আল জাজিরার বিশ্লেষণ
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান সংঘাতের ১৫ দিন
- গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই সংঘাত আজ ১৫তম দিনে পদার্পণ করেছে। যুদ্ধের ভয়াবহতা এখন কেবল ইরান বা ইসরায়েলের সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই।

মার্কিন-ইসরায়েল ও ইরানের চলমান যুদ্ধকালীন তেহরান- ১৪ মার্চ, ২০২৬ আল-কুদস দিবস (জেরুজালেম দিবস), ইরানি সংবাদপত্রের কভার। রয়টার্স
বারুদের গন্ধে ভারী হয়ে আছে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ। দীর্ঘদিনের ছায়াযুদ্ধ এবং স্নায়ুযুদ্ধের উত্তেজনা শেষে সরাসরি বিধ্বংসী এক সম্মুখ সমরে লিপ্ত হয়েছে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই সংঘাত আজ ১৫তম দিনে পদার্পণ করেছে। যুদ্ধের ভয়াবহতা এখন কেবল ইরান বা ইসরায়েলের সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই। চলমান এই যুদ্ধ পুরো উপসাগরীয় অঞ্চল এবং বিশ্ব অর্থনীতিকে এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে।
বিগত দুই সপ্তাহে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর নিরবচ্ছিন্ন হামলায় ইরানে নিহতের সংখ্যা দেড় হাজার ছুঁইছুঁই। অন্যদিকে, ইরানের পাল্টা জবাবে কেঁপে উঠেছে তেল আবিব থেকে শুরু করে বাগদাদের মার্কিন দূতাবাস পর্যন্ত। বর্তমান রণক্ষেত্রের একটি বিস্তারিত চিত্র এবং এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব নিচে বিশ্লেষণ করা হলো।
খার্গ দ্বীপে হামলা: যুদ্ধের ১৫তম দিনে সবচেয়ে বড় এবং উদ্বেগজনক ঘটনা হলো ইরানের তেলের ‘তাজ’ হিসেবে পরিচিত খার্গ দ্বীপে মার্কিন হামলা। পারস্য উপসাগরে অবস্থিত এই ক্ষুদ্র দ্বীপটি ইরানের জন্য কৌশলগতভাবে প্রাণের স্পন্দন। কারণ ইরানের মোট অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই এই দ্বীপের টার্মিনালগুলোর মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, মার্কিন বাহিনী দ্বীপটির সামরিক স্থাপনাগুলোতে অত্যন্ত শক্তিশালী ও নির্ভুল বোমা হামলা চালিয়েছে। তবে তিনি দাবি করেছেন যে, ‘মানবিকতা ও কৌশলগত’ কারণে তারা এখনো দ্বীপের তেল অবকাঠামো বা মূল স্টোরেজ ট্যাঙ্কগুলোতে আঘাত করেননি। বিশ্লেষকদের মতে, এটি আসলে ইরানের প্রতি একটি চরম আল্টিমেটাম। ট্রাম্প স্পষ্ট করে দিয়েছেন, যদি ইরান বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম পথ ‘হরমুজ প্রণালী’ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে কোনো প্রকার বিঘ্ন ঘটায়, তবে পরবর্তী লক্ষ্যবস্তু হবে এই তেল কেন্দ্রগুলো। খার্গ দ্বীপের পতন মানে ইরানের অর্থনীতির মেরুদণ্ড পুরোপুরি ভেঙে পড়া।
ইরানের ক্ষয়ক্ষতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতা
ইরানের অভ্যন্তরে গত ১৫ দিনে অন্তত ৭,৬০০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। তেহরান দাবি করেছে, এই আক্রমণের জবাবে তারা লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সাথে সমন্বয় করে ইসরায়েলের বাণিজ্যিক রাজধানী তেল আবিব এবং অন্যান্য সামরিক ঘাঁটিতে শত শত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর খবরটি দিয়েছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। তিনি দাবি করেছেন, ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি মার্কিন হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন। যদিও ইরান এই খবরটি এখনো স্বীকার বা অস্বীকার কিছুই করেনি, তবে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট ইতিমধ্যেই খামেনি এবং ইরানের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের সম্পর্কে তথ্যের জন্য ১০ মিলিয়ন ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ইরানে ১,৪৪৪ জন নিহত এবং ১৮,৫০০-এর বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।
উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধের বিস্তার
যুদ্ধ এখন আর কেবল নির্দিষ্ট সীমান্তে সীমাবদ্ধ নেই। ফলে প্রতিবেশী দেশসমূহে আতঙ্কজনক অবস্থা তৈরি হয়েছে। কাতার, ওমান, সৌদি আরব এবং বাহরাইন—পুরো অঞ্চল এখন যুদ্ধের ফ্রন্টলাইনে পরিণত হয়েছে।
সৌদি আরব ও কাতার: সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গত শুক্রবার পাঁচটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। কাতার তাদের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো থেকে নাগরিকদের সরিয়ে নিয়েছে এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলার উচ্চ সতর্কতা জারি করেছে। দেশটির ‘এডুকেশন সিটি’র মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সাময়িকভাবে খালি করা হয়েছে।
ওমান ও বাহরাইন: ওমানে আকাশ থেকে ড্রোন পড়ে বেসামরিক নাগরিক নিহতের পর ওমানের সুলতান ও কাতারের আমির আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর জন্য জরুরি আলাপ শুরু করেছেন। বাহরাইনে দিনরাত হামলার সাইরেন বাজার কারণে সাধারণ মানুষ ঘরের ভেতরে আটকা পড়েছেন।
যুদ্ধের উত্তাপে মধ্যপ্রাচ্যের জনপ্রিয় ক্রীড়া আয়োজনও স্থবির হয়ে পড়েছে। বাহরাইন ও সৌদি আরবে নির্ধারিত জনপ্রিয় ফর্মুলা ওয়ান (F1) রেস বাতিল করা হয়েছে।
লেবানন ও ইরাক: ধ্বংসের নতুন মানচিত্র
ইসরায়েলি সামরিক কৌশলের অন্যতম শিকার এখন লেবানন। গাজায় যে ধ্বংসলীলা চালানো হয়েছিল, হুবহু একই কৌশলে লেবাননের দক্ষিণ অঞ্চল এবং বৈরুতকে জনশূন্য করার চেষ্টা চলছে। গত কয়েক দিনে লেবাননে অন্তত ৭৭৩ জন নিহত হয়েছেন। ইসরায়েলি বাহিনী স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, লেবানন সরকারকে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে, অন্যথায় দেশটির রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে।
এরই মধ্যে দক্ষিণ লেবাননে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীর (UNIFIL) সদর দপ্তরে ইসরায়েলি গোলা আঘাত হেনেছে। অন্যদিকে, ইরাকের রাজধানী বাগদাদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের হেলিপ্যাডে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ইরান-পন্থী গোষ্ঠীগুলোর এই আক্রমণ ইরাককে যুদ্ধের নতুন এক কেন্দ্রে পরিণত করেছে।
মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ও সেনা মোতায়েন
হামলা জোরদার করতে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে ১০,০০০ ইন্টারসেপ্টর ড্রোন এবং বিশাল যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করছে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ জানিয়েছেন, শত্রুদের প্রতি তারা কোনো দয়া দেখাবেন না। তবে মার্কিন প্রশাসনের এই আগ্রাসী অবস্থানের সমালোচনা করছেন অনেক ডেমোক্র্যাট নেতা। তারা আশঙ্কা করছেন, এই অন্ধ আক্রমণ আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের শামিল হতে পারে।
বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি সংকট: সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব
এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় কুফল ভোগ করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে।
বিমান চলাচল ও যোগাযোগ: জ্বালানির দাম বাড়ায় ভারতের এয়ার ইন্ডিয়া ও ইন্ডিগোর মতো বড় বিমান সংস্থাগুলো টিকিটের দাম কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত প্রবাসী শ্রমিক ও সাধারণ যাত্রীদের জন্য যাতায়াত এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে।
বৈশ্বিক সমন্বয়: পরিস্থিতি সামাল দিতে কানাডা তাদের জরুরি মজুদ থেকে প্রায় ২৪ মিলিয়ন ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (IEA) সমন্বিতভাবে এই বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলার চেষ্টা করছে।
কূটনৈতিক মেরুকরণ
এই যুদ্ধের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো কূটনীতির পরিবর্তন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র বিপুল সামরিক শক্তি মোতায়েন করলেও বিশ্বমঞ্চে তাদের কূটনৈতিক প্রভাব কিছুটা ম্লান হচ্ছে। ফ্রান্স, ইতালি এবং ভারতের মতো দেশগুলো এখন সরাসরি তেহরানের সাথে যোগাযোগ করছে যাতে তাদের বাণিজ্যিক জাহাজগুলো নিরাপদে চলাচল করতে পারে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, সংকটের এই মুহূর্তে অনেক দেশই কেবল ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভর না করে নিজস্ব পথে সমাধান খুঁজছে।
অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
সংঘাতের ১৫তম দিনে দাঁড়িয়ে বিশ্ব এখন এক চরম অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছে। একদিকে মার্কিন-ইসরায়েলি শক্তির চরম আস্ফালন, অন্যদিকে ইরানের মরণপণ লড়াই ও আঞ্চলিক মিত্রদের সক্রিয়তা। এই যুদ্ধে কোনো পক্ষই পিছু হটার লক্ষণ দেখাচ্ছে না। যদি দ্রুত কোনো কার্যকর যুদ্ধবিরতি বা আলোচনার পথ তৈরি না হয়, তবে এই সংঘাত কেবল মধ্যপ্রাচ্যকে নয়, বরং পুরো বিশ্বের স্থিতিশীলতা ও অর্থনীতিকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বিচার আদালত বা নিরাপত্তা পরিষদ এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে না পারায় মানবিক বিপর্যয়ের শঙ্কা আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
বেইত হ্যানুন থেকে বৈরুত—সর্বত্রই এখন একটিই প্রশ্ন: এই ধ্বংসযজ্ঞ থামবে কবে?
লেখক: আল জাজিরা ইংলিশের একজন অনলাইন প্রযোজক।

