সোমালিয়া কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

সংগৃহীত ছবি
মোগাদিসুর আকাশে উড়ছে তুরস্কের এফ-১৬ যুদ্ধবিমান। যদিও হামলার উদ্দেশ্যে নয়। এটি তুর্কি মিত্রদের কাছ থেকে সোমালিয়ার জন্য একটি ‘উপহার’ হিসেবে পাঠানো হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, ১৯৯১ সালের পর বিমানবাহিনী না থাকা সোমালিয়া এখন মাত্র তিনটি আফ্রিকান দেশের মধ্যে একটি যারা অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান এফ-১৬ ব্যবহার করতে পারছে।
এর উল্লেখযোগ্য দিকটি হলো, সম্প্রতি সৌদি আরব এবং তুরস্ক একটি বিস্তৃত চুক্তি সই করেছে। এই চুক্তি অর্থনীতি থেকে কৌশলগত সহযোগিতা পর্যন্ত বিস্তৃত। দুই দেশের এই চুক্তি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কারণ ২০১৭ সালের কাতার অবরোধ এবং ২০১৮ সালে জামাল খাশোগি হত্যার পর তাদের সম্পর্ক খুবই বাজে অবস্থায় ছিল। এখন এই দুই দেশের সমঝোতা রয়েছে ইয়েমেন, সুদান এবং বিশেষভাবে সোমালিয়ার বিষয়ে।
সোমালিয়া কেন গুরুত্বপূর্ণ? সোমালিয়া আফ্রিকার হর্ণ অঞ্চলে লোহিত সাগরের তীরে অবস্থিত। এর অবস্থান এমন এক গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যিক পথের পাশে যা ইউরোপ, এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকাকে সংযুক্ত করে। এর মানে, যিনি সোমালিয়ায় প্রভাবশালী হন, তিনি বাণিজ্য বন্ধ বা জাহাজে বাধা দেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করতে পারেন। যেমন সম্প্রতি ইয়েমেনের হুথিদের দ্বারা ঘটেছে।
সোমালিয়ায় তুরস্ক ও সৌদি আরবের সামরিক ও কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়ার ত্বরিত কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো সোমালিল্যান্ডকে ইসরায়েলের স্বীকৃতি দেওয়া। সোমালিল্যান্ড যা ১৯৯১ সাল থেকে কার্যত স্বাধীন। সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) এই দেশকে গভীরভাবে সহযোগিতা করেছে বেবেরা বন্দরের উন্নয়নে। এটি ছিল ইউএইর বন্দর ও সামরিক ঘাঁটি নেটওয়ার্কের একটি অংশ।
তুরস্কের এফ-১৬ যুদ্ধবিমান
ইসরায়েল যদি সোমালিল্যান্ডে উপস্থিতি বৃদ্ধি করে, তা সৌদি আরবের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হবে। দেশটি স্বাভাবিকভাবেই ইসরায়েল দ্বারা পরিবেষ্টিত হওয়ার শঙ্কায় রয়েছে। রিয়াদ এখন যে কোনো প্রতিকূল অবস্থার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত, যা প্রমাণিত হয়েছে গত বছর ইয়েমেনে সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের (এসটিসি) পরাজয় দ্বারা। সৌদি আরব দাবি করে যে, এই গ্রুপটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের মদতপুষ্ট।
এসটিসি যদি ইয়েমেনের বড় অংশ দখল করতে সক্ষম হতো, তাহলে রিয়াদ এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতো যেখানে তাদের স্থল সীমান্তের দক্ষিণে এবং লোহিত সাগরের ওপারে সোমালিল্যান্ডে একটি সম্ভবত শত্রুভাবাপন্ন বিদেশি মদতপুষ্ট গোষ্ঠী ক্ষমতায় থাকত।
এরপর থেকে সৌদি-ইউএই সম্পর্ক খারাপ হয়েছে। এর সাম্প্রতিক উদাহরণ হলো, কয়েকটি ইউএই ডিফেন্স প্রতিষ্ঠানের রিয়াদের ‘ওয়ার্ল্ড ডিফেন্স শো’ থেকে সরে যাওয়া।
এই পরিস্থিতি সৌদি আরবকে তুরস্কের আরও কাছে নিয়ে এসেছে। যা ভুলিয়ে দিয়েছে দীর্ঘ দশকের অবিশ্বাস ও দ্বন্দ্বকে। তুরস্কের এখানে জড়িত হওয়ার কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে ইউএইর সঙ্গে তার পুরনো বিরোধ এবং ইসরায়েলের সঙ্গে দেশটির সম্পর্কের ক্রমাগত অবনতি। কেননা, ইসরায়েল মনে করে, তুরস্ক একমাত্র আঞ্চলিক শক্তি যা তার উচ্চাকাঙক্ষা বাস্তবায়নের পথে বাধা হতে পারে।
দুই শক্তিশালী আঞ্চলিক দেশের সমর্থনে সম্প্রতি সোমালিয়া ইউএইর বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নিয়েছে। দেশটির সঙ্গে সব চুক্তি বাতিল করেছে মোগাদিসু। ফলে দেশ দুটির মধ্যে সম্পর্ক পৌঁছেছে সর্বনিম্ন স্তরে।
অন্যদিকে সোমালিল্যান্ডও দৃঢ় অবস্থান নিচ্ছে। ইউএই যদিও বিচ্ছন্ন এই অঞ্চলকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়নি তবুও সোমালিল্যান্ডের রাষ্ট্রপতি সম্প্রতি দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড গভর্নমেন্টস সামিটে উপস্থিত ছিলেন। এই উপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই মোগাদিসুকে ক্ষুব্ধ করেছে।
এখন সৌদি আরব ও তুরস্ক দুই দেশই সোচ্চারভাবে সোমালিল্যান্ডের সমালোচনা করছে। পাশাপাশি দেশ দুটি সোমালিয়ার আঞ্চলিক সংহতি নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ফলে নতুন আঞ্চলিক শৃঙ্খলা এবং প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এছাড়া, সম্প্রতি সোমালিয়ার বিমানবাহিনীর প্রধান এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পাকিস্তানে সফর করেছেন। এই সফরকে কেন্দ্র করে সোমালিয়ার বিশ্লেষক ও পণ্ডিতরা পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা এবং প্রতিরক্ষা চুক্তির সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছেন। এখন পর্যন্ত যদিও এই বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি।
এই আঞ্চলিক শক্তি ও কৌশলের নতুন বিন্যাসের প্রভাব লিবিয়া এবং সুদান পর্যন্ত অনুভূত হচ্ছে। লিবিয়ায় জেনারেল খালিফা হাফতারকে ইউএইর প্রভাব থেকে দূরে সরানোর চেষ্টা চলছে। যিনি লিবিয়ার বড় অংশের কার্যত শাসক। এই প্রচেষ্টা মূলত করছে তুরস্ক। উল্লেখযোগ্য যে হাফতার সম্প্রতি পাকিস্তানেও এসেছিলেন।
অন্যদিকে সুদানে, দেশটির সেনাবাহিনী সম্প্রতি ইউএই সমর্থিত র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। তুরস্ক এবং মিশরের সামরিক সহায়তা তাদের এই সাফল্য অর্জনে সহযোগিতা করেছে। অর্থাৎ ধীরে ধীরে কারা কোন জোটে তা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
এর সব কিছুই হচ্ছে ইসরায়েলের অবাধ আগ্রাসন এবং ইউএইর বাড়তে থাকা প্রভাবের প্রতিক্রিয়ায়। পদক্ষেপ এবং পাল্টা পদক্ষেপের এই খেলায় ইথিওপিয়ারও অংশগ্রহণের সম্ভাবনা রয়েছে।
জারার খুরো পাকিস্তানের সাংবাদিক ও কলামিস্ট
ডন থেকে অনূদিত

