আগামীর সময়

যেভাবে ইরানের পতনে বদলাতে পারে মুসলিম বিশ্বকে

যেভাবে ইরানের পতনে বদলাতে পারে মুসলিম বিশ্বকে

ভবিষ্যৎ  নির্ধারক এক মুহূর্তের মুখোমুখি ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্র। এ ভবিষ্যৎ শুধু ইরানের জন্যেই নয়, মুসলিম বিশ্বের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কেননা ইরানের সম্ভাব্য পতন শুধু একটি রাষ্ট্রের সরকার পরিবর্তনের ঘটনা হবে না। এটি মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক, সাম্প্রদায়িক ও ভূ-রাজনৈতিক কাঠামোয় গভীর পুনর্বিন্যাসের সূচনা করতে পারে।

ইরান-ইসরায়েলের প্রথম দফার হামলায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির বাসভবন লক্ষ্যবস্তু হওয়ার পর শনিবার সকাল থেকেই সর্বোচ্চ নেতার ভাগ্য নিয়ে নানা প্রতিবেদন ঘুরপাক খাচ্ছিল। স্যাটেলাইট চিত্রে তার কমপাউন্ডে উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি দেখা যায়।

যদিও ইরানের প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল তাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে এরপর খবর আসে ৮৬ বছর বয়সী এই ধর্মীয় নেতা রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে ভাষণ দেবেন, কিন্তু তা আর বাস্তবায়িত হয়নি।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবরটি ঘোষণা করার কয়েক ঘণ্টা পর ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন নিশ্চিত করে যে খামেনি নিহত হয়েছেন।

ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্রের অশান্ত ইতিহাসে এগুলো এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। এ ঘটনা মুসলিম বিশ্বের ভবিষ্যতের জন্যও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

তবে এর সবচেয়ে প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতা ও কমান্ডাররা এ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলেন।

গত জুনের ১২ দিনের যুদ্ধে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তখনই স্পষ্ট হয়ে যায়, আয়াতুল্লাহও তাদের লক্ষ্যবস্তু হতে পারেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, যুদ্ধ চলাকালে বিশেষ বাংকারে অবস্থানরত খামেনি শীর্ষ পর্যায়ে কোনো শূন্যতা এড়াতে দ্রুত দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারেন—এমন নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের একটি তালিকা প্রস্তুত করছিলেন।

এমনকি গত বছরের শত্রুতা শুরুর আগেই জানা যায়, তিনি ৮৮ সদস্যের বিশেষজ্ঞ পরিষদকে—যারা সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করে—সব ধরনের পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে নির্দেশ দিয়েছিলেন।

এই প্রথম দিনের বিমান হামলা ও লক্ষ্যভিত্তিক আক্রমণে শুধু সর্বোচ্চ নেতাই নিহত হননি। যারা এখনো দায়িত্বে আছেন বা জ্যেষ্ঠ পদে আসীন হয়েছেন, তারা বিশ্বকে জানাতে চাইবেন যে তারা দৃঢ়ভাবে নিয়ন্ত্রণে আছেন এবং ক্ষমতা হস্তান্তর নির্বিঘ্ন হবে।

তবে আয়াতুল্লাহর ৩৬ বছরের শাসনের অবসান তার সমর্থকদের জন্য বড় ধাক্কা হবে, বিশেষ করে তার সহকারী ও মিত্র ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সদস্যদের জন্য, যাদের দায়িত্ব ছিল তাকে এবং ইসলামী বিপ্লবকে রক্ষা করা।

তবে বিবিসি যাচাই করেছে এমন ভিডিও, যেখানে তেহরান ও কারাজের রাস্তায় তার মৃত্যুর খবরে মানুষকে উদ্‌যাপন করতে দেখা গেছে।

পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি গভীর অবিশ্বাসী এবং ইসরায়েলের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন খামেনি কঠোর হাতে শাসন করেছেন, সংস্কারের আহ্বান ও ধারাবাহিক বিক্ষোভ দমন করেছেন।

ইসরায়েল ও আমেরিকার সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে সরাসরি সামরিক সংঘাত এবং নিজের জনগণের পক্ষ থেকে পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান দাবি তাকে তার শাসনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করায়।

১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর ইরান নিজেকে শিয়া রাজনৈতিক ইসলামের কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে। ফলে তেহরানের ক্ষমতা দুর্বল হলে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনের হামাস এবং ইরাক ও সিরিয়ার শিয়া মিলিশিয়াগুলোর আর্থিক ও কৌশলগত সহায়তা কমে যেতে পারে। এতে তথাকথিত ‘প্রতিরোধ অক্ষ’-এর কাঠামো ভেঙে পড়ে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য বদলে যেতে পারে।

অন্যদিকে সুন্নি নেতৃত্বাধীন রাষ্ট্রগুলো, বিশেষ করে সৌদি আরব এই পরিস্থিতিকে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ হিসেবে দেখতে পারে। উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলো ইয়েমেন, সিরিয়া ও ইরাকে নিজেদের প্রভাব সুসংহত করতে সক্রিয় হতে পারে। একই সঙ্গে তুরস্ক আঞ্চলিক কূটনীতি ও সামরিক উপস্থিতি জোরদার করে বিকল্প শক্তিকেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। ফলে মুসলিম বিশ্বে নতুন জোট, নতুন প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ক্ষমতার ভিন্ন মেরুকরণ গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে।

অন্যদিকে ফিলিস্তিন প্রশ্নেও এর প্রভাব পড়তে পারে। ইরানের সমর্থন কমে গেলে ইসরায়েলবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সক্ষমতা সীমিত হতে পারে, যা সংঘাতের গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে।

একই সঙ্গে ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের ধরনও গুরুত্বপূর্ণ: যদি তা গণআন্দোলন বা সংস্কারমুখী রূপান্তরের মাধ্যমে ঘটে, তবে অন্যান্য মুসলিম দেশে রাজনৈতিক জবাবদিহি ও সংস্কারের দাবি জোরদার হতে পারে। কিন্তু যদি তা গৃহযুদ্ধ বা অস্থিতিশীলতায় পর্যবসিত হয়, তবে শরণার্থী সংকট, সীমান্ত উত্তেজনা ও সাম্প্রদায়িক সময়ের সংঘাত আরো বেড়ে পুরো অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করতে পারে।

খামেনির নেতৃত্বের আকস্মিক সমাপ্তির পর এখন দৃষ্টি যাবে তার উত্তরসূরির দিকে এবং শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তন ৪৭ বছর বয়সী ইসলামী প্রজাতন্ত্রের নীতিগত দিকনির্দেশনায় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয় কি না।

যেই সামনে আসুন না কেন, তার প্রধান লক্ষ্য একই থাকবে—ধর্মীয় নেতৃত্ব ও শক্তিশালী নিরাপত্তা বাহিনীকে ক্ষমতায় রাখে এমন ব্যবস্থার টিকে থাকা নিশ্চিত করা।

যুদ্ধ, যা এখনো শেষ হয়নি, ইতোমধ্যে অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক পথে এগোচ্ছে।


    শেয়ার করুন: