দেয়, নাকি আরও বড় ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়? অনেকের ভাষ্য, ইরানের কাছে কার্যকর পরমাণু অস্ত্র থাকলে দেশটি এমন সামরিক হামলার সম্মুখীন হত না। তবে এই যুক্তির পেছনে রয়েছে ‘ডিটারেন্স’ বা প্রতিরোধ তত্ত্ব।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে দেখা যায়, পরমাণু অস্ত্রধারী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সরাসরি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের ঘটনা বিরল। উত্তর কোরিয়া তার পারমাণবিক সক্ষমতা প্রদর্শনের পর থেকে বহির্বিশ্বের সঙ্গে উত্তেজনা থাকলেও সরাসরি আক্রমণের শিকার হয়নি। একইভাবে পাকিস্তান ও ভারত দুই দেশই পরমাণু শক্তিধর। তাদের মধ্যে সংঘাতের ঘটনা ঘটে, কিন্তু তা পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেয় না। কারণ উভয়পক্ষই জানে পরমাণু যুদ্ধ মানে পারস্পরিক ধ্বংস।
এই প্রেক্ষাপটে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, যদি ইরান বাস্তবিক অর্থে পরমাণু শক্তিধর হত, তাহলে তেহরানে পূর্ণ মাত্রার সামরিক অভিযান চালানোর আগে একাধিকবার ভাবতে হত। কারণ পরমাণু অস্ত্র শুধু সামরিক শক্তির প্রতীক নয়; এটি রাজনৈতিক বার্তাও— ‘আমাদের ওপর হামলা হলে মূল্য চুকাতে হবে।’
প্রতিরোধ তত্ত্বের অসুবিধা কী?
যুক্তির বিপরীত দিক হলো, পরমাণু শক্তিধর হওয়ার প্রচেষ্টা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক চাপ ও কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা ডেকে আনে। ইরানের ক্ষেত্রেও দীর্ঘদিন ধরে তাই ঘটছে। ইতোমধ্যে মার্কিন ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় ভঙ্গুর তেহরানের অর্থনীতি। পরমাণু শক্তিধর হলে হয়তো তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা বাড়ত, কিন্তু একই সঙ্গে আঞ্চলিক অস্ত্র প্রতিযোগিতাও ত্বরান্বিত হত। আবার মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোও তখন একই পথে হাঁটতে পারত, যা পুরো অঞ্চল ‘অনিশ্চিত’ করে তুলত।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো— পরমাণু অস্ত্র কি সত্যিই স্থায়ী নিরাপত্তা দেয়? ইতিহাস বলছে, এটি ‘ভয়ের ভারসাম্য’ তৈরি করে, যেখানে শান্তি টিকে থাকে সম্ভাব্য সর্বনাশের আশঙ্কায়। সুতরাং পরমাণু বোমা থাকলে এই পরিণতি হত না— এই বক্তব্য আংশিকভাবে সত্য হলেও এর সঙ্গে জড়িয়ে নৈতিক, মানবিক ও আঞ্চলিক ঝুঁকি।
কূটনীতিবিদদের মতে, নিরাপত্তার স্থায়ী সমাধান অস্ত্রের শক্তি বিস্তারে নয়; বরং কার্যকর কূটনীতি, আঞ্চলিক আস্থা-গঠন এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সম্মানে নিহিত।

